জবই বিলে মাছ-পাখি-প্রকৃতি প্রেমীদের মিলনমেলা

মোস্তফা সবুজ
মোস্তফা সবুজ

নওগাঁ জেলার সাপাহার উপজেলায় বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে উত্তরবঙ্গের এক বিশাল প্রাকৃতিক জলাভূমি জবই বিল।

উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বর্ষা মৌসুমে বিলটির আয়তন প্রায় ৫ হাজার একর এবং শুকনো মৌসুমে প্রায় দেড় হাজার একর। 

তবে সরকারি হিসাবে, এই বিলের আয়তন ৯৯৯ একর বা ৪০৩ হেক্টর। বিলের একটি অংশ ভারতের একটি জলাশয়ের সঙ্গে যুক্ত।

বিশাল আকৃতির এই প্রাকৃতিক জলাভূমি এখন স্থানীয়দের কাছে একটি আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে। বিশেষ করে ঈদ এবং অন্যান্য সামাজিক উৎসবের সময় হাজারো পর্যটকের ঢল নামে এখানে। 

ঈদের ছুটিতে বাড়ি আসা অনেক মানুষ গত দুইদিন ধরে ভিড় করছে জবই বিলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে। বর্ষাকালে বিশাল জলাভূমি এবং পরিযায়ী পাখিদের কলরব এবং শুকনো মৌসুমে বিস্তীর্ণ সবুজ ধান খেত, খোলা হাওয়া স্থানীয় পর্যটকদের আকর্ষণ করে।

জবই বিল.jpg
শীতকালে নানা প্রজাতির পাখ-পাখালির ডাকে ভিন্ন প্রাণের সঞ্চার হয় জবই বিলে। ফাইল ছবি

নওগাঁ শহর থেকে আজ রোববার বিকেলে থেকে জবই বিলে ঘুরতে এসেছেন ওয়াসিম আকরাম। তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'কোলাহলমুক্ত এক চমৎকার জায়গা জবই বিল। আগে এখানে বসার মতো জায়গা ছিল না। এখন পাবলিক টয়লেটসহ অনেক কিছু করা হয়েছে। ছেলে-মেয়ে সবাই ঘুরতে আসতে পারছে।'

স্থানীয় যুবক সোহেল রানা ডেইলি স্টারকে বলেন, 'জবই বিলে বর্ষাকালে অথৈ পানি, শীতকালে পরিযায়ী পাখিদের ঝাঁক ধরে চলা এবং শুকনো মৌসুমে সবুজের সমারোহ পর্যটকদের আকর্ষণ করে। তাছাড়া উপজেলায় খুব বেশি আকর্ষণীয় স্থান না থাকায় এখানে ঘুরতে আসেন স্থানীয়রা। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আলোকচিত্রীরা আসেন শীতকালে পাখিদের ছবি তুলতে।'

সোহেল রানা বলেন, 'উপজেলা প্রশাসন পর্যটকদের জন্য অনেক কিছু করেছে। আশা করছি অল্প সময়ের মধ্যে জবই বিল নওগাঁর একটা জনপ্রিয় পর্যটনস্থল হিসেবে পরিচিতি পাবে।'

বিলের মৎস্য সম্পদ রক্ষা, পরিযায়ী পাখিদের আবাসস্থল নিরাপদ রাখা এবং পর্যটকদের সুবিধার জন্য সম্প্রতি বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।

বিলের মাঝ দিয়ে রাস্তা এবং ব্রিজের দুপাশে ১৫টি কংক্রিটের বেঞ্চ, একটি সেলফি পয়েন্ট, বিলের সৌন্দর্য দেখার জন্য দুটি ভিউ পয়েন্ট নির্মাণ করেছে উপজেলা প্রশাসন। 

এ সব কাজই গত এক বছরে হয়েছে বলে উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়।

সম্প্রতি বিলের মৎস্য সম্পদের প্রতীক হিসেবে ৪টি মাছের সমন্বয়ে একটি সুবিশাল ভাস্কর্য মৎস্য চত্বর) নির্মাণ করা হয়েছে। ভাস্কর্যটি এই ঈদের আগে পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। 

জবই বিল.jpg
শুকনো মৌসুমে জবই বিলের বিস্তীর্ণ সবুজ ধান খেতে খোলা হাওয়া। ছবি: সংগৃহীত

