উপজেলা ভবনে আর্জেন্টিনা-মিশর ম্যাচ দেখা নিয়ে প্রশ্ন করায় সাংবাদিককে মারধরের অভিযোগ

নিজস্ব সংবাদদাতা, সাভার

উপজেলা কনফারেন্স রুমে মঙ্গলবার রাত ১০টা থেকে শুরু হওয়া আর্জেন্টিনা-মিশর ম্যাচের খেলা দেখছিলেন সাভারের দুই সহকারী কমিশনার (ভূমি), কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা ও তাদের স্বজনরা।

সেসময়ের ভিডিও ফুটেজ ধারণ এবং কনফারেন্স রুমে খেলা দেখা নিয়ে প্রশ্ন করায় এক সাংবাদিককে মারধরের অভিযোগ উঠেছে।

আহত ঢাকা টুডের সাংবাদিক মো. দিদারুল ইসলাম সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি আছেন।

দিদারুল ইসলাম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'মঙ্গলবার রাত পৌনে ১১টার দিকে সাভার সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবদুল্লাহ আল আমিনকে ফোন দিই। তিনি আমাকে উপজেলা পরিষদে যেতে বলেন। ক্যামেরাম্যান মোজাহারকে নিয়ে উপজেলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় গিয়ে দেখি, তিনি আমিনবাজারের সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহাদাত হোসেন, অন্যান্য স্টাফ ও কয়েকজন বহিরাগত কনফারেন্স রুমে খেলা দেখছেন।'

'সহকারী কমিশনার আবদুল্লাহ আল আমিনকে প্রশ্ন করি, সরকারি এসি ও বিদ্যুৎ ব্যবহার করে রাতে খেলা দেখার আয়োজন কি আইনের পরিপন্থী নয়? এরপর তিনি আমার হাতে থাকা মোবাইল ফোনটি ছিনিয়ে নেন এবং অন্যরা ক্যামেরাম্যানের কাছ থেকে ক্যামেরা ছিনিয়ে মেমোরি কার্ড খুলে নেন,' বলেন দিদারুল।

পরে সেখানে উপস্থিত কয়েকজন তাকে মারধর করে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

পরে তাকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। সেখান থেকে বের হয়ে তিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হন।

জানতে চাইলে সাভার সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবদুল্লাহ আল আমিন ডেইলি স্টারকে বলেন, 'বিকেলে একটি কারখানায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চালিয়ে অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং জরিমানা করা হয়। এটা নিয়ে সাংবাদিক দিদারুল ইসলাম রাত পৌনে ১১টার দিকে আমাকে ফোন দেন। পরে তিনি ওই কারখানার লোকজন নিয়ে আমার কাছে আসেন।'

'সাংবাদিক দিদারুল ওই কারখানার পক্ষে তদবির করে জরিমানা কমানোর অনুরোধ করেন। কিন্তু আমি কিছু করার সুযোগ নেই জানালে তিনি কনফারেন্স রুমে খেলা দেখার ভিডিওধারণ করে সরকারি বিদ্যুৎ ব্যবহার করে খেলা দেখার বিষয়ে প্রশ্ন করেন,' বলে তিনি।

এই সহকারী কমিশনার আরও বলেন, 'তখন তাকে বলি, আপনি অবৈধ কারখানার পক্ষে তদবির করতে এসেছেন, আপনাকে আটক করা হলো। পরে সাংবাদিকদের অনুরোধে তার কাছ থেকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। তাকে মারধর করা হয়নি। ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতেই তিনি মারধরের অভিযোগ তুলেছেন।'

সরকারি কনফারেন্স রুমে বিদ্যুৎ ও এসি ব্যবহার করে রাতে খেলা দেখার আয়োজন আইনের ব্যত্যয় কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'এ বিষয়ে ইউএনও স্যারের সঙ্গে কথা বলাই ভালো হবে।'

যোগাযোগ করা হলে সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাইফুল ইসলাম ডেইলি স্টারকে বলেন, 'আমি ঘটনাস্থলে ছিলাম না। পরে বিষয়টি শুনেছি। ওই সাংবাদিক মোবাইল কোর্টের জরিমানা কমানোর তদবিরে এসেছিলেন। কিন্তু মোবাইল কোর্টে জরিমানা কিংবা দণ্ড হয়ে গেলে আর কিছু করার থাকে না। সহকারী কমিশনার (ভূমি) বিষয়টি বলার পর তিনি খেলা দেখার ভিডিও ধারণ করেন এবং সহকারী কমিশনারের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন।'

ইউএনও বলেন, 'সাংবাদিককে মারধরের অভিযোগ পাওয়ার পর আমি সিসিটিভি ফুটেজ দেখেছি। সেখানে মারধরের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।'

সরকারি কনফারেন্স কক্ষে খেলা দেখার আয়োজন আইনের ব্যত্যয় কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ইউএনও বলেন, '২০ জায়গায় ২০টি টেলিভিশন চালানোর চেয়ে ২০ জন একসঙ্গে বসে খেলা দেখলে বরং বিদ্যুৎ খরচ কম হয়। গতকাল বৈরী আবহাওয়া ছিল। এখানে এসি চালানো হয়নি। উপজেলার স্টাফ ও তাদের পরিবারের কয়েকজন সদস্য মিলে খেলা দেখছিলেন।'

পরে ইউএনও সাংবাদিকদের ওই ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ দেখান।

এতে দেখা যায়, মঙ্গলবার রাত ১১টা ১১ মিনিটে ক্যামেরাম্যান মোজাহারসহ ৩ জনকে নিয়ে সাংবাদিক দিদারুল ইসলাম উপজেলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় ওঠেন। অন্য তিনজনকে বাইরে রেখে তিনি একাই কনফারেন্স রুমে প্রবেশ করেন। সেখানে আর্জেন্টিনার জার্সি পরিহিত সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবদুল্লাহ আল আমিনের সঙ্গে কথা বলেন। এক মিনিট পর দুজন একসঙ্গে কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান।

রাত ১১টা ১৬ মিনিটে সাংবাদিক দিদারুল আবার কনফারেন্স রুমে প্রবেশ করে সহকারী কমিশনারের কাছাকাছি একটি চেয়ারে বসেন।

১১টা ২৮ মিনিটে তিনি কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান এবং ১১টা ৩১ মিনিটে আবার ফিরে এসে সহকারী কমিশনারের পাশে বসেন। দুজন কথা বলেন।

কিছুক্ষণ পর আর্জেন্টিনার জার্সি পরা কয়েকজন তাদের ঘিরে দাঁড়ান। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে জটলা বাড়তে থাকে। রাত ১২টা পর্যন্ত কক্ষে সেই দৃশ্য দেখা যায়।

এরপর ফুটেজে রাত ১২টা ৩৮ মিনিটের দৃশ্য দেখা যায়। সেখানে সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবদুল্লাহ আল আমিন, সাংবাদিক দিদারুল ইসলাম ও আরও কয়েকজনকে ভবনের নিচতলায় কথা বলতে দেখা যায়। রাত ১২টা ৪৩ মিনিটে সাংবাদিক দিদারুল ইসলাম সেখান থেকে চলে যান।

রাত ১২টা থেকে ১২টা ৩৭ মিনিট পর্যন্ত ৩৭ মিনিটের সিসিটিভি ফুটেজের বিষয়ে জানতে চাইলে ইউএনও মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, 'ওই ফুটেজ মোবাইলে সংরক্ষিত আছে, পরে দেখানো হবে।'