পদ্মার স্রোতে ভেসে গেল ঈদ আনন্দ, শোক থেকে শিখতে কত দেরি

আহমেদ দীপ্ত
আহমেদ দীপ্ত

ফেরি পারাপার—কথাটি শুনলে প্রথমেই কল্পনায় কী আসে? ঘাটের চিরচেনা সেই গরম পরোটা-ডিম ভাজি, হকারের ‘এই ডিম-আ-ডিম’, ‘ঝালমুড়ি’ কিংবা ‘ডাব আছে ডাব’ সুরের হাঁকডাক। হয়তো ফেরির টয়লেটের গোল জানালা দিয়ে নদীর রুপালি ঝিলমিলে পানি দেখা, কিংবা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘাটে বসে আড্ডা আর আলসেমি।

তবে এই আনন্দময় স্মৃতিগুলো মুহূর্তেই বিষাদে ম্লান হয়ে যেতে পারে, যদি সেই বাসটি হঠাৎ নদীতে তলিয়ে যায়। ফেরি নিয়ে জমানো আজীবনের সুখ-দুঃখের স্মৃতি তখন স্বজনদের চোখের অশ্রু হয়ে নদীতে মিশে যায়।

গতকাল বুধবার বিকেলে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়ার তিন নম্বর ঘাটের পন্টুন থেকে ‘সৌহার্দ্য’ পরিবহনের একটি বাস নদীতে পড়ে যাওয়ার ঘটনা আমাদের সেই রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে। ওই বাসের যাত্রীদের স্বজনদের চোখে এখন পদ্মার স্রোতের মতোই শোকের ধারা বইছে।

আজ বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত এ দুর্ঘটনায় ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন আরও অনেকে।

বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্যমতে, বাসটিতে হয়ত ৪০ থেকে ৬০ জন যাত্রী ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শী আবদুস সালাম ও ঘাটের তত্ত্বাবধায়ক মো. মনির হোসেনের বর্ণনা থেকে জানা যায়, বাসটি ঘাটে এসে ফেরিতে উঠতে না পেরে পন্টুনে পরের ফেরির জন্য অপেক্ষা করছিল। ঠিক তখন ‘হাসনাহেনা’ নামের একটি ছোট ফেরি এসে পন্টুনে সজোরে ধাক্কা দিলে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীগর্ভে তলিয়ে যায়।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান জানিয়েছেন, নব্বইয়ের দশকের দিকে নিয়ম ছিল যাত্রীদের যানবাহন থেকে নামিয়ে তারপর ফেরিতে ওঠানো-নামানো। বর্তমানে এই নিয়মের কোনো তোয়াক্কা করে না কেউ। যদি এই ন্যূনতম নিরাপত্তাবিধি মানা হতো, তবে হয়ত এত প্রাণহানি ঘটত না।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে যাওয়া দুর্ঘটনার ভিডিওটি যারাই দেখছেন, তারাই শিউরে উঠছেন। বাসের ওই অচেনা যাত্রীদের জায়গায় নিজেকে কল্পনা করে অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন। অথচ আজ ২৬ মার্চ—বাংলাদেশের ৫৫তম স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। দিনটি উৎসব আর আনন্দের হওয়ার কথা থাকলেও, আজ সারা দেশের মানুষের মন পড়ে আছে দৌলতদিয়ার ওই বিষণ্ন ঘাটে। সবার চোখে-মুখে অব্যক্ত বেদনার ছাপ।

গতকাল ছিল ঈদের পঞ্চম দিন। অনেকেই এখনো গ্রামের বাড়িতে ঈদ শেষে বাড়িতে ফিরছেন। কিন্তু এই ঈদযাত্রায় আমরা আসলে কতটা নিরাপদ? সড়ক, নৌ কিংবা রেল—কোনো পথেই কি জীবনের নিশ্চয়তা আছে? পরিসংখ্যান বলছে—না।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য মতে, গত ১৭ মার্চ থেকে ২৬ মার্চ ভোর পর্যন্ত মাত্র ১০ দিনে দেশে ৩৪২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৭৪ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন দেড় হাজারের বেশি মানুষ।

যাত্রীকল্যাণ সমিতি বলছে, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে হতাহতের সংখ্যা বেড়েছে। গত এক বছরে সড়ক, রেল ও নৌপথে মোট ৭ হাজার ৩৬৯ দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ৭৫৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন।

এই সংখ্যাগুলো কি শুধুই পরিসংখ্যান? প্রতিটি সংখ্যার পেছনে লুকিয়ে আছে একেকটি করুণ মৃত্যু, একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ আর স্বজনদের অন্তহীন হাহাকার।

আমাদের উদ্ধার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। ২০২১ সালে পাটুরিয়ায় ‘শাহ আমানত’ ফেরি ডুবে যাওয়ার পর সেটি উদ্ধারে সময় লেগেছিল ১৪ দিন। উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’ কেনা হয়েছিল ১৯৬৪ সালে, যার সক্ষমতা মাত্র ৬০ টন।

আরেকটি উদ্ধারকারী জাহাজ ‘রুস্তম’-এর আয়ু অনেক আগেই শেষ। আর ‘নির্ভীক’-এর ফিটনেস সনদ হালনাগাদ নেই।

বিআইডব্লিউটিএ তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সাল থেকে পরের ১১ বছরে ৩৮৭টি নৌযান ডুবলেও উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে ২২১টি। বাকি ১৮১টি নৌযান এখনো নদীর তলদেশেই পড়ে আছে।

দক্ষিণ কোরিয়া থেকে আনা ‘নির্ভীক’ ও ‘প্রত্যয়’-এর উত্তোলন ক্ষমতা মাত্র ২৫০ টন করে। অথচ আধুনিক নৌ-ব্যবস্থাপনায় এগুলো কতটা যথেষ্ট, তা ভাববার সময় এসেছে।

দৌলতদিয়ার এই ট্র্যাজেডি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, অবকাঠামো উন্নয়নে মেগা প্রকল্প নেওয়ার পাশাপাশি নিরাপত্তা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও নিয়ম মানার সংস্কৃতি গড়ে তোলা কতটা জরুরি। এছাড়াও, দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধার তৎপরতা চালানোর জন্য আমাদের প্রস্তুতি কতটুকু, তাও যেন এবার প্রশ্নের মুখে পড়ছে।