নিজস্ব যে ভাষাশৈলী তৈরি করেছিলেন আবুল মনসুর আহমদ
সাধারণ মানুষের ভাষা অসাধারণভাবে প্রকাশ করেছেন আবুল মনসুর আহমদ। বাংলা ভাষাভাষী জনগণের শৈল্পিক কারিগর ছিলেন তিনি। অসাধারণ দরদি কণ্ঠে ও কলমের ডগায় বর্ণনা করেছেন শ্রমজীবী মানুষের জীবন ও আখ্যান। সেই গল্পে দ্রোহ, আকাঙ্ক্ষা ও প্রতিবাদ মুখরিত হয়েছে অভিনব ভাষা বর্ণনায়। সাহিত্যে তা স্থান পেয়েছে অনন্য এক শৈলী হিসেবে।
আবুল মনসুরকে পাঠ করলে লেখার এ স্বাতন্ত্র্য সহজেই ধরা পড়ে। তার লেখার আরেকটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো তিনি সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক কিংবা নৈতিক সমস্যার উল্লেখ করেই বয়ান শেষ করেননি, বরং তার সমাধানও বাতলে দিয়েছেন। ফলে তার লেখনিতে জনমানুষের চেতনার জগতের বিস্তার লক্ষ্য করা যায়।
আবুল মনসুর আহমদের জন্ম অবিভক্ত বাংলার ত্রিশালে। জন্মের পর বঙ্গভঙ্গ, বঙ্গভঙ্গ রদ, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাসহ নানা ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে তিনি পরিচিত হয়েছেন। এসব অভিজ্ঞতা তার স্মৃতি ও চিন্তার ভুবনকে সমৃদ্ধ করেছে। সাতচল্লিশের দেশভাগ, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, বাষট্টি, ছেষট্টি, ঊনসত্তর ও সত্তরের ঘটনাপ্রবাহ তাকে দারুণভাবে আলোড়িত করেছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধেরও তিনি ছিলেন প্রত্যক্ষ সাক্ষী ও অংশীজন। তার লেখা ও বক্তৃতায় সেই দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।
আবুল মনসুর আহমদ প্রখর মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও রাজনীতিতে। কালজয়ী সাহিত্য, দূরদর্শী রাজনীতি, নির্ভীক সাংবাদিকতা ও গভীর ভাষাচিন্তার মিশেলে তিনি হয়ে উঠেছিলেন জনমানুষের মুক্তির দূত। সাহিত্য তিনি রচনা করেছেন বটে, কিন্তু গতানুগতিক সাহিত্যের চর্চায় অভিনিবিষ্ট হননি। সাহিত্যকে তিনি সাধারণ মানুষের মুক্তির চেতনার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। ফলে তার রচনায় প্রবল প্রতিরোধের পাশাপাশি আছে বিপ্লবের অগ্নিমূর্তি।
সাংবাদিকতা ছিল তার ভালোবাসার কাজ। পটু ও দক্ষ সাংবাদিক হিসেবে তিনি আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। সত্যের প্রচারের জন্য সাংবাদিকতা পেশা বেছে নিয়েছিলেন। বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা এবং অন্যায়ের প্রবল প্রতিবাদে তার কলম সর্বদা জাগ্রত ছিল। রাজনীতিতেও তিনি সফল ব্যক্তি ছিলেন। শিক্ষামন্ত্রীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রিত্ব পালন করেছেন। দলীয় প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হলেও সংসদে তিনি নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কথা বলেছেন। রাজনৈতিক সংস্কৃতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন তিনি। নিজেদের দলের কেউ অন্যায় করলে সংসদে অকপটে তা উল্লেখ করেছেন এবং তার সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছেন। তার এসব ভাষ্যে মানুষের মুক্তির গানের বার্তা আছে, অপসংস্কৃতি দূর করে সুস্থ সংস্কৃতি বিকাশের পথ আছে।
