হঠাৎ বৃষ্টি ও লোকসানের ভারে ম্লান ঠাকুরগাঁওয়ের আলু চাষিদের ঈদ
চারদিকে ঈদের কেনাকাটার ধুম পড়লেও ঠাকুরগাঁওয়ের আলু চাষিদের চোখেমুখে এখন দুশ্চিন্তার ভাঁজ। হঠাৎ বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে জেলার বিভিন্ন এলাকার আলুখেত, বাজারেও মিলছে না ন্যায্য দাম।
সদর উপজেলার শিবগঞ্জ ভাউলারহাট এলাকায় বৃষ্টির জমা কাদা থেকে আলু তুলছিলেন কৃষক রশিদুল ইসলাম। আমন ধান বিক্রির পুঁজি আর ধারদেনা মিলিয়ে দুই বিঘা জমিতে আলু বুনেছিলেন তিনি।

রশিদুল বলেন, প্রতি কেজি আলু ফলাতে খরচ হয়েছে প্রায় ১৫ টাকা, আর বাজারে বিক্রি করতে হচ্ছে ৯ থেকে ১০ টাকায়। বৃষ্টিতে সব খেত ডুবে গেছে। এই মৌসুমে আলুর দামও কম। ঈদের আনন্দ তো দূরের কথা, এখন ঋণ শোধ করব কী করে, সেই চিন্তায় ঘুম নেই।
একই দশা ওই এলাকার কৃষক মো. আলমগীর হোসেনের। এক একর জমিতে প্রায় এক লাখ টাকা খরচ করে আলু চাষ করলেও ন্যায্যমূল্য ও ক্রেতার অভাবে বিপাকে পড়েছেন। ঘরে ছোট দুই ছেলে-মেয়ে নতুন জামার বায়না ধরলেও বাবা হিসেবে তা পূরণ করতে পারছেন না।
আলমগীর বলেন, কৃষি পণ্য বিক্রি করেই সংসারের যাবতীয় খরচসহ ঈদ-পরবের খরচ নির্বাহ করতে হয়। ভেবেছিলাম আগের বছরের লোকসান এবার পুষিয়ে যাবে। কিন্তু এখন তো ডাল-ভাত খাওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছে। সন্তানদের জন্য শেষ পর্যন্ত আবার কারও কাছ থেকে টাকা ধার নিতে হবে।
বাজারে আলুর অতিরিক্ত সরবরাহ আর বৃষ্টির কারণে মান কমে যাওয়ার শঙ্কায় পাইকাররাও বিমুখ। ফাড়াবাড়ি গ্রামের বর্গাচাষি শহীদুল ছয় মণ আলু আড়তে নিয়ে গিয়েও কাঙ্ক্ষিত দাম না পেয়ে ফেরত নিয়ে গেছেন।
হতাশ এই চাষি বলেন, পাইকাররা নিতেই চায় না। যে দাম বলে, তাতে ঈদের বাজার তো দূরের কথা, কিছুই হবে না।
জেলার বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার দোগাছি গ্রামের কৃষক মামুন ষাট শতক জমি লিজ নিয়ে আমন আবাদের পর আলু চাষ করেছেন। তারও আলু খেত পানিতে ডুবে গেছে।
ঈদের কেনাকাটার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পাঁচ মণ ধান রেখেছিলাম ঘরে একান্ত প্রয়োজনে বিক্রি করার জন্য। ভেবেছিলাম ওই ধান বেচেই দুই ছেলের কাপড় কিনে দেব। কিন্তু বাজারে ধানেরও দাম নেই। শেষ পর্যন্ত বাচ্চাদের কেনাকাটার কী হবে কে জানে।
চাষিদের এই হাহাকারের প্রভাব পড়েছে স্থানীয় বাজারগুলোতেও। সাধারণত ঈদের আগে গ্রামের দোকানগুলোতে তিল ধারণের জায়গা থাকে না। কিন্তু শিবগঞ্জ হাটের পোশাক ও প্রসাধনীর দোকানদাররা এখন অলস সময় পার করছেন। ক্রেতা নেই বললেই চলে।
মঙ্গলবার দুপুরে উপজেলার শিবগঞ্জ হাটে গিয়ে দেখা যায়, দোকান গুলোতে হাতে গোনা অল্প কিছু ক্রেতা। বেশির ভাগ দোকানেই বিক্রেতারা অলস সময় পার করছেন।
ইয়াকুবপুর থেকে শহরে ছেলের জন্য পাঞ্জাবি কিনতে আসা কৃষক রফিকুল ইসলাম হিসাব মেলাতে পারছিলেন না। তিনি বলেন, একটা পাঞ্জাবির দাম চায় দুই হাজার টাকা। বর্তমান বাজার দরে এক পাঞ্জাবি কিনতেই পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ মণ আলু বেচতে হবে। আমাদের মতো চাষিদের জন্য ঈদ এখন বিলাসিতা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেলায় এ বছর ২৮ হাজার ২৮৫ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি। এর মধ্যে প্রায় ৬ হাজার হেক্টর জমির আলু বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে।
ঠাকুরগাঁও জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মাজেদুল ইসলাম জানান, চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি হওয়া এবং বৃষ্টির কারণে তড়িঘড়ি আলু বাজারে তোলায় দামের ওপর এই বিরূপ প্রভাব পড়েছে। আলুর বহুমুখী ব্যবহার ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা উন্নত না হলে চাষিদের এই সংকট দূর করা কঠিন।