প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর: অবকাঠামো ও বিনিয়োগে নজর ঢাকার
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত প্রায় দুই বছর চীনের বিনিয়োগ ও অবকাঠামোগত অর্থায়নের গতি কিছুটা মন্থর ছিল। এখন নতুন করে সেই গতি বাড়াতে চাইছে ঢাকা।
আগামী ২৩ থেকে ২৬ জুন চীনে নিজের প্রথম সরকারি সফরে যাবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
পররাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বেশ কয়েকটি অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য চীনের কাছে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার অর্থায়ন চাইবে ঢাকা।
এ ছাড়া এই সফরে চীনের ‘গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভে (জিডিআই) বাংলাদেশের যোগ দেওয়ার ঘোষণা আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জিডিআই হলো জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে যুক্ত চীনের প্রধান উন্নয়ন রূপরেখা।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে আমাদের মূল লক্ষ্য থাকবে চীনের বিনিয়োগ আকর্ষণ করা।’
মালয়েশিয়ায় দুই দিনের সফর শেষে আগামী ২৩ জুন চীনের দালিয়ানে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ১৭তম বার্ষিক সভা ‘নিউ চ্যাম্পিয়নস ২০২৬’-এ যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই সভা ‘সামার দাভোস’ নামেও পরিচিত।
এরপর তিনি বেইজিং যাবেন এবং সেখানে গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এ চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং এবং প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন।
সফরে চীনা বিনিয়োগকারীদের নিয়ে একটি শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে তারেক রহমানের। এ ছাড়া তিনি চেরি, হোন্ডা ও চায়নাটেক্সের মতো বড় বড় কোম্পানির কর্মকর্তাদের সঙ্গেও বৈঠক করবেন।
ঢাকার পক্ষ থেকে এই সফরে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিষয়গুলোতে জোর দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীন, ভারত ও পাশ্চাত্যের মধ্যে চলমান প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে এই সফরের একটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে।
অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থায়ন
সফরে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ডজনখানেক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক গাড়ি, সৌরবিদ্যুৎ, মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন, গণমাধ্যম নিয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলের উন্নয়ন।
এসব উদ্যোগের জন্য বাংলাদেশ প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার অর্থায়ন চাইতে পারে।
এ ছাড়া জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, পাওয়ার গ্রিড শক্তিশালী করা, ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ, রাজশাহীতে পানি শোধনাগার নির্মাণ এবং চারটি জাহাজ কেনার জন্য আরও ৪ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন চাওয়া হতে পারে।
এসবের পাশাপাশি এক হাজার শয্যার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী হাসপাতাল নির্মাণে একটি সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে। হাসপাতালের জন্য মূলত অনুদান পাওয়ার কথা রয়েছে।
এটি মূলত চীনের অনুদানে নির্মিত হওয়ার কথা রয়েছে।
কর্মকর্তারা জানান, দ্বিতীয় পদ্মা সেতু এবং দ্বিতীয় যমুনা সেতুসহ বড় বড় প্রকল্পের বিষয়েও আলোচনা চলছে। তবে এবারের সফরে এসব নিয়ে বড় কোনো চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা কম।
তিস্তা প্রকল্প নিয়েও আলোচনা হতে পারে এই সফরে। তবে প্রকল্পটির ভূরাজনৈতিক স্পর্শকাতরতা ও ভারতের আপত্তির কারণে অর্থায়নের চেয়ে সম্ভাব্যতা যাচাই নিয়েই আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
এ ছাড়া ইতিমধ্যে নেওয়া চীনা ঋণের সুদের হার কমানো এবং ঋণ পরিশোধের মেয়াদ ও গ্রেস পিরিয়ড বাড়ানোর জন্যও অনুরোধ করতে পারে বাংলাদেশ।
জিডিআইয়ে যোগ দেওয়া
সরকারি কর্মকর্তারা জানান, চীনের নেতৃত্বাধীন ‘গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ (জিডিআই)-এ আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বাংলাদেশের। জাতিসংঘের ২০৩০ সালের এসডিজি বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই জিডিআই গঠন করা হয়েছে।
ইতিমধ্যে ৮২টির বেশি দেশ এই উদ্যোগে যোগ দিয়েছে, যাদের বেশির ভাগই ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা উন্নয়নশীল দেশ।
চীন দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশকে জিডিআইয়ে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছিল, তবে আগের আওয়ামী লীগ সরকার এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে যায়নি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের জন্য মুখিয়ে আছে। আর এই উন্নয়ন যাত্রায় আমাদের সহায়তা করার জন্য চীনের কাছে অর্থ ও প্রযুক্তির দুটোই আছে।’