আবুল মনসুর আহমদ সাহিত্যে জনগণের ভাষা ব্যবহারের পক্ষে ছিলেন। ভাষা পরিকল্পনায় তিনি দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। বিংশ শতকের ত্রিশের দশকে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির রূপান্তর প্রক্রিয়ার মধ্যে তিনি সাহিত্যচর্চা অব্যাহত রেখেছিলেন। সে সময় বাংলা ভাষার একটি সাহিত্যিক রূপ গড়ে উঠলেও ভাষার অবয়বগত পরিকল্পনা, তথা বানান ও উচ্চারণের সুসংহত নিয়ম প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এ সময়ে তিনি ভাষা সম্পর্কে পরিণত বয়ান নির্মাণ করে চলেছেন। চলিত ভাষা সম্পর্কে তিনি ভাষাবিজ্ঞানীর ন্যায় অনুপুঙ্খ আলোচনায় প্রয়াসী হয়েছেন।
প্রচলিত চলিত ভাষার বিরুদ্ধে তার সবচেয়ে বড় অভিযোগ ছিল, এটি পশ্চিম বাংলার নিজস্ব ভাষা; পূর্ব বাংলার স্বকীয়তা এতে নেই। তাই তিনি পূর্ব বাংলার জন্য আলাদা ভাষারীতি প্রচলনের পক্ষে ছিলেন। তিনি নানা যুক্তিতর্কের মাধ্যমে এ কথা প্রমাণের চেষ্টা করেছিলেন যে, পশ্চিম বাংলার কথ্য ভাষাকে যতই প্রমিত বাংলা বলা হোক না কেন, পূর্ব বাংলার কথ্য ভাষা পশ্চিম বাংলার কথ্য ভাষার তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ ও সাধুভাষার নিকটবর্তী। উদাহরণস্বরূপ, সাধু ক্রিয়া ‘খাইতেছি’-এর সঙ্গে পশ্চিম বাংলার ‘খাচ্ছি’ ও পূর্ব বাংলার ‘খাইতাছি’ তুলনা করলে দেখা যায়, পূর্ব বাংলার শব্দই সাধুভাষার অধিক নিকটবর্তী।
পূর্ব ও পশ্চিম বাংলার ভাষার পার্থক্যকে কেন্দ্র করে তিনি স্বপ্ন দেখতেন, ইংরেজি ভাষার দুই সংস্করণ ব্রিটিশ ইংরেজি ও আমেরিকান ইংরেজির মতো বাংলারও দুটি সংস্করণ হবে—পশ্চিমবঙ্গীয় বাংলা ও পূর্ববঙ্গীয় বাংলা।
ভাষার ক্ষেত্রে তিনি মুসলমানি স্বাতন্ত্র্যবোধকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন। তার ভাষায়, ‘গোশ্ত, আন্ডা ও পানির মধ্যে ইসলামত্ব নাই বটে, তবে মুসলমানত্ব আছে। ... আমরা যদি পানি ছাড়িয়া জল ধরি, তবে ধর্মচ্যুত হইব না সত্য, তবে ঐতিহ্যচ্যুত হইব নিশ্চয়।’
তার মতে, এসব শব্দ শত শত বছর ধরে মুসলমানরা ব্যবহার করছে। পক্ষান্তরে, হিন্দুরা এর পরিবর্তে মাংস, ডিম ও জল ব্যবহার করছে। তাই এসব শব্দ এক একটি ‘কালচারাল আইডেন্টিটি’ বা কৃষ্টিগত স্বীকৃতি পেয়ে গেছে। কিন্তু একটি ছেড়ে অন্যটি গ্রহণ করতে যাওয়াতেই তার আপত্তি ছিল।
বর্তমানে, অতিমাত্রায় অসাম্প্রদায়িক চেতনা প্রকাশ করতে গিয়ে অবলীলায় মুসলমানি বাংলার পরিবর্তে সংস্কৃত কিংবা অন্য ভাষার শব্দ ও বাক্য ব্যবহারের প্রবণতা দেখা যায়। অথচ ইসলাম সংক্রান্ত শব্দই সেখানে অনেক বেশি যুৎসই। এমনকি মুসলমানি কিংবা ইসলামি সংস্কৃতির শব্দের কমতিও সেখানে নেই। অসচেতনতা কিংবা হীনম্মন্যতার কারণেই এসব শব্দের পরিবর্তে অন্য শব্দের প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। অন্যদিকে হিন্দু সংস্কৃতিতেও এরূপ ঘটনা অহরহ ঘটে।
