চট্টগ্রাম যেন চাঁদাবাজদের ‘স্বর্গরাজ্য’, আতঙ্কের নগরীতে জিম্মি ব্যবসায়ীরা

 এফ এম মিজানুর রহমান
এফ এম মিজানুর রহমান

বন্দরনগরী চট্টগ্রাম ও এর আশপাশের কয়েকটি উপজেলাজুড়ে এক বিশাল অপরাধ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে পলাতক এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর অনুসারীরা।

চাঁদা দিতে অস্বীকার করলেই ব্যবসায়ীদের বাড়িঘরে সশস্ত্র হামলা চালানো হচ্ছে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, নগরী ও আশপাশের সাম্প্রতিক অধিকাংশ হত্যাকাণ্ড, সশস্ত্র হামলা ও চাঁদাবাজির সঙ্গে ‘বড় সাজ্জাদ’ নামে পরিচিত সাজ্জাদ আলী খানের অনুসারীরা সরাসরি জড়িত।

ইন্টারপোলের মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় থাকা এই আসামি দেশের বাইরে থেকে চট্টগ্রামে এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে মনে করছে পুলিশ।

গুলিবর্ষণের একের পর এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা ও চাঁদাবাজির খবর পাওয়া গেলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখন পর্যন্ত এই সন্ত্রাসী কার্যক্রমের নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে বা সহিংসতা থামাতে পারেনি।

চাঁন্দগাঁও, বাকলিয়া, বায়েজিদ, হাটহাজারী, রাউজান ও রাঙ্গুনিয়ার ব্যবসায়ীরা চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে কোনো ব্যবসায়ীই নাম প্রকাশ করতে চান না।

যে ব্যবসায়ীরা চাঁদা দিতে রাজি হননি, তাদের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে সশস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। কাউকে কাউকে হত্যা পর্যন্ত করা হয়েছে।

এসব ঘটনার পরও অনেক ভুক্তভোগীই পুলিশের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করতে চান না। তাদের ধারণা, পুলিশি তদন্তের পর অপরাধীদের বিচার খুব কম ক্ষেত্রেই হয়। বরং পরে সন্ত্রাসীদের টার্গেট হতে হয়।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বড় সাজ্জাদ ৩-৪ জন নির্ভরযোগ্য সহযোগীর মাধ্যমে ৫০ জনের বেশি সক্রিয় সদস্যের এক দুর্ধর্ষ অপরাধী চক্র নিয়ন্ত্রণ করেন।

বায়েজিদ বোস্তামী, পাঁচলাইশ, চান্দগাঁও, হাটহাজারী, ফটিকছড়ি ও রাউজানের বালু ব্যবসা, গার্মেন্টসের ঝুট ব্যবসা, পরিবহন খাত, ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান (আইএসপি) এবং ভবন নির্মাণ প্রকল্পসহ বিভিন্ন ব্যবসা থেকে চাঁদা আদায় করে এই চক্রটি।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে চক্রটি এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপস, ভার্চুয়াল ফোন নম্বর এবং দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের গোপন আস্তানা ব্যবহার করে থাকে। 
চক্রের সদস্যরা প্রায়ই দিনে-দুপুরে প্রকাশ্যে হামলা চালিয়ে রাউজান ও ফটিকছড়ির পাহাড়ি আস্তানায় গিয়ে আত্মগোপন করে।

এছাড়া, সন্ত্রাসী চক্রটি আগের চেয়ে বেশি হারে কিশোর গ্যাং সদস্যদের দলে ভেড়াচ্ছে বলে ধারণা তদন্তকারীদের।

গত রোববার হাটহাজারীর দক্ষিণ পাহাড়তলীতে ১০ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে ১০ তলা নির্মাণাধীন ভবনে ভাঙচুর চালায় এবং ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায় সশস্ত্র চাঁদাবাজরা।

