২০২৫ সালে গার্ডিয়ানের সেরা বইয়ে ‘অনিশ্চিত জীবন ভাবনা’

সুমন রেজা
সুমন রেজা

কিছু বই পড়লেও শেষ হয় না গল্প, রেশ থেকে যায়। পাশাপাশি শুরু হয় এক ধরনের অস্বস্তি। টমাস পিনচনের 'শ্যাডো টিকিট' ঠিক সেই ধরনের একটি উপন্যাস।

যুক্তরাষ্ট্রের পেঙ্গুইন প্রেস থেকে লেখকের এক যুগ পর প্রকাশিত এই আখ্যান দ্য গার্ডিয়ানের ২০২৫ সালের সেরা বইয়ের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। একই সময়ে নিউইয়র্ক টাইমসের 'বিশেষ উল্লেখযোগ্য' ও বেস্ট সেলার বই এটি।

আপাত দৃষ্টিতে রহস্যময় ধাঁচের গোয়েন্দা কাহিনী মনে হলেও, ভেতরে ভেতরে বইটি আধুনিক মানুষের পরিচয়—যেমন: আইডেন্টিটি ক্রাইসিস, সত্য ও ক্ষমতার কাঠামো—নিয়ে এক গভীর প্রশ্নছায়া তৈরি করে।

এতে ফ্যাসিবাদের উত্থান, বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বর্তমান বিশ্বের সঙ্গে অতীতের যোগসূত্র তুলে ধরা হয়েছে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও বাস্তবিক প্রেক্ষাপটে।

গল্পের কেন্দ্রে একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ—লিউ ট্রেভিস। কিন্তু ব্যক্তি ট্রেভিস সম্পর্কে খুব বিশদ বর্ণনা লেখক দেননি। যাই হোক, নিখোঁজ এক ব্যক্তির খোঁজে সে ঢুকে পড়ে লস অ্যাঞ্জেলসের আলো-আঁধারি জগতে। সিনেমা হল, বার, মোটেল, অচেনা মুখ—সব মিলিয়ে এক চেনা শহর ক্রমে অচেনা হয়ে ওঠে।

অনুসন্ধান যত এগোয়, কেস তত জটিল হয়। ব্যক্তি যেন কেবল ব্যক্তি থাকে না—নাম বদলায়, অতীত ভেঙে যায়, অস্পষ্ট হয়ে ওঠে সত্য। একসময় পাঠকের মনেও প্রশ্ন জাগে—যাকে খোঁজা হচ্ছে, সে কি সত্যিই ছিল, নাকি কেবলই এক নির্মিত ছায়া?

পিনচনের দক্ষতা এখানেই। তিনি সরাসরি কিছু বলেন না, বরং পরিস্থিতি তৈরি করেন। পাঠক নিজেই অনিশ্চয়তার ভেতরে পড়ে যায়। 'শ্যাডো টিকিট' মূলত সেই অনিশ্চয়তার গল্প, যে অনিশ্চয়তা আধুনিক সভ্যতার গভীরে গাঁথা।

উপন্যাসটির প্রেক্ষাপট যুদ্ধোত্তর আমেরিকা। হলিউড তখন স্বপ্ন তৈরি করছে, শহরগুলো ঝলমলে আলোয় ভরা, কিন্তু সেই আলো ঢেকে রাখতে পারছে না ভেতরের শূন্যতা। ব্যক্তিগত জীবনে মানুষ ক্রমে বিচ্ছিন্ন, রাষ্ট্র ও ক্ষমতার কাঠামো ক্রমে জটিল। এই পটভূমিতে পিনচন দেখান, সত্য কখনো একরৈখিক নয়, বরং ক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় তার রূপ।

উপন্যাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি নোয়ার ধারার ভেতর থেকেও প্রচলিত গোয়েন্দা সাহিত্যের সীমা ভেঙে দেয়। যেখানে ক্লাসিক নোয়ার গল্পে অপরাধের একটি সমাধান থাকে, সেখানে পিনচনের শ্যাডো টিকিটে সমাধান নিজেই প্রশ্নবিদ্ধ।

উপন্যাসটি আসলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আমেরিকান মানসিকতার প্রতিচ্ছবি, যেখানে স্নায়ু যুদ্ধ, নজরদারি রাষ্ট্র ও করপোরেট ক্ষমতার উত্থান মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করে দিচ্ছিল। লিউ ট্রেভিসের অনুসন্ধান সেই বৃহত্তর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণের ছায়ার মধ্যেই ঘুরপাক খায়।

পিনচনের উপন্যাসে এই ভাঙা পরিচয়ের সংকট খুব সূক্ষ্মভাবে উঠে আসে। এখানে কেউ পুরোপুরি ধরা দেয় না, কেউ পুরোপুরি হারায়ও না। এই অবস্থান আমাদের বর্তমান বিশ্ব রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থার সঙ্গেও অদ্ভুতভাবে মিলে যায়, যেখানে রাষ্ট্র, করপোরেশন ও ক্ষমতাকাঠামো প্রায়ই সত্যকে নিজেদের মতো করে নির্মাণ করে। ইতিহাস, ষড়যন্ত্র ও পপ-কালচার মিশ্রিত এক জটিল অ্যাডভেঞ্চার উপন্যাস।