মনে রাখতে হবে, বাংলার হিন্দু-মুসলমান উভয়েই বাংলায় কথা বললেও এবং বাংলায় লিখলেও তাদের ভাষার মধ্যে একটি ঐতিহ্যগত পার্থক্য থাকবে। এদের কোনো একটিকে প্রমিত বাংলা আর অপরটিকে অপ্রমিত বাংলা বলা যাবে না। আবুল মনসুর আহমদ বিষয়টি উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি লেখায় অত্যন্ত সচেতনভাবে এই পার্থক্য বজায় রাখতেন। বাঙালি মুসলমান সমাজের জনজীবন, সংস্কৃতি ও মনস্তত্ত্ব সঠিকভাবে ফুটিয়ে তোলার জন্য তিনি বাংলা ভাষার পাশাপাশি উপযুক্ত পারস্য-আরবি ও প্রচলিত সমার্থক শব্দ অত্যন্ত সার্থকভাবে ব্যবহার করেছেন।
কলকাতার সংস্কৃতঘেঁষা ঐতিহ্য ও শব্দভান্ডারের বাইরে পূর্ব বাংলার সাধারণ মানুষের মুখের ভাষার সমন্বয়ে একটি স্বতন্ত্র ‘বাংলাদেশি বাংলা’ বা নিজস্ব মানভাষা গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। আবুল মনসুর আহমদ কলকাতাকেন্দ্রিক সাধু বা প্রমিত গদ্যের অনুকরণ না করে পূর্ব বাংলার নিজস্ব লোকভাষা, বিশেষ করে ময়মনসিংহ অঞ্চলের উপভাষার ওপর ভিত্তি করে গদ্য নির্মাণের পক্ষে ছিলেন।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, তার লেখা ‘মোসলমানি কথা’ বইটি জনৈক হিন্দু প্রকাশক অনেক বেশি রয়্যালটি দিয়ে প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ‘মোসলমানি বাংলা’ বিষয়ে তার সঙ্গে মতভেদ দেখা দিলে তিনি বইটি ওই প্রকাশককে না দিয়ে তুলনামূলক কম রয়্যালটির বিনিময়ে মওলানা আকরম খাঁর প্রকাশনীকে দিয়েছিলেন।
আবুল মনসুর আহমদের গ্রন্থগুলোতে স্বতন্ত্র শৈলীর প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। ‘আয়না’ গ্রন্থে লেখকের এ শৈলীর পরিচয় সুস্পষ্টভাবে পাওয়া যায়। ‘আয়না’ বাংলা সাহিত্যের ব্যঙ্গরচনার জগতে আবুল মনসুর আহমদের একটি কালজয়ী গ্রন্থ। সমাজ, ধর্ম ও রাজনীতি—প্রতিটি ক্ষেত্রকে নিয়ে তিনি ‘আয়না’র উদ্দেশ্যমূলক প্লট তৈরি করেছেন মানুষের জীবন ও সমাজের আবৃত দিকের প্রকৃত স্বরূপ উন্মোচনের জন্য।
‘আয়না’য় মোট সাতটি আলেখ্য অন্তর্ভুক্ত। প্রতিটি আলেখ্যেই তিনি সরসভাবে সমাজের বিশ্লিষ্ট রূপের ব্যঙ্গ করেছেন নির্মম ও শাণিত দৃষ্টির মাধ্যমে। বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ‘আয়না’ গ্রন্থের ভূমিকা লিখেছেন ‘আয়নার ফ্রেম’ নামে। এতে তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘এমনি আয়নায় শুধু মানুষের বাইরের প্রতিচ্ছবি দেখা যায়, কিন্তু আমার বন্ধু শিল্পী আবুল মনসুর যে আয়না তৈরি করেছেন, তাতে মানুষের অন্তরের রূপ ধরা পড়েছে। যে সমস্ত মানুষ হরেক রকমের মুখোশ পরে আমাদের সমাজে অবাধে বিচরণ করছে, আবুল মনসুরের আয়নার ভেতর তাদের স্বরূপ-মূর্তি বন্য ভীষণতা নিয়ে ফুটে উঠেছে।’