এর আগে, গত ১৩ জুলাই চকবাজার-বাকলিয়া অ্যাক্সেস রোডে একসঙ্গে ২ কোটি টাকা এবং মাসে ১০ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে একটি ইন্টারনেট সেবা প্রতিষ্ঠানে ঢুকে তাণ্ডব চালায় ৩০-৪০ জনের সশস্ত্র সন্ত্রাসী দল।

পুলিশের মতে, বড় সাজ্জাদের অন্যতম বিশ্বস্ত সহযোগী মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ‘ডেভিড ইমনের’ নির্দেশে ওই হামলা চালানো হয়েছিল।

ডেভিড ইমনকে গতকাল বুধবার ভোরে যশোর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

ব্যবসায়ী ও পুলিশ কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রশাসন ঢিলেঢালা চলার সুযোগে বায়েজিদ বোস্তামী, নাসিরাবাদ, হাটহাজারী, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও ফটিকছড়িতে চাঁদাবাজি আশঙ্কাজনক হারে বাড়তে থাকে।

বেশিরভাগ ঘটনার ধরন একই রকম বলে পুলিশের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে।

সন্ত্রাসীরা প্রথমে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করে তথ্য সংগ্রহ করে। এরপর ফোন দিয়ে টাকা দাবি করা হয়। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে টার্গেটের বাড়ি কিংবা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা চালানো হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী ডেইলি স্টারকে বলেন, ব্যবসা ঠিক রাখার জন্য তারা চাঁদা দিতে বাধ্য হচ্ছেন।

বায়েজিদের এক নির্মাণাধীন ভবনের মালিক ডেইলি স্টারকে বলেন, 'এখানে ভবন তৈরি করতে গেলে সবাইকে চাঁদা দিতে হয়। এরা শুধু নগদ টাকাই চায় না, নিজেদের পছন্দের লোকের কাছ থেকে বালু ও সিমেন্ট কিনতে বাধ্য করে। কাজ চালিয়ে যেতে অনেকে নিজেদের মধ্যে দেনদরবার করে টাকা দিয়ে দেন।'

তিনি আরও বলেন, 'পুলিশকে এসব জানিয়ে লাভ নেই। কোনো নিরাপত্তা তারা দিতে পারবে না। মানুষ তো অভিযোগ করতেই ভয় পায়।'

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বায়েজিদ শিল্প এলাকার গার্মেন্টস মালিক ও ঝুট ব্যবসায়ীরা বড় সাজ্জাদের নামে সক্রিয় বিভিন্ন গ্রুপকে প্রতি মাসে নির্ধারিত হারে চাঁদা দিতে বাধ্য হন।

এমন এক ভুক্তভোগী হাটহাজারীর জসিম উদ্দিন ডেইলি স্টারকে জানান, চাঁদাবাজরা প্রথমে তার কাছে ২০ লাখ টাকা দাবি করে। তিনি অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ জানালে তারা আবার ফোন করে টাকার অংক বাড়িয়ে ৫০ লাখ টাকা দাবি করে।

এর আগে, চাঁদা না দেওয়ায় গত ২ জানুয়ারি ও ২৮ ফেব্রুয়ারি ‘স্মার্ট গ্রুপের’ মালিক মুজিবুর রহমানের বাসভবনে হামলা চালানো হয়। হোয়াটসঅ্যাপে হুমকি দেওয়ার পর সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা তার বাড়ি লক্ষ্য করে গুলি করে।

পুলিশি পাহারা থাকার পরও সেখানে এ হামলা হয়। হামলার সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে যায়। ফুটেজে চেহারা দেখা যাওয়া হামলাকারীদের কাউকেই গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, 'হামলার পর মামলা হয়েছিল। তবে আমি পরে শুনেছি ওই ব্যবসায়ী ও বড় সাজ্জাদের মধ্যে বিষয়টি সমঝোতা হয়ে গেছে।'

তবে পুলিশকে কোনো ধরনের সমঝোতার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি বলে উল্লেখ করেন তিনি।

