ডেভিড ইমন ভারতে পালাতে ২০ হাজার রুপির চুক্তি করেছিলেন: পুলিশ
যশোরের বেনাপোল সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালাতে 'শীর্ষ সন্ত্রাসী' ডেভিড ইমন ২০ হাজার রুপির চুক্তি করেছিল বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
তবে সীমান্ত অতিক্রম করার আগে আজ বুধবার ভোরে যশোর সদরে বসানো একটি চেকপোস্টে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
পুলিশ জানায়, যশোরের কোতোয়ালি থানা এলাকার ঝুমঝুমপাড়া এলাকা থেকে মোবারক হোসেন ইমনসহ তার ৩ সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
অপর ৩ জন হলেন—আল ইসলাম আলিফ তমাল (২৫), মো. শামীম (২৮) এবং মো. সাফায়েত হোসেন।
অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া যশোর জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মো. মিরাজুল ইসলাম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'ইমন ও তার ৩ সহযোগী একটি হোন্ডা এসইউভি গাড়িতে করে ঝিকরগাছার দিকে যাচ্ছিলেন। চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের দেওয়া নির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে আমাদের থানা ও ডিবি পুলিশের টিম যৌথ অভিযান চালায়।'
'আটক করার পর তার ছবি ও অন্যান্য তথ্য মিলিয়ে আমরা পরিচয় নিশ্চিত করি। অভিযানে পুলিশের মোট ৯টি টিম অংশ নেয়। তার কাছ থেকে যা উদ্ধার করা হয়েছে, তা চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে,' বলেন তিনি।
তদন্তকারীরা জানান, পুলিশের নজরদারি এড়াতে ইমন ও তার সহযোগীরা একটি কালো রঙের হোন্ডা সিআর-ভিজিও গাড়িতে করে বেনাপোল সীমান্তের দিকে যাচ্ছিলেন।
দ্য ডেইলি স্টারের অনুসন্ধানে দেখা যায়, ‘ঢাকা মেট্রো-ঘ ১৫-৩৫৯০’ রেজিস্ট্রেশন নম্বরের ওই গাড়িটি বিআরটিএতে ‘হোপ টেক্সটাইলের’ নামে নিবন্ধিত, যার মালিক মো. আউয়াল হোসেন। ২০১৬ সালে নিবন্ধিত এই গাড়িটির মালিকের ঠিকানা ঢাকার বনানী।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, ইমনের সঙ্গে গ্রেপ্তার ৩ সহযোগীর একজন ওই গাড়িটির মালিকের ভাতিজা।
ওই কর্মকর্তা বলেন, 'তাদের চট্টগ্রামে আনার পর পরিচয় বিস্তারিত যাচাই-বাছাই করা হবে।'
তিনি আরও বলেন, 'প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আমরা জানতে পেরেছি, ২০ হাজার রুপির বিনিময়ে সীমান্ত পার হওয়ার একটি চুক্তি করেছিলেন ইমন।'
পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তারের পর তদন্তকারীদের বিভ্রান্ত করতে ইমন প্রথমে নিজেকে ‘মিরাজ’ পরিচয় দেন এবং বাড়ি ঢাকায় বলে মিথ্যা তথ্য দেন।
বুধবার বিকেলে চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত ডিআইজি) নাজিমুল হক সাংবাদিকদের বলেন, 'পুলিশের অভিযানের খবর পেয়ে ইমন ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। তবে সীমান্ত পার হওয়ার আগেই পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।'
'ইমন প্রায়ই ভারতে আসা-যাওয়া করতেন। আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে যে তার কাছে একটি বিদেশি পাসপোর্টসহ মোট দুটি পাসপোর্ট রয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানা যাবে,' বলেন তিনি।
কে এই ইমন
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ডেভিড ইমন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগরের মো. মুসার ছেলে। চট্টগ্রামের পলাতক আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের হয়ে চট্টগ্রামে অপরাধ কর্মকাণ্ড পরিচালনায় নেতৃত্ব দেওয়া দুই প্রধান ব্যক্তির একজন এই ইমন।
এর আগে ‘ছোট সাজ্জাদ’ ওরফে সাজ্জাদ হোসেন গ্রুপটির নেতৃত্ব দিতেন। সাজ্জাদ বর্তমানে কারাগারে থাকায় ইমন ও মোহাম্মদ রায়হান আলম গ্রুপটির নেতৃত্ব নিয়ে চট্টগ্রামে অপরাধ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন।
তদন্তকারীরা বলছেন, পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খানের অনুসারীরা চট্টগ্রাম শহরসহ রাউজান, হাটহাজারী ও ফটিকছড়ি উপজেলায় ধারাবাহিকভাবে চাঁদা দাবি এবং সহিংস হামলার পেছনে জড়িত ছিল।
এই গ্যাংয়ের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ঘটে গত ১৩ জুলাই। ওই দিন চকবাজার থানার অধীনে চন্দনপুরা-বাকলিয়া অ্যাক্সেস রোডে ‘ডিজিটাল ডট নেট’ (ডিডিএন) নামে একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে ৩০-৩৫ জন সশস্ত্র লোক অতর্কিত হামলা চালায়। হামলাকারীরা সেখানে ভাঙচুর চালায় এবং নগদ টাকা লুট করে নিয়ে যায়।
পুলিশ জানায়, ডিডিএন অফিসে হামলার ঘটনায় অভিযুক্তদের নেতৃত্বে ছিলেন ডেভিড ইমন।
হামলার দুদিন আগে ডিডিএনের মালিক আদিল বিন মামুন একটি আন্তর্জাতিক নম্বর থেকে ফোন পান। ফোনকারী নিজেকে ‘ডেভিড ইমন’ পরিচয় দিয়ে এককালীন ২ কোটি টাকা এবং প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। চাঁদা না দিলে তার লোকেরা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি দখল করে নেবে বলে হুমকি দেয়।
ডিডিএন অফিসটি 'স্মার্ট গ্রুপের' পরিচালক মুজিবুর রহমানের বাসভবনের ঠিক পাশেই। এর আগে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি পুলিশ পাহারার মধ্যেই মুজিবুর রহমানের বাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়।
পুলিশের দাবি, ওই ব্যবসায়ীর কাছ থেকে মোটা অংকের চাঁদা আদায়ে ব্যর্থ হয়ে সাজ্জাদ আলীর অনুসারীরা সেই হামলা চালিয়েছিল। এমনকি তার আগে গত ২ জানুয়ারিও একই বাড়িতে এক দফা গুলিবর্ষণ করা হয়েছিল, যেখানে গুলি এসে জানালা-দরজায় লাগে।
চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে অক্সিজেন-কুয়াইশ সড়কের ওয়াজেদিয়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৪ রাউন্ড গুলিসহ একটি বিদেশি পিস্তলসহ ডেভিড ইমনের ২ সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ। তারা হলেন—মো. আসিফ (২৫) এবং সাইদুল ইসলাম ওরফে আরিফ (২৪)।