‘ফুড কনফারেন্স’ আবুল মনসুর আহমদের আলোচিত গ্রন্থগুলোর একটি। বইটিতে নয়টি গল্প আছে—‘ফুড কনফারেন্স’, ‘সায়েন্টিফিক বিজনেস’, ‘এ.আই.সি.সি.’, ‘লঙ্গরখানা’, ‘রিলিফ ওয়ার্ক’, ‘গ্রো মোর ফুড’, ‘মিছিল’, ‘জমিদারি উচ্ছেদ’ এবং ‘জনসেবা ইউনিভার্সিটি’। প্রতিটি গল্পেই তখনকার বাস্তব অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে।
আবুল কালাম শামসুদ্দিনের মতে, তিনি বইটিতে বাংলার হিন্দু ও মুসলমানের সাধারণ চারিত্রিক দিকগুলো তুলে ধরেছেন। এমনকি তিনি তাদের সরলতার কথাও ভুলে যাননি। যেমন, ‘রিলিফ ওয়ার্ক’-এর হামিদ তেমনই একটি চরিত্র।
‘ফুড কনফারেন্স’ গল্পে দুর্ভিক্ষ সামলাতে ব্যর্থ নেতাদের তিনি ‘শেরে-বাংলা’, ‘মহিষে-বাংলা’, ‘কুত্তায়ে-বাংলা’, ‘বিল্লিয়ে-বাংলা’, ‘চুঁহায়ে-বাংলা’, ‘বেজিয়ে-বাংলা’, ‘শিয়ালে-বাংলা’ থেকে শুরু করে ‘পোকায়ে’, ‘মাকড়ে’, ‘চিঁউটিয়ে-বাংলা’ ইত্যাদি নানা নামে অভিহিত করেছেন। প্রাণীর চরিত্রের সঙ্গে বাঙালি নেতাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের তুলনা করে তিনি তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতা তুলে ধরেছেন। চরিত্রগুলোর মুখে নানা সংলাপের মাধ্যমে তিনি তখনকার বাস্তব অবস্থাকে হাস্যরসে রূপ দিয়েছেন।
খাদ্যসংকট কেন দেখা দিল, সে বিষয়ে পাঁচটি সূত্র দিয়ে সব দোষ কৃষকের ওপর চাপিয়ে দেন নেতারা। সেটিও তিনি ব্যঙ্গাত্মক যুক্তির মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। ‘ফুড কনফারেন্স’-এর একেবারে শেষে তিনি বলেছেন, সব ‘জানোয়ারে-বাংলা’রাই বেঁচে থাকে, ‘মানুষে-বাংলা’রা সব মরে যায়।
‘ফুড কনফারেন্স’ আবুল মনসুর আহমদের একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। খ্যাতিমান লেখক অন্নদাশঙ্কর রায় এ গ্রন্থ সম্পর্কে বলেছেন, ‘আয়না লিখিয়া আবুল মনসুর আহমেদ প্রাতঃস্মরণীয় হইয়াছিলেন। ফুড কনফারেন্স লিখিয়া তিনি অমর হইলেন।’
স্মৃতিকথার অন্তরঙ্গ ভঙ্গিতে লেখা আবুল মনসুর আহমদের ‘রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ গ্রন্থটি রাজনৈতিক সাহিত্যের একটি আকরগ্রন্থ। বইটি মূলত আত্মজীবনীমূলক ও স্মৃতিকথার আঙ্গিকে রচিত। ফলে এর ভাষা প্রাঞ্জল, গল্পসুলভ এবং অত্যন্ত আকর্ষণীয়। গুরুগম্ভীর রাজনৈতিক ইতিহাসও লেখকের সাবলীল বয়ানে সহজ হয়ে উঠেছে।
এ গ্রন্থে তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ ও রসবোধ রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষণে এ তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ ও শ্লেষের প্রকাশ ঘটেছে, যা পাঠককে অন্যরকম আনন্দ দেয় এবং ভেতরের সত্যকে উন্মোচন করে। এতে তিনি সহজ, সরল ও প্রাঞ্জল শব্দচয়ন করেছেন। ব্যক্তিগত স্মৃতির বর্ণনার পাশাপাশি রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি, সামাজিক অসঙ্গতি ও দাঙ্গার মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলোর বর্ণনায় ভাষা হয়ে উঠেছে প্রাবন্ধিক ও গভীর মননশীল।
