বোয়ালখালী পল্লীবিদ্যুৎ অফিস: ‘মিটার থাকলে তার নেই, আবার তার থাকলে মিটার নেই’

 এফ এম মিজানুর রহমান
এফ এম মিজানুর রহমান

চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার আমুচিয়া ইউনিয়নের ধরলা এলাকার বাসিন্দা স্বপন দাশ গত ৬ জানুয়ারি আবাসিক বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য অনলাইনে আবেদন করেন। প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র জমা দিয়ে নির্ধারিত ফিও পরিশোধ করেছেন। কিন্তু বাড়ি থেকে মাত্র ৪৫ ফুট দূরে সার্ভিস পোল থাকা সত্ত্বেও ছয় মাসেও মিটার সংযোগ পাননি স্বপন দাশ।

এ বিষয়ে জানতে তিনি কয়েক দফা চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুতের বোয়ালখালী জোনাল অফিসে গেলেও প্রতিবারই নানা অজুহাতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

স্বপন দাশের মতো আরও অনেক গ্রাহক বোয়ালখালী পল্লী বিদ্যুতের জোনাল অফিসে সেবা নিতে গিয়ে হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্বপন দাশ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন চট্টগ্রাম বন্দরে কর্মরত ছিলাম। অবসরের পর পৈতৃক ভিটায় একটি নতুন ঘর নির্মাণ করে সেখানে বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য আবেদন করি। গত বছরের নভেম্বরের শেষদিকে দুবার অনলাইনে আবেদন করলেও নানা অজুহাতে আবেদন দুটি বাতিল করা হয়। পরে অফিসের পরামর্শ অনুযায়ী তাদের নির্ধারিত একজনের মাধ্যমে চলতি বছরের জানুয়ারিতে তৃতীয়বার আবেদন করি। কিন্তু এখনো আমার নামে মিটার ইস্যু হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘ডিমান্ড চার্জও পরিশোধ করেছি। তারপরও এখনো মিটার সংযোগ পাইনি। অথচ আমার পরে আবেদন করা অনেকেই ইতোমধ্যে মিটার পেয়ে গেছেন।’

বিদ্যুৎ অফিসের নথি অনুযায়ী, অনলাইনে মিটারের জন্য আবেদন করলে সংযোগ পেতে মোট ১০টি ধাপ সম্পন্ন করতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে—হাউজ ওয়্যারিং, মেম্বার সার্ভিসের প্রাথমিক অনুমোদন, ওয়্যারিং পরিদর্শকের পরিদর্শন, ডিমান্ড নোট ইস্যু, ডিমান্ড নোটের অর্থ পরিশোধ, মিটার অর্ডার সরবরাহ, লাইনম্যান নিয়োগ ও শেষ ধাপে বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদান।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যুৎ অফিসের নির্ধারিত এলাকাভিত্তিক দালাল বা লাইনম্যানের মাধ্যমে আবেদন না করলে নানা অজুহাতে আবেদন বাতিল করা হয়। তবে তাদের মাধ্যমেই আবেদন করে চাহিদামতো অর্থ দিতে রাজি হলে দ্রুত মিটার সংযোগ পাওয়া যায়। শুধু নতুন সংযোগই নয়, মিটারের ত্রুটি বা অস্বাভাবিক বিলের মতো সমস্যার সমাধানেও গ্রাহকদের বারবার অফিসে যেতে হয়। আর মেরামতের দায়িত্বে থাকা কর্মীদের ‘সম্মানী’ না দিলে তারা কাজ করতে আসেন না।

‘টাকা দিলে দ্রুত কাজ হয়ে যায়’

বোয়ালখালী পৌরসভার বাসিন্দা সাদ্দাম হোসেন ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ অফিসে কোনো কাজ করাতে গেলেই টাকা দিতে হয়। সাধারণ সৌজন্য হিসেবে মানুষ চা-নাস্তার খরচ দেয়, কিন্তু তাদের দাবি অনুযায়ী টাকা না দিলে কাজই করতে চান না।’

তিনি আরও বলেন, ‘অনলাইনে মিটার আবেদনের ক্ষেত্রে সিরিয়ালও মানা হয় না। টাকা দিলে দ্রুত কাজ হয়ে যায়। আর অভিযোগ করলেও সেগুলোর প্রতিকার করার মতো কাউকে পাওয়া যায় না।’

আরেক বাসিন্দা পূজন সেন ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘শুধু নতুন মিটার সংযোগ নয়, মিটার রিডিং নিয়েও মানুষের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ রয়েছে। অনেক বাসা-বাড়ি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত রিডিং দেখিয়ে বেশি বিল করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আমার গত মাসে বিদ্যুৎ বিল এসেছিল ৮০০ টাকা, অথচ এ মাসে এসেছে ২ হাজার ৪০০ টাকা। এই বিল সংশোধন করাতেও এখন অনেক কাঠখড় পোড়াতে হচ্ছে।’

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বোয়ালখালী জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) প্রকৌশলী শ ম মিজানুর রহমান ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমার এলাকা শতভাগ বিদ্যুতায়নের এলাকা। তবে বর্তমানে মিটারের সংকট রয়েছে। আবাসিক ও বাণিজ্যিক মিলিয়ে প্রায় ৩০০টি সংযোগের আবেদন পেন্ডিং আছে। অনেক সময় মিটার থাকলেও তার থাকে না, আবার তার থাকলেও মিটারের সংকট দেখা দেয়।

এখানে টাকা বা অন্য কোনো অনিয়ম নেই বলে দাবি করেন তিনি।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর সদর দপ্তরের সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার নূর মোহাম্মদ ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আবাসিক মিটার সংযোগের ক্ষেত্রে এক মাসের বেশি সময় লাগার কথা না। আমাদের কিছু মালামাল সংকট আছে। তবে সেগুলো আমরা দ্রুত মোকাবিলা করার চেষ্টা করছি। বাণিজ্যিক সংযোগে অনেক সময় ভারী ট্রান্সফর্মার কিনতে হয়। গ্রাহক সেখানে চার্জ বহন করতে চান না, তখন কিছুটা সময় লাগে।

‘বাসা-বাড়ির সংযোগ দ্রুত দিয়ে থাকি আমরা। সেক্ষেত্রে আপনি ভুক্তভোগীর ঠিকানা বললে বিষয়টি তদন্ত করব’, বলেন তিনি।

 

 

 

 

 

 

-