বাংলাদেশ-মরক্কো মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে আলোচনা, বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর তাগিদ
দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্পর্ক আরও জোরদার করতে বাংলাদেশ ও মরক্কোর মধ্যে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যকার বড় বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
রাবাতের স্থানীয় সময় মঙ্গলবার মরক্কোয় অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ এবং মরক্কোর শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী রিয়াদ মেজ্জুর এসব বিষয়ে আলোচনা করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন সফর শেষে শামা ওবায়েদ বর্তমানে মরক্কো সফরে রয়েছেন। আজ বুধবার রাজধানী রাবাতে অনুষ্ঠিতব্য ‘ফ্রাঙ্কোফোন পরিবেশে শান্তিরক্ষা সংক্রান্ত দ্বিতীয় মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলন’-এ যোগ দেওয়ার পাশাপাশি তিনি দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেন।
মঙ্গলবার তিনি মরক্কোর পররাষ্ট্র, আফ্রিকান সহযোগিতা ও প্রবাসী মরক্কোনবিষয়ক মন্ত্রী নাসের বুরিতার সঙ্গেও বৈঠক করেন।
বৈঠকে বাংলাদেশের উন্নত বিনিয়োগ পরিবেশের কথা তুলে ধরে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগ বাড়াতে ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল বিনিময়ের প্রস্তাব দেন শামা ওবায়েদ। জবাবে মরক্কোর শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ তারা বাংলাদেশে একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল পাঠাতে আগ্রহী।
কৃষি খাতে বিদ্যমান অংশীদারত্বের প্রশংসা করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সরকারি পর্যায়ে (জিটুজি) সহযোগিতা আরও জোরদারের আহ্বান জানান। বিশেষ করে মরক্কো থেকে ফসফেট আমদানির সরবরাহব্যবস্থা আরও নির্ভরযোগ্য ও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তার মতে, এটি বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
একই সঙ্গে মরক্কোর বাজারে বাংলাদেশের পরিবেশবান্ধব পাট ও পাটজাত পণ্যের প্রসারে কাজ করার আগ্রহও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
বৈঠকে উদ্ভাবন, শিল্প প্রশিক্ষণ, তথ্যপ্রযুক্তি (আইসিটি) এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে সহযোগিতা আরও গভীর করার বিষয়ে দুই পক্ষ অঙ্গীকার ব্যক্ত করে।
মরক্কোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠককালে শামা ওবায়েদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করতে এবং মরক্কোর সঙ্গে অংশীদারত্বকে পারস্পরিক সমৃদ্ধি ও কৌশলগত সহযোগিতার নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
দুই দেশের নেতারা রাজনৈতিক সম্পর্ক জোরদারে উচ্চপর্যায়ের সফর বিনিময়ের গুরুত্ব তুলে ধরেন। শামা ওবায়েদ ১৯৮০ সালে বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক মরক্কো সফরের কথা স্মরণ করেন এবং রাবাতের একটি সড়কের নাম তার নামে রাখায় মরক্কো সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
উভয় নেতা বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, বস্ত্র, ওষুধ, সিরামিক, ক্রীড়া, সংস্কৃতি, কৃষি, শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন, জাহাজ নির্মাণ এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা আরও জোরদারের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। পাশাপাশি বহুপাক্ষিক ক্ষেত্রেও সমন্বিত সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে একমত হন তারা।
চলমান সহযোগিতা মূল্যায়ন ও পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নতুন ক্ষেত্র চিহ্নিত করতে দ্রুত ঢাকায় পরবর্তী ফরেন অফিস কনসালটেশনস (এফওসি) আয়োজনের বিষয়েও তারা সম্মত হন। একই সঙ্গে শামা ওবায়েদ মরক্কোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী নাসের বুরিতাকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান।
সফরকালে শামা ওবায়েদ মরক্কোর অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি, ক্ষুদ্র ব্যবসা, কর্মসংস্থান ও দক্ষতাবিষয়ক মন্ত্রী ইউনেস সেক্কুরির সঙ্গেও বৈঠক করেন। সেখানে তিনি বাংলাদেশের নতুন সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি—যেমন ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘ফার্মার্স কার্ড’—এবং খাল পুনঃখনন প্রকল্পসহ বিভিন্ন উন্নয়ন উদ্যোগ সম্পর্কে অবহিত করেন।
দুই নেতা কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন, নারী ও যুব ক্ষমতায়ন, উদ্যোক্তা তৈরি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতের বিকাশে সহযোগিতা সম্প্রসারণের উপায় নিয়েও আলোচনা করেন। এ ক্ষেত্রে জ্ঞান বিনিময়, কারিগরি সহযোগিতা ও প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারত্বের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
বৈঠকগুলোতে মরক্কোয় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সাদিয়া ফয়জুন্নেসা এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (আফ্রিকা অনুবিভাগ) আবদুর রউফ মন্ডল উপস্থিত ছিলেন।
বর্তমানে বাংলাদেশ ও মরক্কোর মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১ দশমিক ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তবে এই বাণিজ্য ব্যাপকভাবে মরক্কোর পক্ষে ভারসাম্যহীন।
মরক্কোয় বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ মাত্র ৮১ মিলিয়ন ডলার, বিপরীতে মরক্কো থেকে বাংলাদেশের আমদানির পরিমাণ ১ দশমিক শূন্য ৭ বিলিয়ন ডলার। প্রস্তাবিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হলে এই বড় বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।