‘ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধে লড়ছি, আমরাই জয়ী হব’ মামাকে লেখা চিঠিতে শহীদ রুমী
‘চলো চুল্লু ভাই, আমরা দুজনে মিলে একটা অ্যাকশন করি। চলো, রমনা থানায় একটা গ্রেনেড মেরে আসি!’ সহযোদ্ধা মাসুদ সাদেক চুল্লুকে প্রায়ই নতুন অপারেশনে জন্য উসকে দিতেন শাফী ইমাম রুমী।
আর তাইতো ধরা পড়ার মাত্র পাঁচদিন আগে একাত্তরের ২৫ আগস্ট রাতে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত দুঃসাহসিক ‘অপারেশন ডেসটিনেশন আননোন’-এ অংশ নিয়ে অবিস্মরণীয় বীরত্ব দেখিয়েছিলেন রুমী—যা ছিল তার সর্বশেষ অপারেশন।
অতর্কিত সেই আক্রমণের ছিল না কোনো নকশা। অপারেশনের একপর্যায়ে একটি পাকিস্তানি সেনা জিপ রুমী ও তার সহযোদ্ধাদের বহনকারী গাড়ির পিছু নিলে রুমী গাড়ির পেছনের কাঁচ ভেঙে স্টেনগান দিয়ে ব্রাশফায়ার শুরু করেন। তার ছোঁড়া বৃষ্টির মতো গুলিতে পাকিস্তানি সেনাদের গাড়িটি ল্যাম্পপোস্টে ধাক্কা খেয়ে উল্টে যায়। গুলিতে নিহত হয় জিপের চালকসহ বেশ কয়েকজন সেনা। রুমীর তাৎক্ষণিক আক্রমণের ফলে সেদিন সাক্ষাৎ মৃত্যুর হাত থেকে প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন ক্র্যাক প্লাটুনের বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা।
‘অপারেশন ডেসটিনেশন আননোন’ তো বটেই, এর আগে ক্র্যাক প্লাটুনের গেরিলাদের একের পর এক আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পড়েছিল পাকিস্তানি বাহিনী। অপারেশন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল থেকে অপারেশন গ্যানিজ পেট্রল পাম্প, উলন পাওয়ার স্টেশন থেকে যাত্রাবাড়ী পাওয়ার স্টেশন, সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন থেকে ইউএস ইনফরমেশন সেন্টার, বাদ যায়নি ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের প্রবেশ মুখ থেকে সামান্য দূরত্বে থাকা সবচেয়ে নিরাপদ চেকপোস্ট ফার্মগেটও। ফার্মগেটের দিক থেকে তাক করে থাকা সদা প্রস্তুত ভারী মেশিনগানও কব্জায় আনতে পারেনি দুঃসাহসিক গেরিলাদের। রুমীর মতো গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের একের পর এক আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পড়েছিল পাকিস্তানি বাহিনী।
অথচ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার কথাই ছিল না রুমীর। তার পড়তে যাওয়ার কথা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে। মেধা তালিকায় অবস্থান নিয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে রুমী সুযোগ পেয়েছিলেন আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজেও—বর্তমানে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)। ঠিক যেন মিলে গিয়েছিল রুমীর জন্মের পর করা চিকিৎসকের একটি মন্তব্যের সঙ্গে। রুমী ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর চিকিৎসক তার মাকে বলেছিলেন, ‘এখন ১৯৫১ সাল। ২০ বছর পরে ৭১ সালে এই ছেলে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বে।’
কিন্তু মাতৃভূমির টানে এক যুদ্ধই বদলে দিয়েছিল রুমীর পুরো জগত। আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ বা ইলিনয় ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে পড়ার সুযোগ তখন আর মুখ্য বিষয় ছিল না রুমীর কাছে। দেশের ওই অবস্থায় রুমীর কাছে মুখ্য হয়ে উঠেছিল যুদ্ধে যোগ দেওয়া। আর তাই যুদ্ধ শুরু হলে মা জাহানারা ইমামের কাছে যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি চেয়েছিলেন তিনি।
মা তার প্রিয় সন্তানকে যুদ্ধে পাঠাতে রাজি হলেন না। কিন্তু রুমীর তীব্র জেদ, দেশের এই অবস্থায় কিছুতেই পড়তে যাবেন না তিনি। মায়ের অনড় ভাব দেখে তিনি বলেই ফেলেন, ‘আম্মা, দেশের এ অবস্থায় তুমি যদি আমাকে জোর করে আমেরিকায় পাঠিয়ে দাও, আমি হয়তো যাব শেষ পর্যন্ত, কিন্তু তা হলে আমার বিবেক চিরকালের মতো অপরাধী করে রাখবে আমাকে। আমেরিকা থেকে হয়তো বড় ডিগ্রি নিয়ে এসে বড় ইঞ্জিনিয়ার হব; কিন্তু বিবেকের ভ্রুকুটির সামনে কোনো দিনও মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব না। তুমি কি তাই চাও আম্মা?’
কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতর্ক প্রতিযোগিতায় উজ্জ্বল তারকা রুমী কখনোই বিতর্কে হারেননি প্রতিপক্ষের কাছে। যুদ্ধে যাওয়ার প্রশ্নেও তিনি ছিলেন অটুট। একপর্যায়ে জাহানারা ইমামও সন্তানের ইচ্ছে মেনে নিলেন। দু চোখ বুজে বললেন, ‘না তা চাইনে। ঠিক আছে তোর কথাই মেনে নিলাম। দিলাম তোকে দেশের জন্য কোরবান করে। যা তুই, যুদ্ধে যা।’
জীবনের শেষ দিকে এসে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম লিখতে বসেছিলেন আত্মজীবনী। সেই গ্রন্থের এক পাতায় রুমীকে নিয়ে ভবিষ্যৎ বাণী করা সেই ডাক্তারের প্রশ্নের প্রতিউত্তরে লিখেছিলেন, ‘রুমী ১৯৭১ সালে ইঞ্জিনিয়ার হতে পারেনি, তবে কিছু একটা হয়েছিল। সে দেশের জন্য শহীদ হয়েছিল।’
রুমী ধরা পড়ার একদিন আগে ২৮ আগস্টের একটি কথোপকথন জাহানারা ইমাম তার ‘একাত্তরের দিনগুলি’তে লিপিবদ্ধ করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘হাত বাড়িয়ে রুমীর মাথাটা বুকে টেনে বললাম, “রুমী। এত কম বয়স তোর, পৃথিবীর কিছুই তো দেখলি না। জীবনের কিছুই তো জানলি না।” রুমী মুখ তুলে কী একরকম যেন হাসল। মনে হলো অনেক বেদনা সেই হাসিতে। একটু চুপ করে থেকে বলল, “বিন্দুতে সিন্ধু দর্শন একটা কথা আছে না আম্মা? হয়তো জীবনের পুরোটা তোমাদের মতো জানি না, ভোগও করিনি, কিন্তু জীবনের যত রস-মাধুর্য, তিক্ততা-বিষ—সবকিছুর স্বাদ আমি এর মধ্যেই পেয়েছি আম্মা। যদি চলেও যাই, কোনো আক্ষেপ নিয়ে যাব না।’”
যুদ্ধে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে একাত্তরের ২ মে সর্বপ্রথম সীমান্ত পেরিয়ে প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে ভারতে প্রবেশের চেষ্টা করেন রুমী ও তার সহযোদ্ধারা। কিন্তু তাদের সেবারের প্রচেষ্টা সফল হয়নি। একপর্যায়ে জুন মাসে তারা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। মেজর খালেদ মোশাররফের নির্দেশে ও মেজর হায়দারের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ঢাকা শহরের কতিপয় তরুণকে নিয়ে গঠন করা হয় ঢাকা প্লাটুন—যা পরবর্তীতে ক্র্যাক প্লাটুন হিসেবে পরিচিতি পায়। ক্র্যাক প্লাটুনের মুক্তিযোদ্ধাদের বৈশিষ্ট্য ছিল, তারা হাতের তালুর মতোই চিনতেন ঢাকা শহরের প্রতিটি অলিগলি।
প্রায় দেড় মাসের প্রশিক্ষণ শেষে আগস্টের প্রথম সপ্তাহে ক্র্যাক প্লাটুনের একদল মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে ঢাকায় আসেন রুমী। এর আগে ত্রিপুরার ক্যাম্প থেকে মামা সৈয়দ মোস্তফা কামাল পাশাকে চিঠিতে রুমী লিখেছিলেন, ‘বেস ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে কাল এখান থেকে চলে যেতে হবে। আমরা ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধে লড়ছি। আমরাই জয়ী হব। আমাদের সবার জন্য দোয়া করো। কী লিখবো বুঝতে পারছি না। কত কী নিয়ে যে লেখার আছে! নৃশংসতার যত কাহিনী তুমি শুনছো, ভয়াবহ ধ্বংসলীলার যত ছবি তুমি দেখেছো, জানবে তার সবই সত্য। ওরা আমাদের নৃশংসতার সঙ্গে ক্ষতবিক্ষত করছে, মানব ইতিহাসে যার তুলনা নেই। আর নিউটন আসলেই যথার্থ বলেছেন, একই ধরনের হিংস্রতা নিয়ে আমরাও তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ব।’
রুমী ও তার দলের ঢাকায় আসার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন হামলা করা। সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনে হামলার পাঁচদিন পরেই তারা চালান দুঃসাহসিক অপারেশন ডেসটিনেশন আননোন।
