মৌলভীবাজারে পচে যাচ্ছে কোরবানির চামড়া, ফেলা হচ্ছে নদীতে
ক্রেতার অভাব, লবণ সংকট ও টানা লোকসানের কারণে এবারের ঈদুল আজহায় মৌলভীবাজারের বিভিন্ন এলাকায় শত শত কোরবানির চামড়া নষ্ট হয়ে গেছে। কোথাও চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়েছে, কোথাও আবার নদী ও জলাশয়ে ফেলে দিতে বাধ্য হয়েছেন মানুষ।
আগের বছরগুলোর তুলনায় এবার মাদ্রাসা ও এতিমখানার শিক্ষার্থীরাও চামড়া সংগ্রহে খুব একটা সক্রিয় ছিল না। ফলে অনেক এলাকায় বাসিন্দারা সারাদিন অপেক্ষা করেও কোনো ক্রেতা পাননি।
কমলগঞ্জ উপজেলার রামচন্দ্রপুর গ্রামের জালাল মিয়া বলেন, গত বছরও পাইকার আসেনি, কিন্তু স্থানীয় মাদ্রাসার ছাত্ররা অন্তত চামড়া নিয়ে গিয়েছিল। এবার কেউই আসেনি। একদিন অপেক্ষা করে আমরা চামড়াগুলো মাটিতে পুঁতে ফেলেছি। গ্রামের প্রায় সবাই একই কাজ করেছে।
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর চামড়া সংগ্রহে অনীহার মূল কারণ আর্থিক লোকসান। রাজনগর উপজেলার কামারচাক ইউনিয়নের একটি কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা মিজান আহমেদ বলেন, চামড়া সংগ্রহের খরচই এখন বিক্রির টাকার চেয়ে বেশি। গত বছর লোকসান হয়েছিল, তাই এবার আমরা সংগ্রহ করিনি।
ব্যবসায়ীরা জানান, জেলায় দীর্ঘদিন ধরেই চামড়া সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। প্রতি পিস চামড়ার দাম মাত্র ৫০ থেকে ১০০ টাকা হওয়ায় অনেক মৌসুমী ব্যবসায়ী এবার ব্যবসায় নামতেই চাননি।
তাদের ভাষ্য, সদর উপজেলার বালীকান্দি গ্রামের কয়েকটি ডিপো ছাড়া জেলার অন্য কোথাও চামড়া সংরক্ষণের তেমন সুবিধা নেই।
বালীকান্দি বাজার কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. শওকত বলেন, এবার পরিস্থিতি খুবই খারাপ। প্রায় ২ হাজার চামড়া কেনা হয়েছে, কিন্তু যেখানে ৩০০ থেকে ৪০০ মণ লবণ দরকার, সেখানে মজুত আছে মাত্র ১৫০ মণ।
তিনি বলেন, যেসব চামড়া থেকে দুর্গন্ধ বের হতে শুরু করেছে, সেগুলো মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে বা মনু নদীতে ভাসিয়ে দিতে হবে। আর কোনো উপায় নেই।
তিনি আরও জানান, গত বছরের প্রায় ৯৫ লাখ টাকা এখনো ট্যানারি মালিক ও ডিপো ব্যবসায়ীদের কাছে বকেয়া রয়েছে। এতে স্থানীয় চামড়ার বাজার আরও সংকটে পড়েছে।
যারা ব্যবসায় নেমেছেন, তাদের অনেককেই বড় ধরনের লোকসান গুনতে হচ্ছে।
আমতৈল গ্রামের নবাব আলী ৩০০ টাকা দিয়ে দুটি চামড়া কেনেন এবং আরও ১০টি চামড়া দান হিসেবে পান। কিন্তু শহরের পৌর বাস টার্মিনালে নিয়েও কোনো ক্রেতা পাননি।
সিলেটের বালাগঞ্জ থেকে আসা আব্দুস শহিদ ৬ হাজার টাকা দিয়ে ৩০টি চামড়া কিনে একই সমস্যায় পড়েছেন। তিনি বলেন, ক্রেতারা প্রতি পিস ৩০ থেকে ৪০ টাকার বেশি দিচ্ছে না। গাড়ি ভাড়াও গেছে। এখন এগুলো কোথায় ফেলব, সেটাই বুঝতে পারছি না।
প্রায় দুইশ বছরের পুরোনো বালীকান্দি কাঁচা চামড়ার বাজার এখন ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাচ্ছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
গ্রামের সাবেক ব্যবসায়ী সৈয়দ মুজাহিদ আলী বলেন, ট্যানারি মালিকদের কাছে কোটি কোটি টাকা আটকে থাকায় অনেক পরিবার বংশপরম্পরায় চলে আসা এই পেশা ছেড়ে দিয়েছে।
সত্তরোর্ধ্ব ব্যবসায়ী সুলেমান মিয়া বলেন, তিনি এ পর্যন্ত ১০০ থেকে ৭০০ টাকা দরে ৫০০টির বেশি চামড়া কিনেছেন। তবে লবণের অভাবে কতগুলো সংরক্ষণ করা যাবে, তা নিয়ে তিনি শঙ্কায় আছেন।
বালীকান্দি বাজারে চামড়া ছাড়ানো ও লবণ দেওয়ার শ্রমিকরা দিন-রাত মিলিয়ে একেকটি শিফটে ১ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করছেন। কেউ কেউ আবার চামড়া থেকে চেঁছে নেওয়া মাংসের বিনিময়েও কাজ করছেন। সেই মাংস পরে প্রতি কেজি ২০০ থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি করা হয়।
একসময় বালীকান্দিতে সারা বছর ২৫ থেকে ৩০ জন ব্যবসায়ী সক্রিয় ছিলেন। এখন সেখানে টিকে আছেন মাত্র পাঁচ থেকে ছয়জন। ঈদের সময় তাদের সঙ্গে যোগ দেন আরও কিছু মৌসুমী ব্যবসায়ী।