সমঝোতার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন ব্যবসায়ী মুজিবুর রহমান। তিনি ডেইলি স্টারকে বলেন, 'তাদের সঙ্গে আপস করলে এই পরিস্থিতি তৈরি হতো না। আমি এখনো নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। তাদের ফোন পাওয়ার পর আমি নম্বরগুলো ব্লক করে দিয়েছি।'

সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্র

পুলিশের মতে, বড় সাজ্জাদ একসময় ছাত্রশিবিরের কর্মী ছিলেন। তার বিরুদ্ধে হত্যা, অবৈধ অস্ত্র ও চাঁদাবাজিসহ ১৭টি মামলা আছে।

তিনি ২০০০ সালে চট্টগ্রামে চাঞ্চল্যকর ৮ খুন মামলার আসামি ছিলেন। নিম্ন আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দিলেও পরে হাইকোর্ট থেকে খালাস পান।

তদন্তকারীরা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তার অনুসারীরা নতুন করে সক্রিয় হয়ে ওঠে। সে সময় এলাকায় এলাকায় তার হয়ে নিয়ন্ত্রণ করতেন ‘ছোট সাজ্জাদ’ নামে পরিচিত সাজ্জাদ হোসেন।

এর আগে, বায়েজিদে পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে পালিয়ে গেলেও ২০২৫ সালের ১৫ মার্চ ঢাকার একটি শপিং মল থেকে ছোট সাজ্জাদকে গ্রেপ্তার করা হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শনের একাধিক ভিডিও পাওয়া যায়। তবে, তাকে গ্রেপ্তারের পরও পুলিশ কোনো অস্ত্র উদ্ধার করতে পারেনি। ছোট সাজ্জাদের বিরুদ্ধেও হত্যা, অস্ত্র ও চাঁদাবাজির ১৭টি মামলা রয়েছে।

ছোট সাজ্জাদ কারাগারে যাওয়ার পর এই চক্রের নিয়ন্ত্রণ নেয় ডেভিড ইমন, মোহাম্মদ রায়হান আলম ও বোরহান উদ্দিন।

ফটিকছড়ির বাসিন্দা ডেভিড ইমনের বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়া জোড়া খুন এবং ২৩ মে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী 'ঢাকাইয়া আকবর' হত্যাসহ সাতটি মামলা রয়েছে। তাঁর কাছে ১৫ থেকে ২০টি আগ্নেয়াস্ত্র ছিল বলে ধারণা পুলিশের।

অন্যদিকে রায়হান আলমের বিরুদ্ধে রাউজান ও চট্টগ্রামে আটটি হত্যাকাণ্ডসহ মোট ১৬টি মামলা রয়েছে।

চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার জানান, বুধবার রাতে নোয়াখালীতে রায়হানকে ধরতে অভিযান চালালেও ছাদ থেকে লাভ দিয়ে পালিয়ে যান তিনি।

যা বলছে পুলিশ

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক রোমিং নম্বর ও এনক্রিপ্টেড অ্যাপ ব্যবহার করায় এই সন্ত্রাসীদের অবস্থান শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

বড় সাজ্জাদ ও রায়হানের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পুলিশের কাছে নেই।

তদন্তকারীদের ধারণা, তাদের অনুসারীরা রাউজান ও ফটিকছড়ির দুর্গম পাহাড়ের আস্তানায় অবস্থান করে থাকে।

জানতে চাইলে সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'ঘটনাগুলোর পেছনে জড়িতদের শনাক্ত করতে পুলিশ প্রতিটি ঘটনার তদন্ত করছে। চক্রের অনেক সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং বাকি সশস্ত্র অপরাধীদের ধরতেও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।'

তিনি আরও জানান, কিশোর গ্যাংয়ের যে সদস্যরা এই চক্রে যোগ দিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জানতে চাইলে চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, 'আমাদের কিছুটা সময় দিন। আমরা অবশ্যই সবাইকে গ্রেপ্তার করব।'