আজকের বৈশ্বিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে 'শ্যাডো টিকিট' আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে তথ্য আছে প্রচুর, কিন্তু সত্য কম। সোশ্যাল মিডিয়া, অ্যালগরিদম, কৃত্রিম পরিচয়—সব মিলিয়ে মানুষ নিজেই যেন একাধিক মুখে বিভক্ত। অনলাইনে তৈরি হওয়া পরিচয় আর বাস্তব জীবনের সত্তা অনেক সময় একে অপরের ছায়ামাত্র।

বাংলাদেশের পাঠকের জন্যও বইটির আবেদন কম নয়। যখন আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে তথ্য ও গুজব, বাস্তব ও নির্মিত বয়ান প্রায়ই গুলিয়ে যায়। 'শ্যাডো টিকিট' আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সত্যের খোঁজ সহজ নয়, ভয়াবহ কঠিন।

বিশেষ করে পরিচয় বদল, ভুয়া নাম, নথির অস্পষ্টতা, এসব উপাদান আজকের ডিজিটাল যুগে এসে আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এআই সৃষ্ট বিভিন্ন ছবি, ভিডিও এবং এর পাশাপাশি ফেক নিউজ, ডিপফেক ভিডিও, ভুয়া আইডেন্টিটি, ডেটা ম্যানিপুলেশন, এই সবকিছুই যেন পিনচনের উপন্যাসের ভাবনাকে বাস্তবের মাটিতে নামিয়ে এনেছে।

আজ আমরা জানি, সত্য আর মিথ্যার মাঝখানের সীমারেখা আর আগের মতো স্পষ্ট নয়। রাষ্ট্র থেকে শুরু করে বড় প্রযুক্তি করপোরেশন—সবারই আছে নিজেদের 'বয়ান' তৈরির ক্ষমতা।

সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক মেরুকরণ, তথ্যযুদ্ধ ও নাগরিকদের ওপর নজরদারি বেড়ে যাওয়ার ঘটনাগুলো 'শ্যাডো টিকিট' পাঠকে প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।

এটি আমাদের শেখায়—সব প্রশ্নের উত্তর হয়তো নেই, কিন্তু প্রশ্ন তোলা থামিয়ে দেওয়াই সবচেয়ে বিপজ্জনক।

বাংলাদেশের পাঠকের জন্যও বইটির আবেদন কম নয়। যখন আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে তথ্য ও গুজব, বাস্তব ও নির্মিত বয়ান প্রায়ই গুলিয়ে যায়। 'শ্যাডো টিকিট' আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সত্যের খোঁজ সহজ নয়, ভয়াবহ কঠিন। পরিষ্কার করেছেন—সব আলো মানেই আলোকিত হওয়া নয়।

'শ্যাডো টিকিট' পড়ে শেষ করলে মনে হয়, আমরাও কি নিজেদের অজান্তে এক ছায়ার টিকিট হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি না?

সম্ভবত এটাই পিনচনের সবচেয়ে বড় সাফল্য। তিনি আমাদের কোনো সমাধান দেন না, কিন্তু প্রশ্নগুলো এমনভাবে রেখে যান, যেগুলো সময় পেরিয়েও অটুট থাকে।

এই কারণেই 'শ্যাডো টিকিট' কেবল একটি উপন্যাস নয়, বরং আমাদের সময়ের এক অস্বস্তিকর, কিন্তু জরুরি প্রতিচ্ছবি।

'শ্যাডো টিকিট' শুধু সাহিত্যিক আগ্রহের বিষয় নয়, বরং বিশ্ববাসীর কাছে একটি সতর্কবার্তা। এটি আমাদের ভাবতে বাধ্য করে, আমরা যে বাস্তবতাকে স্বাভাবিক ধরে নিচ্ছি, সেটি আদৌ কতটা বাস্তব? নাকি আমরাও লিউ ট্রেভিসের মতোই এক বিভ্রমময় শহরে ঘুরে বেড়াচ্ছি, যেখানে প্রতিটি আলো আরেকটি গভীর ছায়ার জন্ম দেয়, জন্ম দেয় অনেক অনেক প্রশ্নের। আর আদৌ কোনো সমাধান নেই হয়তো।

শেষ পর্যন্ত মুখোমুখি হয় কঠিন সত্যের। এতে সব অন্ধকার দূর করা যায় না, কিন্তু অন্ধকারকে চিনে নেওয়াই প্রথম প্রতিরোধ। বর্তমান বৈশ্বিক দোলাচলের পরিপ্রেক্ষিতে পিনচনের 'শ্যাডো টিকিট' একটি অবশ্য পাঠ্য বই হিসেবে ইতোমধ্যেই বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে।