২ মামলায় সাজা, গ্রিন হওয়ার পরও ফেরদৌস স্টিলের বিরুদ্ধে মামলা

সিফায়াত উল্লাহ
সিফায়াত উল্লাহ

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের বিরুদ্ধে প্রায় এক দশকে শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে তিনটি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে দুটি মামলায় প্রতিষ্ঠানটিকে দোষী সাব্যস্ত করে জরিমানাও করেছেন আদালত। সর্বশেষ চলতি বছরও একই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করেছে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই)।

গত ১৪ আগস্ট ফেরদৌস স্টিলের ইয়ার্ডে এলএনজিবাহী জাহাজ এমটি রাসিতে বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসে নয় শ্রমিকের মৃত্যুর পর প্রতিষ্ঠানটির শ্রমিক নিরাপত্তা ও কমপ্লায়েন্স নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। দুর্ঘটনার সময় ইয়ার্ডটি হংকং কনভেনশনের আওতায় ‘গ্রিন শিপইয়ার্ড’ হিসেবে পরিচালিত হচ্ছিল।

ডিআইএফই ও চট্টগ্রাম শ্রম আদালতের নথি অনুযায়ী, ফেরদৌস স্টিলের বিরুদ্ধে ২০১৭, ২০১৮ ও ২০২৬ সালে শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে তিনটি মামলা করা হয়। এর মধ্যে ২০১৭ ও ২০১৮ সালের দুটি মামলায় আদালত প্রতিষ্ঠানটিকে দোষী সাব্যস্ত করেন।

২০১৭ সালের ২৩ আগস্ট শ্রম আইন, ২০০৬-এর ৩০৭ ধারা লঙ্ঘনের অভিযোগে প্রথম মামলাটি করেন ডিআইএফই চট্টগ্রামের পরিদর্শক গোবিন্দ মজুমদার।

মামলায় তৎকালীন মালিক মো. লোকমান হাকিম ও ইয়ার্ড ম্যানেজার মো. ইউসুফ আলীকে আসামি করা হয়। লোকমান হাকিম বর্তমান মালিক ফেরদৌস ওয়াহিদের বাবা।

ওই বছরের ১৮ অক্টোবর চট্টগ্রাম শ্রম আদালত-১ ফেরদৌস স্টিলকে দোষী সাব্যস্ত করে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করেন।

এর এক বছরের কিছু বেশি সময় পর, ২০১৮ সালের ৪ সেপ্টেম্বর একই ধারায় ফেরদৌস স্টিলের বিরুদ্ধে আবারও মামলা করে ডিআইএফই। ওই মামলাতেও লোকমান হাকিম ও ইউসুফ আলীকে আসামি করা হয়।

২০১৮ সালের ৫ নভেম্বর আদালত প্রতিষ্ঠানটিকে আবারও দোষী সাব্যস্ত করে ২ হাজার টাকা জরিমানা করেন।

গ্রিন হওয়ার পরও নতুন মামলা

বাংলাদেশে হংকং কনভেনশন (এইচকেসি) ২০২৫ সালের ২৬ জুন বাধ্যতামূলক হয়। এর আওতায় শ্রমিকের নিরাপত্তা ও পরিবেশগত মান নিশ্চিত করে অনুমোদিত ইয়ার্ডে জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করার বিধান রয়েছে। এসব ইয়ার্ডকে সাধারণত ‘গ্রিন শিপইয়ার্ড’ বলা হয়।

দেশে বর্তমানে ৩১টি কার্যকর জাহাজভাঙা ইয়ার্ডের মধ্যে ২৩টি গ্রিন সার্টিফিকেশন পেয়েছে। আরও আটটি ইয়ার্ড ট্রায়াল ভিত্তিতে কার্যক্রম চালাচ্ছে। ফেরদৌস স্টিল এই ২৩টি গ্রিন ইয়ার্ডের একটি।

তবে গ্রিন শিপইয়ার্ড হিসেবে কার্যক্রম শুরুর পরও প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে নতুন মামলা হয়েছে।

ডিআইএফই চট্টগ্রামের পরিদর্শক সাহেদ পারভেজ তালুকদার চলতি বছর চট্টগ্রাম শ্রম আদালত-১-এ মামলাটি করেন। এতে বর্তমান মালিক ফেরদৌস ওয়াহিদ ও ইয়ার্ড ম্যানেজার মো. ইউসুফ আলীকে আসামি করা হয়েছে।

ডিআইএফই চট্টগ্রামের উপমহাপরিদর্শক মাহাবুবুল হাসান বলেন, আগের দুটি মামলায় আদালতের রায়ে ফেরদৌস স্টিলের শ্রম আইন লঙ্ঘন প্রমাণিত হয়েছে।

তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, চলতি বছর ইয়ার্ডটি পরিদর্শন করে আবারও আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া যায়। এ কারণে মামলা করা হয়েছে। আদালত পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে।

তিনটি মামলাতেই আসামি হওয়া ইয়ার্ড ম্যানেজার মো. ইউসুফ আলী অবশ্য বলেন, আগের মামলাগুলো হয়েছিল ইয়ার্ডটি প্রচলিত পদ্ধতিতে পরিচালিত হওয়ার সময়। তখন শ্রম আইনে নির্ধারিত অনেক সুযোগ-সুবিধা ইয়ার্ডগুলোতে চালু ছিল না।সে সময় আমরা আদালতকে বিষয়টি জানিয়েছিলাম।

গ্রিন শিপইয়ার্ড হিসেবে কার্যক্রম শুরুর পর করা সর্বশেষ মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে ইউসুফ আলী বলেন, আমরা নতুনভাবে গ্রিন ইয়ার্ড হিসেবে কাজ শুরু করেছি। তাই অনেক বিষয় সম্পর্কে আমরা জানতাম না। এখন আমরা পুরোপুরি আইন মানার চেষ্টা করছি। বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হবে।

৯ শ্রমিকের মৃত্যু

গত ১৪ আগস্ট ফেরদৌস স্টিলের ইয়ার্ডে এলএনজিবাহী জাহাজ এমটি রাসিতে বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসে নয় শ্রমিক নিহত হন। 

দুর্ঘটনার পর শিল্প মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি বিষাক্ত গ্যাসের আশঙ্কায় ঘটনাস্থলে প্রবেশ করতে পারেনি।

এর পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার শিল্প মন্ত্রণালয় বুয়েটের একজন অধ্যাপককে প্রধান করে আট সদস্যের একটি কারিগরি কমিটি গঠন করেছে।

মন্ত্রণালয়ের জাহাজ রিসাইক্লিং শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব আরিফুল ইসলাম প্রিন্স স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে এ কমিটি গঠনের কথা জানানো হয়।

বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডের (বিএসআরবি) মহাপরিচালক এ এস এম শফিউল আলম তালুকদার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, কারিগরি কমিটি দ্রুত মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করবে।