ব্যবসায়ীর কাছ থেকে নগদ টাকা, ক্রিপ্টোকারেন্সি নেওয়ার অভিযোগ: ২ এএসআই ক্লোজড, সহকারী কমিশনার প্রত্যাহার

 এফ এম মিজানুর রহমান
এফ এম মিজানুর রহমান

এক ব্যবসায়ী ও তার বন্ধুকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে জুয়া মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ ক্রিপ্টোকারেন্সিসহ ১৮ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) দুই সহকারী উপপরিদর্শককে (এএসআই) সাময়িকভাবে ক্লোজড করা হয়েছে। একই ঘটনায় পুলিশের এক সহকারী কমিশনারকে প্রত্যাহার করে দামপাড়া পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে।

ওই দুই এএসআই হলেন—সিএমপির ল’ফুল ইন্টারসেপ্টেড সেলের (এলআইসি) বাছির উদ্দিন এবং সিএমপি রেশন স্টোরের সুফিয়ান। আর অপরজন এলআইসির সহকারী কমিশনার (এসি) শরিফুল আলম সুজন।

আজ সোমবার বিষয়টি নিশ্চিত করে সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, এক যুবকের কাছ থেকে টাকা ও ক্রিপ্টোকারেন্সি আদায়ের অভিযোগে দুই এএসআইকে ক্লোজড করে দামপাড়া পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়েছে। আর এসিকে দামপাড়া পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে।

কমিশনার বলেন, বিষয়টি তদন্ত করছেন উপকমিশনার (ডিসি) মো. বদিউজ্জামান। তাকে দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। যেই জড়িত থাকুক, প্রমাণ পেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এর আগে, গত ৪ সেপ্টেম্বর সকালে এসি শরিফুল আলমের নেতৃত্বে সাদা পোশাকের একদল পুলিশের বিরুদ্ধে নগরীর হালিশহরের কে ব্লকের একটি বাসা থেকে ব্যবসায়ী আখতারুজ্জামান শাকিল (২৭) ও তার বন্ধু মনসুর আলীকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশ তাদের দুজনকে একটি টয়োটা করোলা গাড়িটিসহ এলআইসি কার্যালয়ে নিয়ে যায়।

শাকিল নিজেকে খাতুনগঞ্জে পলিপ্রোপিলিন (পিপি দানা) ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় দেন। পাশাপাশি চট্টগ্রামের পটিয়ায় তার একটি কৃষি খামারও রয়েছে। তার বন্ধুর গাড়ির পার্টসের ব্যবসা আছে।

ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেন, পুলিশ তাদের মোবাইল ফোন জব্দ করে তল্লাশি চালায় এবং তাদের ব্যক্তিগত তথ্য ও ছবি অন্য একটি ডিভাইসে স্থানান্তর করে।

শাকিল ও তার বন্ধু মনসুর জানান, শাকিলের ব্যক্তিগত ছবি ফাঁস করে দেওয়ার এবং তাদের জুয়া মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকি দেন এসি শরীফ ও এএসআই বাছির। তাদের আরও অভিযোগ, এসি শরিফুল ও তার সঙ্গে থাকা সদস্যরা শাকিলকে তার বাইন্যান্স অ্যাকাউন্ট থেকে তিন দফায় ১০ হাজার ৮৬৪ মার্কিন ডলার (প্রায় ১৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা) নানা মাধ্যমে স্থানান্তর করতে বাধ্য করেন।

শাকিল অভিযোগ করেন, গত ৪ সেপ্টেম্বর রাত ১০টা ৪০ মিনিটের দিকে তিন কনস্টেবল তাকে সিএমপির কাছে একটি ব্যাংকের বুথে নিয়ে যান এবং পাঁচ দফায় ৪ লাখ টাকা তুলতে বাধ্য করেন।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, এলআইসি কার্যালয়ে থাকা অবস্থায় একটি মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের অ্যাকাউন্ট থেকেও ৮০ হাজার টাকা স্থানান্তর করা হয়।

দুই ভুক্তভোগী জানান, কর্মকর্তারা একটি সাদা কাগজে তাদের নাম, ঠিকানা ও ফোন নম্বর লিখে নেন, তাদের সই নেন এবং তাদের ভিডিও ধারণ করার পর রাত ১২টার দিকে ছেড়ে দেন। পরদিন ৫ সেপ্টেম্বর রাতে তাদের প্রাইভেট কার ফিরিয়ে দিয়ে আরও পাঁচ লাখ টাকা দাবি করা হয়।

ঘটনাটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত হওয়ার পর সিএমপি কমিশনার বিষয়টি তদন্তে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। শাকিল জানান, পরে তিনি তদন্ত কমিটির কাছে মৌখিকভাবে তার বক্তব্য তুলে ধরেন।

এর আগে একই ধরনের ঘটনায় ২০২৪ সালের ২৬ জানুয়ারি বায়েজিদ বোস্তামী এলাকা থেকে ফ্রিল্যান্সার আবু বকরকে ডিবির কর্মকর্তারা তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে মামলা ও ‘ক্রসফায়ারে’ হত্যার ভয় দেখিয়ে তার মোবাইল ফোন থেকে প্রায় ৩ কোটি টাকা মূল্যের বিটকয়েন স্থানান্তর করে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে।

পরে আবুর স্ত্রী আট পুলিশ কর্মকর্তা ও অন্যদের বিরুদ্ধে মামলা করেন আদালতে। সিএমপির অভ্যন্তরীণ তদন্তে পরবর্তীতে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়। এরপর একজন পরিদর্শকসহ সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ক্রিপ্টোকারেন্সির লেনদেন অনুমোদিত নয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২২ সালের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৪৭ অনুযায়ী ভার্চুয়াল মুদ্রা—যা ভার্চুয়াল অ্যাসেটের একটি উপশ্রেণি—কোনো ধরনের বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন নিষ্পত্তি বা বিনিয়োগের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক অনুমোদিত নয়।