ঠাকুরগাঁওয়ের নারীদের ‘শাক পিতারি’ উৎসব

মো. কামরুল ইসলাম রুবাইয়াত
মো. কামরুল ইসলাম রুবাইয়াত

বনে–জঙ্গলে ও বাড়ির আশপাশে স্বাভাবিকভাবে জন্মানো বিভিন্ন ধরনের শাক রান্না করে ব্যতিক্রমী 'শাক পিতারি' উৎসবে মেতে উঠেছিলেন ঠাকুরগাঁওয়ের সোনাপাতিলা গ্রামের নারীরা।

গতকাল শনিবার সোনাপাতিলা গ্রামে বুনো শাকের ঐতিহ্যবাহী খাদ্যজ্ঞান নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় এ উৎসব।

2.jpg
ছবি: স্টার

গ্রামভিত্তিক এই আয়োজনে ছিল সম্মিলিত ভোজন, শিল্পকর্ম প্রদর্শনী, গান ও চলচ্চিত্র প্রদর্শন।

গিদরী বাউলি ফাউন্ডেশন অব আর্টস নামে একটি সংস্থা ব্রিটিশ কাউন্সিলের সহযোগিতায় এই উৎসবের আয়োজন করে।

আয়োজকদের লক্ষ্য ছিল—পরিবেশগত সংকট ও ক্রমবর্ধমান শিল্পভিত্তিক কৃষির চাপে হারিয়ে যেতে বসা খাদ্যসংস্কৃতি ও ভোজ্য উদ্ভিদ সম্পর্কে প্রজন্মান্তরের জ্ঞান সংরক্ষণ করা।

3_0.jpg
ছবি: স্টার

উৎসবে গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবারের নারীরা অংশ নেন। তারা নিজেদের বাড়ির আশপাশ ও অনাবাদি জমি থেকে সংগ্রহ করা বুনো শাক দিয়ে রান্না করা পদ নিয়ে আসেন।

খাবারগুলো নির্দিষ্ট স্থানে সাজিয়ে রাখার পর অংশগ্রহণকারীরা দর্শনার্থীদের শাক রান্নার পদ্ধতি, পাশাপাশি সেগুলোর পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্যগত উপকারিতা সম্পর্কে ব্যাখ্যা করেন।

গতকাল বিকালে উৎসবস্থল ঘুরে দেখা যায়, গ্রামীণ নারীরা হাতে রান্না করা শাকের ছোট ছোট বাটি নিয়ে এসেছেন। উৎসবে ৪০টিরও বেশি পদের রান্না করা শাক প্রদর্শিত হয়।

4_0.jpg
ছবি: স্টার

একই সঙ্গে প্রদর্শিত হয় গ্রামের শিশুদের আঁকা ছবি। এসব চিত্রকর্মে ব্যবহৃত হয়েছে রান্না করা শাকের নানা রকম পাতা। ছবির সঙ্গে শাকগুলোর বৈচিত্র্য, পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্য উপকারিতাও তুলে ধরা হয়েছে।

সোনাপাতিলা গ্রামের পার্বতী রানি ছয় পদের শাক নিয়ে উৎসবে অংশ নেন। তিনি বলেন, একসময় বাঙালির খাদ্যতালিকায় বুনো শাকের গুরুত্ব ছিল অনেক বেশি। কালীপূজার আগে গ্রামীণ হিন্দু সমাজে ১৪ ধরনের শাক খাওয়ার প্রচলন ছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে, বিশেষ করে শহুরে জীবনে এই প্রথা অনেকটাই হারিয়ে গেছে।

তিনি আরও বলেন, আয়ুর্বেদ শাস্ত্র অনুযায়ী, বর্ষার পর এই শাকগুলো খাওয়ার রীতি বহু প্রজন্ম ধরে চলে আসছে। ঋতু পরিবর্তনের সময় নানা রোগব্যাধি দেখা দেওয়ায় এসব শাক রোগ প্রতিরোধ ও আরোগ্যে সহায়ক বলে বিশ্বাস করা হয়।

একই গ্রামের ২৮ বছর বয়সী জবা রানি উৎসবে ছয় পদের শাক রান্না করে এনেছেন। এর মধ্যে ছিল গিমা তিতা, বথুয়া, ঢেঁকিশাক, ধুলফি, হেলেঞ্চা ও কলমি। তিনি জানান, বাড়ির আশপাশ ও অনাবাদি জমি থেকেই এসব শাক সংগ্রহ করেছেন।

২০২২ সালে উৎসব শুরু হওয়ার পর থেকে তিনি নিয়মিত এতে অংশ নিচ্ছেন বলে জানান।

গ্রামের নসিমন বেগম (৫০) ও রেজিনা (৪৫) বলেন, এই উৎসব তাদের একে অপরের সঙ্গে দেখা করার ও ভিন্ন ভিন্ন রান্নার স্বাদ নেওয়ার সুযোগ করে দেয়।

প্রদর্শনীতে রাখা ছাপচিত্রের দিকে ইঙ্গিত করে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জ্যোতি রানি বলেন, স্থানীয় শিশুদের আঁকা এসব শিল্পকর্মে বাড়ির আঙিনা, আশপাশের এলাকা ও ফসলি জমিতে জন্মানো শাকের নাম, পুষ্টিগুণ ও উপকারিতা তুলে ধরা হয়েছে।

ঠাকুরগাঁও পৌরসভার সরকারপাড়া এলাকার শিক্ষার্থী চৌধুরী ফারদিন বলেন, শুধু শাককে কেন্দ্র করে এমন আয়োজন কল্পনাই করা যায় না। আমি গুণে দেখেছি, এখানে ৮০ ধরনের শাকের রান্না ছিল। এর বেশিরভাগই আমি চিনতাম না। প্রথমবারের মতো ঘেঁচু, শুষনি ও শোলকা শাকের স্বাদ নিলাম।

খাবার ও শিল্পকর্ম প্রদর্শনের পাশাপাশি গ্রামীণ নারীদের কয়েকটি দল সম্মিলিত গীত পরিবেশন করেন। তাৎক্ষণিকভাবে রচিত এসব গানে ঐতিহ্যবাহী খাবারের উপকারিতা তুলে ধরা হয়।

পরে নারীরা ও শিশুরা একসঙ্গে পুকুরপাড়ে বসে খাবার উপভোগ করেন।

উৎসবের শেষ পর্বে শাক সংগ্রহ, রান্না, হাতে তৈরি কাগজে ছাপচিত্র ও সংগীত পরিবেশনা নিয়ে নির্মিত একটি তথ্যচিত্র দেখানো হয়।

গিদরী বাউলি ফাউন্ডেশন অব আর্টসের গবেষণা ও পরিকল্পনা পরিচালক সালমা জামাল বলেন, চার বছর আগে খুব ছোট পরিসরে এই উৎসব শুরু হয়।

তিনি বলেন, আমাদের বাড়ির আশপাশে স্বাভাবিকভাবে জন্মানো শাকগুলোর প্রতি আমরা খুব কমই নজর দেই। অথচ আজ আগাছানাশক ব্যবহারের কারণে এসব মূল্যবান উদ্ভিদ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এই শাকগুলো সংরক্ষণ ও গ্রামীণ ঐতিহ্য রক্ষার লক্ষ্যে আমরা এই উৎসবের আয়োজন করেছি।

সালমা বলেন, বর্তমান প্রজন্মকে এসব শাকের নাম ও উপকারিতা এই উৎসবের মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া ও ছড়িয়ে দেওয়াই আমাদের উদ্দেশ্য।