এসএসসি-এইচএসসিতে মেয়েরা এগিয়ে, উচ্চশিক্ষা ও চাকরিতে কেন পিছিয়ে

আবদুল্লাহ হেল বুবুন

প্রায় এক দশক ধরে স্কুলের পরীক্ষায় মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে ভালো করছে। এসএসসি ও এইচএসসিতে পাসের হার বেশি, জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যাতেও ছাত্রীরাই এগিয়ে। কিন্তু পড়াশোনার এই সাফল্য উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনে গিয়ে আর ধরে রাখতে পারছে না তারা। বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীদের অংশগ্রহণ কম, চাকরির বাজারেও তাদের উপস্থিতি পুরুষের তুলনায় অনেক কম। সরকারি চাকরি থেকে শুরু করে ব্যবস্থাপনার পদ, সব জায়গাতেই দেখা যাচ্ছে একই চিত্র। বাল্যবিয়ে, সংসারের কাজ ও সন্তান-পরিবারের দায়িত্বের বড় অংশ নারীদের ওপর থাকাই এর অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ২০২৫ সালের বৈশ্বিক লিঙ্গবৈষম্য প্রতিবেদনে বিষয়টি বেশ পরিষ্কারভাবে উঠে এসেছে। এতে দেখা যায়, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বে প্রথম। কিন্তু উচ্চশিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণে বাংলাদেশের অবস্থান ১২৫তম।

চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষাতেও মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে ভালো ফল করেছে। দেশের নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের সব কটিতেই ছাত্রীদের পাসের হার ছাত্রদের চেয়ে বেশি। জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যাতেও ছাত্রীরা এগিয়ে। ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীদের পাসের হার ৮ শতাংশের বেশি। আর জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্রীদের সংখ্যা ছাত্রদের চেয়ে ১১ হাজার ৪০১ জন বেশি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বলছে, ২০১৭ সাল থেকে প্রতি বছরই এসএসসি পরীক্ষায় ছাত্রীদের পাসের হার ছাত্রদের চেয়ে বেশি।

২০১৮ সাল থেকে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যাতেও ছাত্রীরা ছাত্রদের চেয়ে এগিয়ে। ওই বছর ছেলেদের চেয়ে ৩১৭ জন বেশি মেয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছিল। এরপর থেকে এই ব্যবধান ক্রমেই বেড়েছে।

২০২০ সাল থেকে এইচএসসি পরীক্ষাতেও জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যায় মেয়েরা নিয়মিতভাবে ছেলেদের ছাড়িয়ে যাচ্ছে। যেমন ২০২৫ সালে ছেলেদের চেয়ে ৫ হাজার ৯৭ জন বেশি মেয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে।

রাজউক উত্তরা মডেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক মো. সোলায়মান কবির বলেন, শিক্ষকতা জীবনে তিনি নিয়মিতই দেখেছেন, পড়াশোনায় মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে ভালো করছে। মেয়েরা সাধারণত পড়াশোনায় বেশি মনোযোগী, পরিশ্রমী ও নিয়ম মেনে চলে। তারা পড়াশোনাকে বেশি গুরুত্ব দেয়।

বিষয়টি আরও চোখে পড়ার মতো। কারণ প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক—তিন পর্যায়েই শিক্ষার্থীর সংখ্যায় মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে বেশি।

কিন্তু মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে এত ভালো করার পরও দেশের সরকারি, বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মোট শিক্ষার্থীর মাত্র এক-তৃতীয়াংশের কিছু বেশি নারী। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ২০২২ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।

উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণের হারেও বড় ব্যবধান রয়েছে। বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার বয়সী নারীদের ছয়জনের মধ্যে একজনেরও কম উচ্চশিক্ষায় যায়। অন্যদিকে, একই বয়সী পুরুষদের প্রায় চারজনের একজন উচ্চশিক্ষায় যায়।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনেও দেখা গেছে, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত—এই বিষয়গুলোতে পুরুষ শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নারীদের চেয়ে বেশি। এসব বিষয়ে পড়াশোনা করলে সাধারণত ভালো বেতনের চাকরি পাওয়ার সুযোগও বেশি থাকে।

প্রায় ১২ দশমিক ৩৪ শতাংশ পুরুষ স্নাতকের এই চার বিষয়ের কোনো একটিতে ডিগ্রি রয়েছে। নারীদের ক্ষেত্রে এই হার ৮ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ।

চাকরির বাজারে গিয়ে ব্যবধান আরও বড় হয়ে যায়। শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষা শেষ করা পুরুষদের প্রায় অর্ধেক, ৪৭ দশমিক ১৩ শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক চাকরিতে আছেন। একই শিক্ষাগত যোগ্যতার নারীদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ২৯ দশমিক ৮৮ শতাংশ।

সরকারি চাকরিতেও একই ধরনের চিত্র দেখা যায়। বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৪৫তম বিসিএসে নিয়োগের জন্য সুপারিশ পাওয়া প্রার্থীদের মাত্র ২১ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ নারী।

৪১, ৪২, ৪৩ ও ৪৫তম বিসিএসের ফলাফল দেখলেও একই চিত্র পাওয়া যায়। সফল প্রার্থীদের মধ্যে নারীর সংখ্যা মোটামুটি এক-পঞ্চমাংশের কাছাকাছি ছিল।

৪১তম বিসিএসে সফল প্রার্থীদের ২৬ দশমিক ৭১ শতাংশ ছিলেন নারী। ৪৩তম বিসিএসে এই হার কমে ১৯ দশমিক ৪৬ শতাংশে নেমে আসে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে মধ্যম ও উচ্চপর্যায়ের ব্যবস্থাপনা পদে থাকা ব্যক্তিদের মাত্র ৭ দশমিক ২২ শতাংশ নারী ছিলেন। ২০২৩ সালে এই হার ছিল ৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ এবং ২০২২ সালে ৭ দশমিক ৫২ শতাংশ।

লিঙ্গবৈষম্য নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। অল্প বয়সে বিয়ে, সংসারের কাজে অসম দায়িত্ব এবং নারীদের নিয়ে সমাজে গেঁথে থাকা পুরোনো ধারণাগুলো এর অন্যতম।

বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ ২০২২-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের প্রায় ৮০ শতাংশই বিবাহিত। এই বয়সেই সাধারণত নারীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে এবং চাকরিজীবনের শুরুতে থাকে।

এমনকি ২১ বছর বা তার বেশি বয়সে বিয়ে করা নারীদের মধ্যেও প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বিয়ের পর আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি।

মাত্র ৭ দশমিক ২ শতাংশ নারী বিয়ের পর আরও তিন থেকে চার বছর পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। আর পাঁচ বছর বা তার বেশি সময় পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পেরেছেন মাত্র ২ দশমিক ৮ শতাংশ।

বাংলাদেশে বিবাহিত নারীদের ওপর ঘরের কাজ ও পরিবারের সদস্যদের দেখাশোনার দায়িত্বও তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি।

বাংলাদেশ সময় ব্যবহার জরিপ ২০২১-এর তথ্য অনুযায়ী, বিবাহিত নারীরা প্রতিদিন গড়ে ৫ ঘণ্টা ১৬ মিনিট বিনা পারিশ্রমিকে ঘরের কাজ করেন। বিবাহিত পুরুষেরা করেন মাত্র ৩৮ মিনিট। পরিবারের সদস্যদের দেখাশোনার ক্ষেত্রেও একই ধরনের বড় ব্যবধান রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন বলেন, সমাজে প্রচলিত ‘নারীরা সবকিছু সামলাতে পারে’—এই ধারণাটি এখন নারীদের জন্য উল্টো চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তার মতে, চাকরি ও সংসারের দায়িত্ব একসঙ্গে সামলানোর চাপ মূলত নারীদের ওপরই বেশি পড়ে। কিন্তু তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হয় না। ফলে অনেকে ক্লান্ত হয়ে চাকরি ছেড়ে দেন। আবার অনেকে শ্বশুরবাড়ির আপত্তির কারণেও চাকরি ছেড়ে দেন।

(এই প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন তামান্না ইয়াসমিন মারিয়া।)