এছাড়া রাস্তার দুপাশের তালগাছ এবং নিরাপত্তা খুঁটিগুলোকে সুসজ্জিত করা হয়েছে।

পর্যটকদের সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে শিগগির এখানে পাবলিক টয়লেট, পর্যটকদের জন্য সুপেয় পানি, একটি ক্যাফে নির্মাণ করা হবে বলে জানা গেছে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিলটি ভারতের দক্ষিণ দিনাজপুরের পুণর্ভবা নদী থেকে উৎপত্তি হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। অনেকে বলেছেন, বিলটি জবই গ্রামের কাছাকাছি উৎপত্তি হয়ে ভারত সীমান্তে প্রবেশ করে পুণর্ভবা নদীতে গিয়ে পড়েছে। জবই গ্রামের কাছাকাছি বলে স্থানীয়রা এর নাম দিয়েছেন জবই বিল।

ডুমরইল, বোরা মির্জাপুর, মাহিল ও কালিন্দার মূলত এই ৪টি বিলের সমন্বয়ে এই জবই বিল।

গত ১১ এপ্রিল সাপাহারের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জবই বিলের মাহিল বিলের একটি অংশ, কালিন্দা বিলের একটি অংশ এবং ডুমরইল বিলের প্রথম ও দ্বিতীয় অংশকে মা মাছের জন্য অভয়াশ্রম ঘোষণা করেছেন।

ইউএনও আব্দুল্লাহ আল মামুন ডেইলি স্টারকে বলেন, 'মূলত দেশি প্রজাতির মা-মাছ নিধন বন্ধের জন্যই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।'

তিনি জানান, শীতকালে মৎস্য শিকারের সময় পরিযায়ী পাখিরা ভয় পেয়ে চলে যায়। তাই মৎস্য আহরণের সময় যেন পাখিরা বিলের এই ৪টি এলাকায় আশ্রয় নিতে পারে সেটাও মাথায় রাখা হয়েছে।

প্রায় সারা বছর প্রাণ-প্রকৃতিতে মুখরিত থাকলেও, শীতকালে বদলে যায় বিলের পরিবেশ। নানা প্রজাতির পাখ-পাখালির ডাকে ভিন্ন প্রাণের সঞ্চার হয় বিলটিতে।

প্রতি বছর নভেম্বরের শেষ দিকে আসতে শুরু করে হাজার হাজার শীতের পাখি। দেশীয় নানা জাতের মাছে ভরপুর এই বিলে নিরাপদে থাকতে চায় পাখিরা।

jbi_bil_1.jpg
জবই বিলের আসা পরিযায়ী পাখি। ফাইল ফটো

কিন্তু বছরের প্রায় ৬ মাস শত শত স্থানীয় জেলে এখানে মাছ শিকার করে। ফলে পরিযায়ী পাখিদের নির্ভয়ে থাকা কঠিন হয়ে যায়।

পরিযায়ী পাখিদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে স্থানীয় কয়েকজন তরুণ ২০১৮ সাল থেকে গড়ে তুলেছেন জবই বিল জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও সমাজ কল্যাণ সংস্থা।

সংগঠনটির সভাপতি মো. সোহানুর রহমান সবুজ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, '১৯৯০ সালের আগে বিলটি পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। এখন উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় স্থানীয় মৎস্যজীবীদের একটি সমিতি মাছ চাষ করে। বিলে পাখির জন্য প্রচুর খাবার থাকলেও নিরাপদ আবাসস্থল নেই। বিলের ৪টি অংশ অভয়াশ্রম ঘোষণা করায় মাছের খাদ্য হয়ত আরও বাড়বে। কিন্তু গাছ না থাকলে পাখিরা ভালো থাকতে পারবে না।'

সোহান বলেন, 'বিলের মধ্যে সামাজিক বন বিভাগের প্রায় সাড়ে ১২ একর জমি আছে। আমরা বন বিভাগকে অনুরোধ করেছি এখানে নতুন বন সৃজন করে সেটাকে যেন বিশেষ "জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ অঞ্চল" ঘোষণা করা হয়। তাহলে দেশি পাখিরাও সেখানে আশ্রয় পাবে এবং প্রজনন করতে পারবে।'

'আমরা ইতোমধ্যে বিলের চারপাশে প্রায় ৫ হাজার গাছ লাগিয়েছি। এর মধ্যে অনেক গাছ এখন বড় হয়ে গেছে,' যোগ করেন তিনি।

এই বিলে শীতকালে প্রায় ২৮-৩০ প্রজাতির পাখি আসে বলে জানান তিনি।