ফ্যাসিস্ট আমলে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে: প্রধানমন্ত্রী

স্টার অনলাইন রিপোর্ট

দুর্নীতি, অর্থপাচার ও আর্থিক অপরাধ দমনে বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধারকে সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

আজ বুধবার বিকেলে জাতীয় সংসদ অধিবেশনের ষষ্ঠ কার্যদিবসে প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি এসব কথা বলেন। 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অর্থপাচারের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে আগের ফ্যাসিবাদী আওয়ামী শাসনামলে সংঘটিত অর্থপাচার ও দুর্নীতি তদন্তে একটি পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র প্রকাশের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।’

‘অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির তথ্যমতে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বছরে গড়ে ১৬ বিলিয়ন করে মোট ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দেশ থেকে পাচার হয়েছে। এই পাচার হওয়া অর্থ বিভিন্ন দেশে স্থানান্তরিত হয়েছে বলে অভিযোগ থাকায় তা পুনরুদ্ধারে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে তথ্য বিনিময়, সম্পদ শনাক্তকরণ এবং পারস্পরিক আইনি সহায়তা জোরদার করা হচ্ছে,’ বলেন তিনি।

তারেক রহমান বলেন, ‘এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সমন্বয় করে কাজ করছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। অর্থপাচারের গন্তব্য হিসেবে প্রাথমিকভাবে ১০টি দেশকে (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও হংকং-চীন) চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে মালয়েশিয়া, হংকং ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে পারস্পরিক আইনগত সহায়তা চুক্তি (এমএলএটি) সই হয়েছে। বাকি ৭টি দেশের সঙ্গে চুক্তি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বে ইতোমধ্যে একটি আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। টাস্কফোর্স চিহ্নিত ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১১টি মামলায় পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারে আইনি কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

চিহ্নিত ১১টি মামলা হলো—১. সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার পরিবার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান, ২. সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান, ৩. এস আলম গ্রুপ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বাপ্রতিষ্ঠান, ৪. বেক্সিমকো গ্রুপ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান, ৫. সিকদার গ্রুপ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান, ৬. বসুন্ধরা গ্রুপ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান, ৭. নাসা গ্রুপ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান, ৮. ওরিয়ন গ্রুপ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান, ৯. নাবিল গ্রুপ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান, ১০. এইচবিএম ইকবাল, তার পরিবার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এবং ১১. সামিট গ্রুপ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান।

দুর্নীতি দমন কমিশনের নেতৃত্বে বাংলাদেশ পুলিশের সিআইডি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল এবং কাস্টমস ইন্টেলিজেন্স ও ইনভেস্টিগেশন বিভাগ এসব অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মামলার তদন্ত করছে।

এ লক্ষ্যে ১১টি যৌথ তদন্ত দল (জেআইটি) গঠন করা হয়েছে।

জেআইটি গঠনের পর অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মামলাগুলোর অগ্রগতি সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘২৫ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত দেশে মোট ৫৭ হাজার ১৬৮ দশমিক ৯ কোটি ও আদালতের নির্দেশে বিদেশে ১৩ হাজার ২৭৮ দশমিক ১৩ কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ জব্দ ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে।’

দেশ ও বিদেশ মিলিয়ে মোট ৭০ হাজার ৪৪৬ দশমিক ২২ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারে ইতোমধ্যে ১৪১টি মামলা করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৫টিতে চার্জশিট প্রদান ও ৬টি মামলায় রায় হয়েছে।

সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, অর্থপাচারের সঙ্গে জড়িতদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে।

‘অতীতে আমরা দেখেছি, সরকারের বিভিন্ন ব্যক্তি নিজেদের ইচ্ছা ও স্বার্থ অনুযায়ী আইন-কানুন ও নৈতিকতা উপেক্ষা করে কাজ করেছে—যাকে ইচ্ছা আটক করেছে, জোরপূর্বক যা ইচ্ছা লিখিয়ে নিয়েছে,’ তিনি বলেন।

তারেক রহমান বলেন, ‘বর্তমান সরকার আইনকে সম্মান করে। সরকার প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিচার নিশ্চিত করতে চায়, যাতে কেউ ন্যায্য বিচার থেকে বঞ্চিত না হয়।’

‘এই কারণে আমরা কঠোরভাবে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই এগোবো। আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। যারা দেশের সম্পদ আত্মসাৎ করেছে বা জনগণের অর্থ পাচার করেছে, তাদের বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী শাস্তি নির্ধারিত হবে,’ বলেন তারেক রহমান।