ভারী বর্ষণ ও জোয়ারে চট্টগ্রামে আবারও জলাবদ্ধতা

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম

ভারী বর্ষণ ও জোয়ারের পানির তোড়ে চট্টগ্রামের বিশাল এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে নগরের পরিবহন ব্যবস্থা যেমন বিপর্যস্ত হয়েছে, তেমনি সাধারণ মানুষও চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।

পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস আজ সোমবার সকাল ৯টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় ১৮৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে। এর মধ্যে সকাল ৬টা থেকে ৯টার মধ্যেই ৮১ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।

আবহাওয়াবিদ মো. ইসমাইল ভূঁইয়া সতর্ক করে বলেন, লঘুচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আরও দু-তিন দিন এই ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে।

কাতালগঞ্জ, বাকলিয়া, চকবাজার, নিউ মার্কেট, রিয়াজউদ্দিন বাজার, কাপাসগোলা, আগ্রাবাদ, হালিশহর ও চান্দগাঁওয়ের মতো প্রধান বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকাগুলোতে হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি জমেছে।

উড়ালসড়কেও জমেছে পানি। আখতারুজ্জামান চৌধুরী ফ্লাইওভারের ওপর পানি জমে থাকতে দেখা গেছে, যা যানবাহনের গতি কমিয়ে দিয়েছে।

চলমান গ্যাস সংকটের কারণে সিএনজিচালিত অটোরিকশা রাস্তায় কম থাকায় মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। এতে অফিসগামী যাত্রী ও শিক্ষার্থীরা রাস্তায় আটকা পড়েছেন।

কাতালগঞ্জের বাসিন্দা আব্দুল আজিজ বলেন, সকালে বেরিয়ে দেখি রাস্তা ডুবে আছে। জুলাই মাসেই আমরা টানা তিন দিন ঠিক একই রকম দুঃস্বপ্নের মতো পরিস্থিতি পার করেছি। প্রতি বর্ষায় একই দুর্ভোগ ফিরে ফিরে আসে। এর কোনো স্থায়ী সমাধান দেখা যাচ্ছে না।

ছবি: রাজীব রায়হান

চকবাজারের বাসিন্দা মোস্তফা কামাল বলেন, সকালে অফিস যাওয়ার সময় রাস্তায় সবখানে পানি ছিল এবং যানবাহনও ছিল খুব কম। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে অনেক সময় লাগছে। বৃষ্টির সঙ্গে যানবাহনের সংকট আমাদের দুর্ভোগ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

চকবাজার এলাকার চক সুপার মার্কেটের নিচতলায় পানি ঢুকে দোকানের মালামাল নষ্ট হয়ে গেছে। মার্কেটের দোকানি মো. মুন্না বলেন, নোংরা পানিতে আমার প্রায় দুই লাখ টাকার মালামাল নষ্ট হয়ে গেছে।

প্রকল্পের বিলম্ব ও ব্যয় বৃদ্ধি

নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার চারটি মেগা ড্রেনেজ প্রকল্পে বিলম্ব, ত্রুটিপূর্ণ পরিকল্পনা ও কাজ বন্ধ থাকায় জলাবদ্ধতা আরও প্রকট হয়েছে।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) বড় বাজেটের প্রকল্পের কোনোটিই নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়নি।

২০১৭ সালে ৩৬টি খালের সংস্কারের জন্য সিডিএর যে মেগা প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল, তার বাজেট ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৮ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা হয়েছে।

প্রকল্পের মেয়াদও ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়। বলা হচ্ছে, এর ৯৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।

২০১৯ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ড স্লুইস গেট ও প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণের যে প্রকল্প শুরু করেছিল, তা ২০২১ সালের জুনের সময়সীমা পার করেছে।

মুদ্রাস্ফীতি ও ব্যয় বৃদ্ধির কারণে প্রকল্পের বাজেট কমিয়ে ১ হাজার ৫০৮ কোটি টাকা করা হয়েছে (স্লুইস গেট ২৩টি থেকে কমিয়ে ২১টি করা হয়েছে)। প্রকল্পের সময়সীমা ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে এবং তা ২০২৭ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর চিন্তাভাবনা চলছে।

কর্ণফুলী নদীর পাড়ে জোয়ারের পানি আটকানোর জন্য সিডিএর রিং রোড ও প্রতিরক্ষা বাঁধ প্রকল্পটি শুরু হয় ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে। এর ব্যয় ২ হাজার ৩১০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২ হাজার ৭৭৯ কোটি টাকা হয়েছে। বর্তমানে ৮৬ শতাংশ কাজ শেষ হওয়া এই প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

বাড়ইপাড়া থেকে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত নতুন খাল খননের জন্য চসিকের ১ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকার প্রকল্প বর্তমানে ৯৫ শতাংশ শেষ হয়েছে। এটিও নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়নি।

ছবি: রাজীব রায়হান

সেনাবাহিনীর ৩৪তম ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড পরিচালিত সিডিএর খাল প্রকল্পের কাজ এপ্রিলের শেষ থেকে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। খননকাজের জন্য খালের ভেতর দেওয়া অস্থায়ী মাটির বাঁধগুলো বৃষ্টির সময় পানি চলাচলে বাধা দেয়, ফলে প্রবর্তক মোড়ের মতো এলাকায় তীব্র জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।

গত ২৯ এপ্রিল জনগণের তীব্র প্রতিবাদের পর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় পানি চলাচলের সুবিধার্থে সব অস্থায়ী মাটির বাঁধ অপসারণের নির্দেশ দেয়। সিডিএ কর্মকর্তারা জানান, এর ফলে হিজড়া খাল, জামাল খান খাল ও চাক্তাই খালের কাজ আগামী অক্টোবর পর্যন্ত বন্ধ রাখতে হচ্ছে।

সিডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী আহমেদ মঈনুদ্দিন বলেন, প্রধান খালগুলোতে মাত্র ১৫ থেকে ২০ দিনের কাজ বাকি ছিল, কিন্তু অসময়ের বৃষ্টির কারণে সেই কাজ শেষ করার সুযোগ পাওয়া যায়নি।

প্রকল্প পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মহসিনুল হক চৌধুরীর দাবি, কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন হলে নগরীর জলাবদ্ধতা ৭৫ শতাংশ কমে আসবে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রকল্পগুলোতে চট্টগ্রামের ভৌগোলিক বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।

ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (আইইবি) চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক সভাপতি প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার জানান, জোয়ারের সময় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ৫ মিটারের বেশি বেড়ে যায়, অথচ শহরের নিচু এলাকাগুলোর উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ২ থেকে ৩ মিটার।

তিনি আরও বলেন, শহরের এক সময়ের ১০৪টি খালের মধ্যে বর্তমানে মাত্র ৫৭টি টিকে আছে, যার মধ্যে কেবল ৩৬টিকে প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ১৯৯৫ সালের মাস্টার প্ল্যানের পরামর্শ অনুযায়ী রিটেনশন পন্ড তৈরি না করলে চট্টগ্রাম আগামী বহু বছর এই সংকটের মুখেই থাকবে।