সালমান রুশদির নতুন বইয়ে বৈশ্বিক অস্থিরতা
মানুষ জীবনের অধিকাংশ সময় ব্যয় করে এগিয়ে যাওয়ার তাগিদে। কিন্তু সময় যখন ধীরে ধীরে ফুরিয়ে আসে, তখন সেই গতি থেমে যায়, শুরু হয় ফিরে তাকানোর কাজ।
সালমান রুশদির 'দ্য ইলেভেন্থ আওয়ার' সেই ফিরে তাকানোর সাহিত্য, যেখানে জীবনকে আর নতুন করে গড়ার আকাঙ্ক্ষা নেই, আছে বুঝে নেওয়ার চেষ্টা। এটি কোনো হইচই তোলা উপন্যাস নয়, কোনো বিস্তৃত মহাকাব্যও নয়। বরং জীবনের শেষ বাঁকে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের নিয়ে লেখা পাঁচটি গভীর, সংযত, অথচ তীক্ষ্ণ গল্পের সংকলন।
গত বছর নভেম্বরে যুক্তরাজ্যের জোনাথন কেপ থেকে প্রকাশ হওয়া সংকলিত গল্পের বইটি দ্য গার্ডিয়ানের ২০২৫ সালের সেরা ফিকশনগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে।
তাছাড়া, দ্য নিউইয়র্কার ও ফাইনান্সিয়াল টাইমসের ২০২৫ সালের সেরা ফিকশন এটি। এতে মূলত জীবন, মৃত্যু, বার্ধক্য এবং শেষ মুহূর্ত (ইলেভেন্থ আওয়ার) নিয়ে পাঁচটি গল্প রয়েছে। ২০২২ সালে হামলার শিকার হওয়ার পর এটিই রুশদির প্রথম ফিকশন বই।
পাঁচটি গল্পের সংকলনে রুশদি ভিন্ন ভিন্ন চরিত্র, স্থান ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে একই মানবিক সংকটের দিকে আমাদের নিয়ে যান। গল্পগুলোর পটভূমি দক্ষিণ এশিয়া, ইউরোপ কিংবা আমেরিকা হলেও, তাদের কেন্দ্রে যে অনুভূতিগুলো কাজ করে—স্মৃতি, অপরাধ বোধ, সম্পর্কের ভাঙন, মৃত্যুচিন্তা—সেগুলো সর্বজনীন।
পাঁচটি গল্পে মূলত জীবন, মৃত্যু ও এর সন্ধিক্ষণে কিংবা শেষ মুহূর্তে মানুষের জীবন যেভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও ধ্রুব সত্য হয়ে ওঠে, সেটাই ফুটে উঠেছে।
সংযোজিত গল্প পাঁচটি হলো—
১. ইন দ্য সাউথ
২. দ্য মিউজিশিয়ান অব কাহানি
৩. লেট
৪. ওকলাহোমা
৫. দ্য ওল্ড ম্যান ইন দ্য পিৎজা
ইলেভেন্থ আওয়ার তথা 'এগারোতম ঘণ্টা' কোনো নাটকীয় সংকেত নয়, বরং সেই নীরব মুহূর্ত যখন মানুষ উপলব্ধি করে যে সময় আর তার নিয়ন্ত্রণে নেই। তখন প্রশ্নগুলোও বদলে যায়। 'কী পেলাম'-এর চেয়ে বড় হয়ে ওঠে 'কী হারালাম', আর 'কী বলা বাকি'।
এর ভাষা লক্ষণীয়ভাবে সংযত। রুশদি এখানে তার পরিচিত ভাষিক কসরত বা কল্পনার বিস্তারকে অনেকটাই সরিয়ে রেখেছেন। পরিবর্তে তিনি বেছে নিয়েছেন সরলতা ও স্থৈর্য।
এই সংযম গল্পগুলোকে আরও গভীর করে তোলে। কারণ চরিত্রদের কথা উচ্চস্বরে নয়, নিঃশব্দে পাঠকের কাছে পৌঁছে যায়।
বইটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মৃত্যু জীবনের বিপরীত নয়। বরং এটি জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা আমাদের প্রতিটি সিদ্ধান্তকে অর্থ দেয়। গল্পগুলোর চরিত্ররা মৃত্যু নিয়ে আতঙ্কে নয়, বরং একধরনের নিরাবেগ স্বচ্ছতায় ভাবতে শেখে—জীবন আসলে কী ছিল।
এর পাশাপাশি, স্মৃতি এই বইয়ের অন্যতম প্রধান উপাদান। কিন্তু এখানে স্মৃতি নিছক নস্টালজিয়া নয়। এটি দায়িত্বের প্রশ্ন, না পালন করা অঙ্গীকারের হিসাব এবং নিজের সঙ্গে নিজের বোঝাপড়ার ক্ষেত্র।
রুশদি দেখান, মানুষ অতীতকে ভুলে নয়, বোঝার মধ্য দিয়েই সামনে এগোয়। এমনকি সামনে আর কিছু না থাকলেও। এই বইটি তরুণ বয়সের উত্তেজনাপূর্ণ বা রোমাঞ্চকর পাঠ নয়। তবে হতাশ হওয়ার কারণ নেই। ধৈর্য নিয়ে থেমে থেমে পড়লে এর অর্থ ধরতে খুব বেগ পেতে হবে না পাঠককে।
কিন্তু এটি সেই পাঠকদের জন্য, যারা জানেন জীবনের মূল্য সময়ের সঙ্গে বদলায়। যারা উপলব্ধি করেছেন, সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না, কিন্তু কিছু প্রশ্নের সঙ্গে বাঁচতে শেখাই জীবনের পরিণতি এবং প্রশ্নকেই প্রশ্ন করে এগিয়ে চলার মাধ্যমেই আমরা ক্রমশ জীবনকে উপভোগ করি।
বর্তমান পৃথিবীর প্রেক্ষাপটে বইয়ের তাৎপর্য আরও স্পষ্ট। যুদ্ধ, অনিশ্চয়তা ও দ্রুত পরিবর্তনের যুগে আমরা প্রায়ই ভবিষ্যতের দিকেই তাকিয়ে থাকি। 'দ্য ইলেভেন্থ আওয়ার' আমাদের ফিরিয়ে আনে বর্তমান ও অতীতের সংযোগে, যেখানে মানুষ নিজেকে প্রশ্ন করতে পারে—আমি কী রেখে যাচ্ছি? কে কাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছি?
মোদ্দাকথা, 'দ্য ইলেভেন্থ আওয়ার' কোনো তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলার বই নয়। এটি ধীরে কাজ করে, নীরবে। সালমান রুশদি এখানে গল্পকারের চেয়ে বেশি একজন চিন্তাশীল সাক্ষী, যিনি সময়ের প্রান্তে দাঁড়িয়ে মানবজীবনের দিকে তাকান সহমর্মিতা ও প্রজ্ঞা নিয়ে।
লেখক আমাদের শেখায়, শেষ মুহূর্ত মানেই শূন্যতা নয়। অনেক সময় সেটিই হয় সবচেয়ে স্পষ্ট, সবচেয়ে সত্য সময়—যখন মানুষ নিজের জীবনের মুখোমুখি হওয়ার সাহস পায়।