আবুল মনসুর আহমদ তার লেখায় স্বতন্ত্র শৈলীর আশ্রয় নিয়েছেন। ভাষার রাজ্যে পদার্পণ করে তিনি এক সরল ও স্বতন্ত্র শৈলীর সংযোজন করেছিলেন। ভাষা পরিকল্পনা ও ভাষানীতির ধারণা তিনি অনেক আগেই ব্যক্ত করেছিলেন। ভাষার নৈরাজ্য দূর করার জন্য আবুল মনসুর আহমদের ভাষা পরিকল্পনা ও ভাষানীতি প্রশংসার দাবি রাখে।
এ জন্য তিনি প্রস্তাব করেছিলেন, আমাদের দুটি কাজ করতে হবে—প্রথমত, পূর্ব বাংলাকে গঠন করার জন্য এ দেশের মুসলিম সমাজের নতুন সংস্কৃতির বাহক নতুন সাহিত্য সৃষ্টি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, পূর্ব পাকিস্তানের সব অঞ্চলের মানুষের বোধগম্য একটি ঢাকাইয়া কথ্য বাংলা গড়ে তুলতে হবে।
কারণ, ভাষা ও সাহিত্য রাজধানীকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। আগে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের রাজধানী ছিল কলকাতা; দেশভাগের পর রাজধানী হয়েছে ঢাকা। সুতরাং, ঢাকাসহ অন্যান্য শহরের মধ্যবিত্ত শ্রেণির বাঙালি ভদ্রলোকের কথ্য ভাষাই হবে আমাদের সাহিত্যের ভাষা। তারা অফিসে, আদালতে, ক্লাবে, বৈঠকখানায়, স্কুলে ও কলেজে যে ভাষায় কথা বলেন, যে শব্দ ও ক্রিয়াপদ, যে স্বরভঙ্গি ও বাকপ্রণালি ব্যবহার করেন, সে পরিশীলিত কথ্য ভাষাই হবে আমাদের সম্মিলিত মানভাষা ও সাহিত্যের মাধ্যম।
সবার বোধগম্যতার জন্যই এটি প্রয়োজন। এর জন্য একটি নিউক্লিয়াসের প্রয়োজন পড়বে। কলকাতার নিউক্লিয়াস ছিল শান্তিপুরী ভাষা; আমাদের নিউক্লিয়াস হতে পারে বিক্রমপুরের ভাষাভঙ্গি। আমাদের পাড়াগাঁয়ে হাজার হাজার চলতি শব্দ অবহেলিত হয়ে পড়ে আছে, সেগুলোকে মানভাষায় গ্রহণ করতে হবে।
আবুল মনসুর আহমদের ভাষার সৌকর্য অনুশীলন অত্যাবশ্যক। তার ভাষাসংক্রান্ত আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কালের পরিক্রমায় সে গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলা বানান ও উচ্চারণের নিয়ম রচিত হলেও তার যথাযথ প্রয়োগ সর্বত্র ঘটেনি। ফলে প্রমিত বানানের ব্যবহার নিশ্চিত করার আলোচনা অনেক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। সাহিত্য ও দৈনন্দিন জীবনের ব্যবহারে ভাষার গুরুত্ব যথাযথভাবে অনুসরণীয় হওয়া দরকার।
আবুল মনসুর আহমদের ভাষাশৈলীর তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। তার ভাষাচিন্তা ছিল অত্যন্ত বৈপ্লবিক। তিনি প্রমিত বাংলার পাশাপাশি পূর্ব বাংলার মানুষের মুখের ভাষা ও শব্দভান্ডারকে সাহিত্যে স্থান দেওয়ার পক্ষে ছিলেন। এ ধারণা থেকে প্রতিভাত হয়, তিনি চিন্তায় কতটা প্রাগ্রসর ছিলেন।
তার এ চিন্তা আজও প্রাসঙ্গিক। সাহিত্য, রাজনীতি, সংস্কৃতিচর্চা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় আবুল মনসুর আহমদের চিন্তার প্রসারণ প্রয়োজন। তরুণ প্রজন্মের কাছে তার এ ভাষাশৈলীর তাৎপর্য পৌঁছে দিতে পারলে বাংলা ভাষার স্বকীয়তা রক্ষা পাবে এবং ভাষাসংক্রান্ত নানা সমস্যার সমাধানের পথ সুগম হবে।
মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান: অধ্যাপক, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।