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের আগেই চীনা কর্মকর্তারা দুই দেশের মধ্যে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) বিস্তারের পক্ষে কথা বলে আসছেন।
কর্মকর্তারা জানান, সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এবং পরিবেশবান্ধব খনি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সহযোগিতাসহ চীনের নেতৃত্বাধীন বেশ কয়েকটি আর্থিক ও বাণিজ্যিক প্ল্যাটফর্মে যোগ দিতে বাংলাদেশকে উৎসাহিত করতে পারে চীন।
এ ছাড়া চীনের মুদ্রা ইউয়ানের আন্তর্জাতিকীকরণের অংশ হিসেবে ‘পান্ডা বন্ড’ ও ‘ক্রস-বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম’ চালুর প্রস্তাবও দিতে পারে বেইজিং।
তবে এসব প্রস্তাবের বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান এখনো স্পষ্ট নয়।
বিনিয়োগ ও রপ্তানি
রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক বলেন, এই সফর বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও প্রযুক্তি হস্তান্তর সম্প্রসারণের জন্য একটি বড় সুযোগ।
তিনি বলেন, ‘উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সহায়তা করার মতো পুঁজি ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা চীনের আছে, তবে বাংলাদেশের অবস্থান হতে হবে কৌশলগত। রপ্তানিমুখী শিল্প গড়তে এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে সহায়ক প্রকল্পগুলোকেই আমাদের অগ্রাধিকার দিতে হবে।’
আবদুর রাজ্জাক আরও বলেন, সরকার ইতোমধ্যে অনুমোদন দিয়েছে, এমন চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলে ম্যানমেইড ফাইবার, চামড়াজাত পণ্য এবং পাদুকাশিল্পে চীনের বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করতে পারে বাংলাদেশ।
ইউয়ানের ব্যবহার বাড়াতে চীনের আগ্রহের বিষয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান বাণিজ্য ঘাটতির কারণে এমন পদক্ষেপ নেওয়া বেশ কঠিন।
বাংলাদেশ বর্তমানে প্রতিবছর প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য চীনে রপ্তানি করে। অন্যদিকে, দেশটি থেকে আমদানি করে ২৩ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের পণ্য।
আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘যদি চীনা কোম্পানিগুলো এখানে বিনিয়োগ করে এবং উৎপাদিত পণ্য পুনরায় চীনে রপ্তানি করে, তবে ইউয়ানের ব্যবহার হতে পারে।’
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্সের পরিচালক অধ্যাপক শেখ তৌফিক এম হক বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক নিয়ে চলমান উত্তেজনার কারণে চীন শ্রমনির্ভর শিল্পগুলো অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে, বাংলাদেশের উচিত সেই সুযোগ কাজে লাগানো।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের উচিত এই শিল্পগুলোর জন্য একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে নিজেকে তুলে ধরা এবং সে অনুযায়ী দর–কষাকষি করা।’
ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য
বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব বাড়ায় ভারত, যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্য আঞ্চলিক শক্তিগুলো প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই চীন সফরের দিকে নিবিড় নজর রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর সঙ্গে ঢাকাকে খুব সতর্কতার সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে বাণিজ্য চুক্তি সই হয়েছে, তাতে ‘নন-মার্কেট ইকোনমি’ বা বাজারভিত্তিক নয়, এমন অর্থনীতির বিষয় উল্লেখ রয়েছে। এটি মূলত চীন ও রাশিয়ার প্রতি একধরনের উদ্বেগের পরোক্ষ ইঙ্গিত।
অধ্যাপক তৌফিক বলেন, ‘চীন অবশ্যই এ বিষয়ে উদ্বিগ্ন। তবে বেইজিং এটাও বোঝে যে বাংলাদেশের কিছু বাধ্যবাধকতা রয়েছে।’
বিশ্লেষকেরা এ-ও উল্লেখ করেন যে চীন আমন্ত্রণ জানানোর আগেই ভারত তারেক রহমানকে সরকারি সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিল।
অর্থনীতিবিদ আবদুর রাজ্জাক মনে করেন, বাংলাদেশের উচিত ভূরাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল প্রকল্পগুলো এড়িয়ে চলা।
তার মতে, তিস্তা ব্যারেজের মতো প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে চীনের একা নয়, বরং জাপানের মতো দেশগুলোকে যুক্ত করে যৌথ উদ্যোগের (জয়েন্ট ভেঞ্চার) কথা বিবেচনা করা উচিত।
তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার। অন্যদিকে, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের চার হাজার কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে এবং তারা আমাদের আমদানির অন্যতম প্রধান উৎস।’
অধ্যাপক তৌফিক বলেন, সব পক্ষের সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখাটাই সবচেয়ে জরুরি।