রুমীদের একের পর এক অতর্কিত অপারেশনের পর শহরের গেরিলাদের ধরতে সাঁড়াশি অভিযানে নামে পাকিস্তানি বাহিনী। অপারেশনের পর ২৯ আগস্ট নিজ বাড়িতেই ছিলেন রুমী।
কতিপয় দেশদ্রোহীর সহযোগিতায় ২৯ আগস্ট রাত ১২টার দিকে এলিফ্যান্ট রোডস্থ কণিকা বাড়ি থেকে রুমী, তার বাবা শরীফ ইমাম ও ছোট ভাই সাইফ ইমাম, বন্ধু হাফিজ, চাচাতো ভাই মাসুমকে ধরে নিয়ে যায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী। তাদের নেওয়া হয় তেজগাঁও নাখালপাড়ার ড্রাম ফ্যাক্টরি সংলগ্ন মিলিটারি টর্চার সেলে। সেখানে তাদের ওপর চালানো হয় পৈশাচিক নির্যাতন।
জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে রুমী তার ভাই, বাবাসহ কয়েকজন সহযোদ্ধাকে যুদ্ধে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করতে বলে জানান, ‘পাকবাহিনী আমাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সচেতন এবং এর সব দায়দায়িত্ব আমি নিজেই নিচ্ছি।’
শেষপর্যন্ত দুদিন টানা অমানুষিক নির্যাতনের পর রুমী ছাড়া তার পরিবারের বাকি সদস্যদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
টর্চার সেল থেকে ফিরে আসার সময় রুমীর বাবা প্রকৌশলী শরীফ ইমাম পাকিস্তানি কর্নেলকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘কবে ছাড়া পাবে রুমী?’ জবাবে কর্নেল বলেছিলেন, ‘সে যাবে একদিন পর, তার জবানবন্দী নেওয়া এখনো শেষ হয়নি।’ আটক হওয়ার দুদিন পর রুমীর সঙ্গে নিখোঁজ হন বদি, আজাদ, জুয়েল, আবু বকর, আলতাফ মাহমুদ হাফিজ প্রমুখ গেরিলা মুক্তিযোদ্ধারাও। ধারণা করা হয়, নিষ্ঠুর নির্যাতনের পর তাদের হত্যা করা হয়েছিল।
রুমী নিখোঁজ হওয়ার কয়েকদিন পর ৫ সেপ্টেম্বর সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা দেন পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। শরীফ ইমাম ও জাহানারা ইমামকে অনেক স্বজন পরামর্শ দিয়েছিলেন, তারা যেন রুমীর জন্য প্রাণভিক্ষার আবেদন করেন। কিন্তু যে রুমী হানাদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন তাদের কাছেই তার জন্য ক্ষমার আবেদন করলে তিনি অপমানিত হতে পারেন—এই ভেবে ক্ষমা চাইতে রাজী হননি রুমীর বাবা-মা।
অন্যদিকে ৫ সেপ্টেম্বর সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার কথা আগেই জানতো সেনা কর্মকর্তারা। ইয়াহিয়া খানের সাধারণ ক্ষমার সিদ্ধান্ত তাদের অনেকেরও মনপুত হয়নি। ৪ সেপ্টেম্বর রাতে তাড়াহুড়ো করে আটককৃত বহু মুক্তিযোদ্ধাকে গুলি করে হত্যা করে পাকিস্তানি বাহিনী। ধারণা করা হয়, সেই মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে হয়তো শাফী ইমাম রুমীও ছিলেন।
যে মুক্ত স্বদেশে প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নেওয়ার কথা ছিল অবিস্মরণীয় এই মুক্তিযোদ্ধার, সেই মুক্ত দেশ দেখে যেতে পারেননি রুমী। আত্মত্যাগের এক মহান দৃষ্টান্ত স্থাপন করে তিনি অমর হয়ে রয়েছেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। ৭৫তম জন্মবার্ষিকীতে শহীদ শাফী ইমাম রুমী বীর বিক্রমের প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।
তথ্য সূত্র:
- গেরিলা অভিযান ‘অজানা গন্তব্যে’: ব্রেভ অব হার্ট—হাবিবুল আলম বীর প্রতীক
- বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র নবম খণ্ড
- একাত্তরের দিনগুলি—জাহানারা ইমাম
- অন্য জীবন—জাহানারা ইমাম
- শহীদ শাফী ইমাম রুমী স্মারকগ্রন্থ
- একাত্তরের চিঠি—প্রথমা প্রকাশন