গ্রেপ্তারের আগে পরোয়ানা যাচাইয়ে পুলিশকে হাইকোর্টের নির্দেশ
কাউকে গ্রেপ্তারের আগে কেন্দ্রীয় তথ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির মাধ্যমে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা যাচাইয়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
পাশাপাশি এ সংক্রান্ত নির্দেশনা অনুসরণের বিষয়টি জানিয়ে একটি সার্কুলার জারি করে সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে পাঠাতে পুলিশের মহাপরিদর্শককে (আইজিপি) নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
ভুয়া গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ব্যবহার করে মানুষকে গ্রেপ্তার ও হয়রানির খবরের পরিপ্রেক্ষিতে দায়ের করা একটি রিট পিটিশনের রুল নিষ্পত্তি করে বিচারপতি কে এম হাফিজুল আলম ও বিচারপতি মুরাদ-এ -মওলা সোহেলের বেঞ্চ আজ সোমবার এ রায় ঘোষণা করেন।
স্বরাষ্ট্র সচিব, আইজিপি, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের মহাপরিচালক, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি, ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার এবং গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ অন্যদের বিবাদী করে রিট পিটিশনটি দায়ের করেছিল হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি)।
রিটের শুনানিতে এইচআরপিবির পক্ষে উপস্থিত ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরসেদ, তাকে সহায়তা করেন আইনজীবী মোহাম্মদ সরোয়ার আহাদ চৌধুরী, সঞ্জয় মণ্ডল ও নাসরিন সুলতানা। আর রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জে আর খান রবিন ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ হুমায়ুন হোসেন তুহিন।
হাইকোর্ট সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলকে নিম্ন আদালতের সব বিচারকের (যার মধ্যে জেলা জজ, মহানগর দায়রা জজ, মুখ্য বিচারিক হাকিম এবং মুখ্য মহানগর হাকিম অন্তর্ভুক্ত) কাছে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা পাঠানোরও নির্দেশ দিয়েছেন, যেন নালিশি মামলা দায়েরের সময় বাদী ও আইনজীবীর পরিচয় নিশ্চিতভাবে যাচাই করা হয়।
আদালত বলেন, যেকোনো নাগরিককে গ্রেপ্তারের সময় পুলিশকে অবশ্যই ফৌজদারি কার্যবিধির নিয়মাবলি অনুসরণ করতে হবে।
পর্যবেক্ষণে বলা হয়, এটি না করা আইনের লঙ্ঘন বলে গণ্য হবে।
আদালত আরও বলেন, ভুয়া পরোয়ানার ভিত্তিতে গ্রেপ্তার নাগরিকদের মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকারের লঙ্ঘন এবং সেই অধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্ব।
পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, মামলা দায়ের এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকরের সময় সতর্ক থাকতে হবে যেন বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কেউ হয়রানির শিকার না হন। আদালত উল্লেখ করেন, এমন হয়রানির ফলে একজন নাগরিকের যে ক্ষতি হয়, তা প্রায়শই পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব হয় না।
হাইকোর্ট আরও নির্দেশ দিয়েছেন, নালিশি মামলা দায়েরের সময় বাদীর জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) অনুলিপি এবং আইনজীবীর পেশাগত কার্ডের কপি মামলার নথির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে, যেন তাদের পরিচয় যাচাই সহজ হয়।
শুনানির সময় এইচআরপিবির পক্ষে উপস্থিত জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ আদালতকে জানান, ২০১২ সালে গুলশানের বাসিন্দা আরিফ নিয়াজিকে একটি ভুয়া গ্রেপ্তারি পরোয়ানার ভিত্তিতে তার বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, আদালতে হাজির করার পর নিয়াজি জানতে পারেন যে তার বিরুদ্ধে একটি ভুয়া মামলা ও পরোয়ানা তৈরি করা হয়েছিল।
আইনজীবী হাইকোর্টকে জানান, সংশ্লিষ্ট আদালতের নির্দেশে গঠিত একটি তদন্ত কমিটি পরে দেখতে পায় যে, ওই গ্রেপ্তারি পরোয়ানাটি একটি ভুয়া মামলার পরিপ্রেক্ষিতে জারি করা হয়েছিল।
মনজিল মোরসেদ আরও বলেন, পরে গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে, প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ব্যক্তিগত বা অন্য কোনো স্বার্থে নাগরিকদের হয়রানির জন্য ভুয়া পরোয়ানা ব্যবহার করেছেন।
সেসব প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এইচআরপিবি এই জনস্বার্থ মামলাটি দায়ের করে, যেখানে ভুয়া পরোয়ানা ব্যবহার এবং জালিয়াতিপূর্ণ নালিশি মামলা দায়ের রোধে নির্দেশনা চাওয়া হয়।
ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জে আর খান রবিন রুলের বিপক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, কেন্দ্রীয় তথ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি এরইমধ্যে চালু করা হয়েছে, তাই ভুয়া পরোয়ানা ব্যবহার করে গ্রেপ্তারের সুযোগ খুবই কম।
তিনি আরও যুক্তি দেন, এই রিট পিটিশনটি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির মাধ্যমে দায়ের করা হয়নি, তাই আবেদনকারী প্রতিকার পাওয়ার যোগ্য নন।