রোগী পরিবহনের সরকারি গাড়ি ও সোলার প্যানেল চেয়ারম্যানের বাড়িতে, চিকিৎসা কার্যক্রম ব্যাহত

বিদ্যুৎ ও পরিবহন ব্যবস্থার অভাবে দুর্গম কুরুকপাতায় মেডিকেল ক্যাম্পের কার্যক্রম ব্যাহত
নিজস্ব সংবাদদাতা, বান্দরবান

বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার দুর্গম কুরুকপাতা ইউনিয়নে হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সরকারিভাবে অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্প চালু করা হলেও জরুরি রোগী পরিবহন ও বিদ্যুৎ সুবিধার ঘাটতিতে চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, রোগী পরিবহনের জন্য সরকারের দেওয়া পাজেরো গাড়ি রয়েছে চেয়ারম্যানের বাড়িতে। সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জামও ব্যক্তিগত কাজেই ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে সরকারের প্রচেষ্টার কোনো সুফল পাচ্ছে না সাধারণ মানুষ।

অভিযোগের ভিত্তিতে সরেজমিনে দেখা যায়, কুরুকপাতা বাজারের মৈত্রী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্প বসিয়ে চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন তিনজন ডাক্তার ও তিনজন নার্সসহ মোট আটজন স্বাস্থ্যকর্মী।

সেখানে দায়িত্বরত ডা. মো. আমীন ও ডা. মো. শফিক জানান, দূর-দূরান্তের দুর্গম পাহাড়ি পাড়া থেকে শিশু ও সাধারণ রোগীদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে চিকিৎসা নিতে আসছেন। কেউ হেঁটে, কেউ বাঁশের তৈরি অস্থায়ী স্ট্রেচারে রোগী নিয়ে আসছেন।

ডা. আমীন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘এই দুর্গম ইউনিয়নে হামের প্রাদুর্ভাবের খবর দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার পর জেলা সিভিল সার্জনের নির্দেশে ২৫ এপ্রিল থেকে অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্প চালু করা হয়েছে। তিনজন ডাক্তার, তিনজন নার্স, একজন সহকারী সার্জন ও একজন এমএলএসএস নিয়ে আমরা কাজ করছি। ছয় মাস থেকে ছয় বছর বয়সী শিশুদের এমআর, হাম ও রুবেলা টিকাদান কার্যক্রমও চালানো হচ্ছে।’

তিনি জানান, ২৫ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ২০৬ শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ছয়জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। অধিকাংশ রোগী ভাইরাল জ্বর, কাশি, চুলকানি, নিউমোনিয়া ও অ্যালার্জিজনিত সমস্যায় আক্রান্ত।

চিকিৎসকরা জানান, কুরুকপাতা ইউনিয়নের বেশিরভাগ পাহাড়ি পাড়া এখনো বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্কের বাইরে। ফলে মেডিকেল ক্যাম্পের খবর সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই বড় চ্যালেঞ্জ। বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকায় রোগী রেফার করাও কঠিন হয়ে পরেছে।

তারা আরও জানান, বিদ্যুৎ না থাকায় নিউমোনিয়া বা শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে তাদের আলীকদম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রেফার করতে হচ্ছে। কিন্তু দ্রুত রোগী পরিবহনের জন্য কোনো অ্যাম্বুলেন্স বা জরুরি যানবাহন নেই। এতে গুরুতর রোগীদের নিয়ে চরম প্রতিকূলতায় পড়তে হচ্ছে।

সোলার
সরকার থেকে দেওয়া সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম স্থাপন করা হয়েছে চেয়ারম্যানের বাড়িতে। ছবি: স্টার

রোগীর সেবার গাড়ি চেয়ারম্যানের গ্যারেজে

দুর্গম এলাকায় রোগী পরিবহনের জন্য সরকারের দেওয়া একটি পাজেরো গাড়ি দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার হচ্ছে না। বরং সেটি উপজেলা সদরের ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. নাসির উদ্দীনের ব্যক্তিগত গ্যারেজে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা।

