নারী এমপিদের নিয়ে আমির হামজার ‘বডি শেমিং’ মন্তব্যে তীব্র ক্ষোভ

স্টার অনলাইন রিপোর্ট

সম্প্রতি এক ওয়াজ মাহফিলে কুষ্টিয়া-৩ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য ও ইসলামি বক্তা আমির হামজার নারী সংসদ সদস্যদের নিয়ে করা বডি-শেমিং মন্তব্যে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

এর প্রতিবাদে গতরাতে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন ফরিদপুর সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এ সময় কলেজ ক্যাম্পাস ও শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে ফরিদপুর প্রেসক্লাবে গিয়ে সমাবেশ করেন তারা।

সেখানে আমির হামজার মন্তব্যকে আপত্তিকর আখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাহার ও ভবিষ্যতে এমন মন্তব্য থেকে বিরত থাকারও আহ্বান জানান তারা।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, প্রথমবারের মতো নির্বাচিত এমপি আমির হামজা সংসদে পাশে বসা নারী সদস্যদের নিয়ে মন্তব্য করছেন।

ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘রুমিন ফারহানা আপা আছে, মন্ত্রী পটলের মেয়ে আছে, ফারজানা শারমিন। আমার ডানে-বামে এমন ভুঁড়িওয়ালা লোক পেয়েছি, যেহেতু এগুলো সিরিয়াল করা থাকে আগে থেকে, কে কোথায় বসবে আমরা জানিও না। আল্লাহর ইশারা ভেতরে গিয়ে দেখি, আমার ডানে-বামে ভুঁড়িওয়ালা। এমন বড় বড় ভুঁড়ি, আমার মনে হয় ভুঁড়ি ছিঁড়লে ভেতর থেকে ব্রিজ-কালভার্ট বের হবে। মহিলারা ওদের দেখলে লজ্জা পাবে।’

তবে আমির হামজা কখন এবং কোথায় এই মন্তব্য করেছেন, তা নিশ্চিত হতে পারেনি দ্য ডেইলি স্টার।

এ বিষয়ে জানতে বুধবার আমির হামজার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘দেড় ঘণ্টার আলোচনা ছিল। আমি কোথায়, কোন প্রেক্ষাপটে কী বলেছি, সেটা কি মনে রাখা সম্ভব? মিডিয়ার কি ফোকাস করার মতো আর গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় নেই?’

সাম্প্রতিক সময়ে তিনি এই মন্তব্য করেছেন কিনা—এ প্রশ্নে বলেন, ‘আমি সেটাও জানি না।’

আমির হামজার এমন মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আমির হামজার এই মন্তব্যটি গত পরশু আমার নজরে এসেছে। তার অতীত আচরণ ও অসভ্য মন্তব্যের ধারাবাহিকতায় এটি নতুন কিছু নয়।’

তিনি বলেন, ‘সংসদে এক সপ্তাহ কাটানোর পরও তিনি জানেন না যে প্রত্যেক সদস্যের নির্দিষ্ট আসন থাকে, এটিই অবাক করার মতো। তিনি যাদের ডানে-বামে বসার কথা বলেছেন, বাস্তবে সেখানে কেউ ছিলেন না। জামায়াতের এমপি হিসেবে তিনি অন্য জামায়াত সদস্যদের সঙ্গেই বসেন।’

রুমিন ফারহানা আরও বলেন, ‘এটি নারীদের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন। দুর্ভাগ্যজনক হলো, তারা এখন জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছেন।’

এ বিষয়ে নারী ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী এবং সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন বলেন, ‘ভিডিওটি দেখেছি। এ বিষয়ে কথা বলাও আমার জন্য অসম্মানজনক।’

তিনি বলেন, ‘এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি শুধু নারী এমপি নয়, পুরো সংসদ ও দেশের সব নারী, এমনকি নিজের মাকেও অপমান করেছেন।’

এ ঘটনায় কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে কিনা, এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে এমন একজন অশালীন ব্যক্তিকে জবাব দেওয়ার চেয়ে আমার আরও গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে। তাকে আপাতত এই বিষয়ে সচেতন করা যেতে পারে।’

বুধবার ফরিদপুরের সমাবেশে ছাত্রদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি মামুনুর রশীদ বলেন, ‘আমরা নারী নেত্রীদের নিয়ে এমন মন্তব্যের তীব্র নিন্দা জানাই। অতীতেও কর্মজীবী নারীদের নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করা হয়েছে, যা গ্রহণযোগ্য নয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমির হামজা নিজেকে ইসলামের অনুসারী দাবি করেন, অথচ ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই শালীনতার শিক্ষা দেয়। কিন্তু তিনি নিজেই তা মানছেন না।’

মামুনুর রশীদ আরও বলেন, ‘আমির হামজাকে অবিলম্বে এই মন্তব্য প্রত্যাহার করে জাতির কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। তা না হলে দেশব্যাপী আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।’

দলীয় সংসদ সদস্যের এমন মন্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে কুষ্টিয়া জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি সুজা উদ্দীন জোয়ার্দ্দার দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘একজন মানুষ প্রতিদিন অনেক কথাই বলে। সব কি শিখিয়ে দেওয়া লাগে? তাকে প্রতিনিয়ত সতর্ক করা হচ্ছে, দলীয়ভাবে করছি, কেন্দ্রীয় নেতাদের মাধ্যমে করছি, স্থানীয়ভাবেও করছি। এমনকি তার বন্ধু-বান্ধবদের দিয়েও বলাচ্ছি। আমরা খুবই বিব্রত।’

এ বিষয়ে কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সদস্য সচিব প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরকার বলেন, ‘সুস্থ মস্তিষ্কের কেউ এমন কথা বলতে পারে না। যাদের নিয়ে তিনি মন্তব্য করেছেন, তারাই তার আশেপাশেই বসেন। এখন তিনি কীভাবে তাদের সামনে দাঁড়াবেন?’

 

প্রতিবেদনটি তৈরিতে দ্য ডেইলি স্টারের কুষ্টিয়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, বগুড়া ও ফরিদপুর সংবাদদাতা সহায়তা করেছেন।