রাকসু জিএস ও শিবির নেতাদের মারধরে আহত ২ শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার, ছাত্রদলের নিন্দা
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ক্যাম্পাসে রাকসু জিএস সালাহউদ্দিন আম্মারসহ শিবির নেতাদের হামলায় আহত দুই শিক্ষার্থীকে সন্ত্রাসীবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়েছে পুলিশ।
গ্রেপ্তার দুজন হলেন—ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. আনাস এবং সংস্কৃত বিভাগের শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসান।
রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) মুখপাত্র ও অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মো. গাজিউর রহমান জানান, শাহ মখদুম থানায় দায়ের করা একটি মামলার তদন্তের সময় এই দুজনকে অভিযুক্ত হিসেবে শনাক্ত করা হয়। চিকিৎসা শেষে তাদের কারাগারে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।
এর আগে গতকাল সোমবার ক্যাম্পাসে তিন শিক্ষার্থীকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা মারধর করেন। মারধরের শিকার একজন নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সাবেক কর্মী বলে দাবি করা হয়।
ঘটনার সূত্রপাত একটি প্রেমের প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে। রোববার সংস্কৃত বিভাগের এক নারী শিক্ষার্থী একই বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মহসিন আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন যে, তার প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় তিনি তাকে হুমকি দিয়েছেন।
এর পরিপ্রেক্ষিতে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে রোববার রাতে সভায় বসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান। এ সময় মহসিন আলমের সঙ্গে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০১৭-১৮ বর্ষের আনাস, একই বিভাগের হাসিব ও সংস্কৃত বিভাগের মাহমুদুল হাসানসহ কয়েকজন সেখানে যায়। পরে তারা অভিযোগটি অস্বীকার করে প্রক্টরের সঙ্গে উচ্চবাচ্য করেন।
পরে এ বিষয়ে সোমবার দুপুরে আবারও একটি সভা ডাকেন প্রক্টর। ওই সভায় উপস্থিত হয়ে আনাসকে ছাত্রলীগ কর্মী বলে অভিযোগ করেন রাকসু জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার, এসজিএস এস এম সালমান সাব্বিরসহ অন্যরা।
এ সময় রাকসু নেতারা আনাসের মোবাইল ফোন ঘেঁটে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুল্লাহ-হীল গালিবসহ কয়েক জন নেতার সঙ্গে আনাসের ছবি পাওয়ার দাবি করেন। পরে তাকে প্রক্টর দপ্তরে জিএস আম্মার ও এজিএস সালমান সাব্বির মারধর করেন বলে অভিযোগ ওঠে। প্রক্টর সেখানে বিষয়টি সাময়িকভাবে মীমাংসা করেন, এরপর আনাস ও অন্যরা কার্যালয় ত্যাগ করেন।
এ ঘটনার জেরে ওইদিন বিকেল ৩টার দিকে আনাস, হাসিব, মাহমুদুলসহ কয়েকজন রাকসু ভবনে হামলা করেন। এতে রাকসুর তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক বি এম নাজমুস সাকিব আহত হন। পরে রাকসু নেতারা তাদের ওপরে পাল্টা হামলা চালালে তারা সেখান থেকে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষের সামনে যান।
পরে রাকসুর সাধারণ সম্পাদক, সহকারী সাধারণ সম্পাদকসহ অন্যান্য সদস্য এবং ছাত্রশিবিরের কর্মীরাও সেখানে জড়ো হন।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, এ সময় রাকসু জিএস আম্মার দূর থেকে ওই শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য করে গালিগালাজ করেন। গ্রন্থাগারের সামনে থেকে ওই শিক্ষার্থীরাও পাল্টা গালাগালি করেন। একপর্যায়ে সালাহউদ্দিন আম্মার ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করতে শুরু করেন। এ সময় প্রক্টর মাহবুবর রহমান তাদেরকে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে থেকে পাঠকক্ষের ভেতরে নিয়ে যান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত অনুযায়ী, পরে শিবির ও রাকসু নেতারা পাঠকক্ষের ফটক থেকে প্রক্টরকে ধাক্কা দিয়ে পাঠকক্ষে প্রবেশ করেন। ভেতরে ঢুকেই তারা কাঠ, বাঁশ, রড, বেল্টসহ লাঠিসোটা দিয়ে তাদের মারধর করেন।
তাদের হামলা ঠেকাতে পাঠাগারের অন্যান্য শিক্ষার্থীরা এগিয়ে এলে তাদেরও মারধর করার অভিযোগ ওঠে।
পরে প্রক্টরিয়াল বডি, পুলিশ সদস্য ও পাঠাগারের শিক্ষার্থীরা শিবির ও রাকসু নেতাদের পাঠ কক্ষ থেকে বের করে দেন। আহত শিক্ষার্থীরা তখনও ভেতরে ছিলেন।
কিছুক্ষণ পর সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক গিয়াস উদ্দিন এবং কয়েকজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষক আহত শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসানকে ভেতরের গেট দিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করেন।
তবে অ্যাম্বুলেন্সে তোলার সময় দুজন আবারও তার ওপর হামলা চালান বলে অভিযোগ ওঠে। মাহমুদুলকে অ্যাম্বুলেন্স থেকে টেনে নামিয়ে প্রক্টরিয়াল বডির সামনেই বারবার লাথি মারা হয়। পরে পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের হস্তক্ষেপে তাকে হাসপাতালে পাঠানো হয়।
রাবি প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, এই ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে।
এদিকে, আনাস ছাত্রদলের সঙ্গে যুক্ত—এমন অভিযোগের জবাবে রাবি ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, আনাস তাদের সংগঠনের কোনো সদস্য বা পদধারী নেতা নন।
তবে এই গ্রেপ্তারের তীব্র নিন্দা জানিয়ে তিনি অভিযোগ করেন, প্রেমের প্রস্তাব সম্পর্কিত একটি ব্যক্তিগত বিরোধকে ছাত্রশিবির উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে রাজনৈতিক রূপ দিয়েছে।