সরেজমিনে দেখা যায়, গাড়িটি কুরুকপাতা ইউনিয়নে না রেখে উপজেলা সদরে ফেলে রাখা হয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, জরুরি রোগী পরিবহনে গাড়িটি ব্যবহার করা হলে দুর্গম পাহাড় থেকে রোগী আনা-নেওয়া অনেক সহজ হতো।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কুরুকপাতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ক্রাতপুং ম্রো বলেন, ‘গাড়িটি ২০২৮-২৯ অর্থবছরে এলজিএসপি-৩ প্রকল্পের আওতায় দুর্গম এলাকার মানুষের জরুরি সেবার জন্য দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে গাড়ির একটি চাকা নষ্ট হয়ে অকেজো অবস্থায় রয়েছে। চাকা কিনতে আট থেকে ১০ হাজার টাকা লাগবে। আমার বাড়িতে রাখার জায়গা না থাকায় সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. নাসির উদ্দীনের বাসায় রাখা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘কেউ ব্যবহার করতে চাইলে নতুন চাকা লাগিয়ে ব্যবহার করতে পারে। আমার কোনো আপত্তি নেই।’

সরকারি সোলার প্যানেলও চেয়ারম্যানের বাড়িতে

ইউনিয়ন পরিষদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া প্রায় পাঁচ হাজার ওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল, ব্যাটারি ও আইপিএস চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত বাড়িতে স্থাপন করা হয়েছে।

এ বিষয়ে চেয়ারম্যান ক্রাতপুং ম্রো বলেন, ‘দুর্গম কুরুকপাতা ইউনিয়নে জরুরি সেবায় বিদ্যুতের ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যে ২০১৬ সালে সরকার প্রায় ৫ হাজার কিলোওয়াট সমমান সোলার প্যানেলটি দিয়েছিল। আমাদের ইউনিয়ন পরিষদের নিজস্ব ভবন না থাকায় আমি সেগুলো আমার নিজ বাড়িতে লাগিয়ে রেখেছি। মেডিকেল টিম কিংবা যেকেউ চাইলে যেকোনো সময়ে সেটিও ব্যবহার করতে দিতে আমার কোনো অসুবিধা নেই।’

তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, যখন অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্প বিদ্যুৎ সংকটে ভুগছে এবং জরুরি চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হচ্ছে, তখন সরকারি সম্পদ নিজ বাড়িতে ব্যবহার করা কতটা যৌক্তিক।

উপজেলা স্বাস্থ্যকর্মী লিটন বিশ্বাস বলেন, ‘দুর্গম কুরুকপাতা ইউনিয়নে দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ পানি, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার সংকট রয়েছে। এর সঙ্গে হাম, নিউমোনিয়া ও পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।’

স্থানীয় ম্রো ইয়ুথ অর্গানাইজেশনের নেতারা বলেন, শুধু অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্প বসিয়ে এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। জরুরি রোগী পরিবহনের জন্য সচল গাড়ি, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও স্থায়ী স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা না করলে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়বে।

এ বিষয়ে আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনজুর আলম টেলিফোনে দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘কুরুকপাতার চেয়ারম্যান যে ওই ইউনিয়নে রোগীদের সেবার জন্য সরকারের দেওয়া গাড়ি ও সোলার প্যানেল নিজের ঘরে লাগিয়ে ব্যবহার করছেন, সেই খবর আপনার মাধ্যমেই জানতে পারলাম। আমি বর্তমানে আলীকদম উপজেলার বাইরে আছি। সন্ধ্যায় উপজেলায় গিয়ে খোঁজখবর নিয়ে সত্যতা পেলে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেবো।’

তিনি বলেন, ‘এমন গাড়ি থাকলে তো আমিসহ স্থানীয় ম্রো ইয়ুথ অর্গানাইজেশনের ভলান্টিয়ারদের এত কষ্ট করে এবং অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে রোগী আনা-নেওয়ার কাজ করতে হয় না। অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্পেই অনেক রোগী সহজে চিকিৎসাও নিতে পারত।’

তিনি আরও বলেন, ‘একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে চেয়ারম্যান যদি এ কাজ করে থাকেন, তাহলে তিনি অন্যায় ও অপরাধ করেছেন।’