বঙ্গোপসাগরে পাওয়া ৮ কেজির এই মাছটির নাম কী, কত টাকায় বিক্রি হলো?
গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে ছোট ইলিশের সঙ্গে হঠাৎ জালে উঠে আসে একটি বড় মাছ। পরে আলীপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে আনার পর জানা যায়, এটি বিরল প্রজাতির কালো দাতিনা বা ‘গোল্ডসিল্ক সিব্রিম’। স্থানীয় জেলেদের কাছে পরিচিত ‘কালো পোয়া’ বা ‘ব্ল্যাক ডায়মন্ড’ নামে।
আজ মঙ্গলবার সকালে পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার আলীপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে মেসার্স সাগর ফিসের আড়তে ডাকের মাধ্যমে ৮ কেজি ওজনের মাছটি ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। অর্থাৎ প্রতি কেজির দাম পড়ে ৫ হাজার টাকা।
মাছটি কিনে নেন ফ্রেশ ফিস কুয়াকাটার স্বত্বাধিকারী পি এম মুসা।
তিনি বলেন, মাছটি রপ্তানির জন্য প্রস্তুত করা হবে।
এফবি মিম ট্রলারের জেলে সিদ্দিক বলেন, ছোট জাটকা ইলিশের সঙ্গে জলে এই দাতিনা মাছটি ধরা পড়ে। খুব ভালো দামে বিক্রি করেছি। এ ধরনের মাছ পেলে আমরা আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারি। তাই খুব খুশি।
মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের সংশ্লিষ্টরা জানান, এ প্রজাতির মাছ সাধারণত জেলেদের জালে নিয়মিত ধরা পড়ে না। তবে সম্প্রতি আলীপুরে এ ধরনের মাছ ধরা পড়ার ঘটনা নিয়ে জেলেদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
এদিকে, বিরল মাছটি ধরা পড়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে দেখতে আড়তে ভিড় করেন উৎসুক মানুষ।
এর আগে গত ২ আগস্ট সাড়ে চার কেজি ওজনের আরও একটি কালো দাতিনা মাছ ৭২ হাজার টাকায় কিনেন পি এম মুসা।
স্থানীয় মৎস্য ব্যবসায়ীরা জানান, আকার ও মানভেদে এ ধরনের মাছের দাম কখনো কখনো আরও বেড়ে যায়।
সিফাত ফিসের আড়ৎদার মীর মিজানুর রহমান ডেইলি স্টারকে বলেন, আজকে মাছটি কম দামেই বিক্রি হয়েছে। মাঝে মাঝে চার লাখ টাকা মণ দরে এসব মাছ বিক্রি হয়। এমন দামি মাছ পাওয়ায় জেলেদের পাশাপাশি আমরাও খুশি।
পটুয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজন কুমার নন্দী ডেইলি স্টারকে বলেন, কালো দাতিনা বিরল প্রজাতির মাছ। এটির বৈজ্ঞানিক নাম অ্যাকান্থোপ্যাগ্রাস বার্ডা। ইংরেজিতে এটি গোল্ডসিল্ক সিব্রিম নামে পরিচিত। সুন্দরবন অঞ্চল ও বাংলাদেশের উপকূলীয় লোনা ও আধা-লোনা পানিতে এ মাছ পাওয়া যায়। অঞ্চলভেদে কালো দাতিনা, সাদা দাতিনা, জাতি দাতিনা বা রাজা দাতিনা নামেও এটি পরিচিত।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারেও এই মাছের চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে এর বায়ুথলি বা এয়ার ব্লাডার বিভিন্ন পণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হওয়ায় মাছটির দাম তুলনামূলক বেশি। সাধারণত ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এসব মাছ রপ্তানি করা হয়।
ডব্লিউসিএস ও ওয়ার্ল্ডফিশের সমন্বয়ে বাস্তবায়িত ‘সুস্থ সাগর’ প্রকল্পের গবেষণা সহকারী মো. বখতিয়ার রহমান ডেইলি স্টারকে বলেন, কালো দাতিনা মাছ সর্বোচ্চ প্রায় ৯০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। তবে বাংলাদেশের উপকূলে জেলেদের জালে সাধারণত প্রায় ৩৫ সেন্টিমিটার আকারের মাছই বেশি পাওয়া যায়।
তিনি বলেন, এই মাছের খাবারের তালিকায় রয়েছে ছোট কাঁকড়া ও চিংড়ি, ছোট মাছ, শামুক-ঝিনুক এবং সমুদ্রের তলদেশের বালু বা কাদায় থাকা বিভিন্ন সামুদ্রিক কৃমি। শক্তিশালী চোয়ালের কারণে শক্ত খোলসের কাঁকড়া বা চিংড়িও সহজে খেতে পারে এরা।
তবে জলবায়ু পরিবর্তন ও উপকূলীয় পরিবেশ দূষণের কারণে এই মাছের প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র হুমকির মুখে পড়ছে বলে মনে করেন গবেষকরা।
বখতিয়ার রহমান বলেন, নীল অর্থনীতির বিকাশ এবং উপকূলীয় মানুষের পুষ্টির চাহিদা পূরণে কালো দাতিনার কৃত্রিম প্রজনন প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন। একইসঙ্গে এই মাছের প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষায় গুরুত্ব দিতে হবে।