আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায়ে অসন্তুষ্ট পরিবার
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায়ে হতাশ তার পরিবার। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই রায়ে প্রত্যাশিত বিচার পাননি বলে দাবি করেছেন আবু সাঈদের বাবা-মা।
আজ বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ মামলার রায় ঘোষণার পরপরই রংপুরের পীরগঞ্জের জাফরপাড়া বাবনপুর গ্রামে তার পরিবারে শোকের ছায়া নেমে আসে।
সকাল থেকেই আবু সাঈদের বাড়িতে গ্রামবাসী ও স্বজনরা জড়ো হয়ে টেলিভিশনের পর্দায় নজর রাখছিলেন। কিন্তু রায়ে দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড ও কয়েকজনের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড হলেও পরিবারের সদস্যদের মতে এটি তাদের প্রত্যাশার প্রতিফলন নয়।
আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম ট্রাইব্যুনাল আমার ছেলের হত্যার সঙ্গে জড়িত সব আসামিকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেবেন। কিন্তু মাত্র দুজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে—এটা আমি আশা করিনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা তো এখনো ছেলেকে হারানোর শোক কাটাতে পারিনি। প্রতিদিন কাঁদি, প্রতিটি মুহূর্ত কষ্টে কাটে। আজকের এই রায় সেই কষ্টকে আরও বাড়িয়ে দিল।’
তিনি জানান, মামলার বাদী বড় ছেলে রমজান আলী বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছে। সে বাড়িতে ফিরলে পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করে রায়ের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
আবু সাঈদের মা মনোয়ারা বেগম সন্তানের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বারবার ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, ‘এমন রায় আমরা চাইনি। আমার ছেলেটা খুব মেধাবী ছিল, খুব স্বপ্ন ছিল তার। তাকে হারিয়ে আমরা প্রতিদিন আগুনের মতো কষ্টে পুড়ছি। আমাদের এই দুঃখের কোনো শেষ নেই।’
বড়বোন সুমি আক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমার ভাইকে যেভাবে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে, তার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকেরই সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু আমরা সেই বিচার পাইনি। এই রায়ে আমরা ভীষণ হতাশ।’
চাচা মনজুর হোসেন বলেন, ‘সকাল থেকে অধীর আগ্রহে বসে ছিলাম রায় শোনার জন্য। ভেবেছিলাম সবাই সর্বোচ্চ শাস্তি পাবে। কিন্তু দুপুরে রায় শুনে আমরা ভেঙে পড়েছি। এটা আমাদের প্রত্যাশার রায় নয়।’
প্রতিবেশী আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, ‘আবু সাঈদের হত্যার বিচার নিয়ে আমরা বড় আশা করেছিলাম। কিন্তু এই রায় গ্রামবাসীর কারোরই মন ভরাতে পারেনি।’
বিশ্ববিদ্যালয়ে তার সহপাঠী ইমরান হোসেনও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা এই রায়ে মর্মাহত। আমাদের দাবি ছিল—এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সবাইকে সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে হবে। তাহলে প্রকৃত বিচার নিশ্চিত হতো।’
২০২৪ সালের জুলাইয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে রংপুরে পুলিশের গুলিতে নিহত হন আবু সাঈদ। নিরস্ত্র অবস্থায় বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার সেই দৃশ্যের ভিডিও আলোড়ন তোলে ও আন্দোলনকে বেগবান করে।
এই মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ পুলিশের সাবেক দুই সদস্য—সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আমির হোসেন ও কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়কে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। এছাড়া ২৮ জন আসামির মধ্যে তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে।