আবুল মনসুর আহমদের রাষ্ট্রকল্প ও উৎসব-ভাবনা

কাজল রশীদ শাহীন
কাজল রশীদ শাহীন

মুসলমানদের প্রধান দুটি ধর্মীয় উৎসবের একটি ঈদুল ফিতর। আবুল মনসুর আহমদ মনে করতেন, এই ঈদে যেভাবে আনন্দ করার কথা, ইসলাম ধর্মে যেভাবে হর্ষোৎফুল্ল চিত্তে আনন্দের কথা বলা হয়েছে, বাংলায় তা যথাযথভাবে করা হয় না। স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রকল্পেও এ নিয়ে নেই তেমন কোনো ভাবনা বা কার্যকর উদ্যোগ।

ইতিহাসের এক বিভ্রমে যেন আমরা আবদ্ধ হয়ে আছি। ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিত ও আজকের বাস্তবতায় ঈদ-উৎসবের পুনঃপাঠ কেমন হওয়া দরকার, তা নিয়ে জ্ঞানকাণ্ডে খুব একটা হেলদোল নেই। অথচ রাষ্ট্রীয় সংহতির ওপর যখন বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক দেশ গড়ার প্রত্যয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে, তখন আবুল মনসুর আহমদের ঈদ-উৎসব ভাবনাকে অবলোকন করা জরুরি। শুধু অবলোকন নয়, তার ভাবনা ও প্রস্তাবনাকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রকল্পে কীভাবে হাজির করা যায়, তা নিয়েও ভাবা প্রয়োজন।

ব্রিটিশ ভারতের ঔপনিবেশিক গ্যাঁড়াকল থেকে মুক্ত হওয়ার বহু বছর পরও আমরা সংস্কৃতির চৌহদ্দিতে পুরোনো রেওয়াজ, অজানা শঙ্কা এবং ইতিহাসের তাপ-চাপই ক্রমাগত উৎপাদন করে চলেছি। স্বাধীন দেশে এমনটি হওয়ার কথা নয়। আমাদের প্রত্যাশা, মুসলমানের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর বর্তমান সময়ের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ, আনন্দমুখর ও সর্বজনীন আবহে পালিত হোক—যেমনটি আবুল মনসুর আহমদ প্রত্যাশা করেছিলেন।

তিনি লিখেছেন, ‘ঈদ অর্থ আনন্দ-উৎসব। ঈদুল-ফিতর অর্থ উপাস ভাংগার আনন্দ-উৎসব। এ উৎসবের আনন্দ যা-তা মামুলি আনন্দ নয়। এটা উল্লাস।... কিন্তু আমরা তা ভুলিয়া গিয়াছি। প্রতি বছর আমরা সে ভুলের পুনরাবৃত্তি করিতেছি; সে ভুল দোহরাইতেছি। প্রতি বছরে আমরা এই উপলক্ষে অনেক কিছু বলিতেছি বক্তৃতায়, লিখিতেছি বিশেষ সংখ্যার সাময়িকীতে। সবই ভক্তি গদগদ কণ্ঠের কথা। ভক্তিরসাপ্লুত লেখা।... রোযা কিন্তু ঈদ নয়। ঈদও রোযা নয়। ঈদুল-ফিতর রমজানের রোযা নয়। কিন্তু ঈদ-সংখ্যা কাগজে আমরা ঈদের মহিমা ও কীর্তনে যে বিদ্যাবুদ্ধি খবর ও পাণ্ডিত্য জাহির করি, তার সব কথা সত্য হইলেও ওগুলি ঈদের কথা নয়, রমযানের রোযারই কথা। রোযা ও ঈদ ত্যাগ ও ভোগের মতোই দুইটা আন্টিথেসিস, বিপরীত গুণাত্মক কাজ। রমজানের বেলা একটা শর্ত আর একটা পুরস্কার; একটা ক্রিয়া আর একটা ফল। শ্রমের পুরস্কার যেমন বিশ্রাম, অধ্যয়নের পুরস্কার যেমন প্রমোশন, ত্যাগের পুরস্কার যেমন ভোগ, রমজানে রোজার পুরস্কার তেমন ঈদুল ফিতর।’

১.

আবুল মনসুর আহমদের বিবিধ পরিচয়ের সঙ্গে আমরা অবগত—সাহিত্যিক, সাংবাদিক-সম্পাদক, রাজনীতিবিদ ও আইনজীবী। কিন্তু এর বাইরেও যে ওনার আরও একটি পরিচয় রয়েছে সেটার সুলুকসন্ধান সম্ভবত এখনো করা হয়ে ওঠেনি। কী সেই পরিচয়, যার সম্পর্কে কেউই ওয়াকিবহাল নই?

তিনি ছিলেন একজন অ্যাক্টিভিস্ট। অ্যাক্টিভিস্টের বাংলা হলো, সক্রিয়তাবাদী। যিনি সামাজিক-রাজনৈতিক অর্থনৈতিক বিষয়ে জনমত সংগঠিত করেন এবং প্রভাবিত করার চেষ্টা জারি রাখেন। যার ভেতর দিয়ে সমাজ-রাষ্ট্র ও ব্যক্তির বৃহত্তর কল্যাণ সাধনের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত হয়। আবুল মনসুর এই কাজটি করে গেছেন নিষ্ঠার সঙ্গে, প্রতিকূলতাকে ভ্রুকুটি দেখিয়ে। এসবে ঝুঁকি থাকে। বিতর্কিত হওয়ার বিড়ম্বনা হাতছানি দেয়। অপ্রিয় হওয়ার শঙ্কা ঘোরে পায়ে পায়ে। কিন্তু একজন প্রকৃত অ্যাক্টিভিস্ট উজানেই হাঁটে। আবুল মনসুর আহমদ উজানেই বেয়েছেন কল্যাণ আকাঙ্ক্ষার তরী। নির্ভয়ে, নিঃসংশয়ে দেখিয়েছেন, কী হতে পারে একজন সমাজ-রাজনীতির প্রকৃত ভাষ্যকারের বয়ান, মনোবাঞ্ছা। এমন ভাষ্যকারের অপর নাম অ্যাক্টিভিস্ট। এই লেখা আবুল মনসুরের অ্যাক্টিভিজম বিষয়ক চিন্তা অবলোকনের নিমিত্তে।

যেমনটা রয়েছে উনার আলাপে, প্রস্তাবনায়; লিখেছেন, ‘প্রগতিবাদী ওলামাসহ সুধী-সমাজ সহজেই এটা করিতে পারেন। হযরত ইব্রাহিমের কোরবানির স্বপ্ন, হযরত মোহাম্মদের নবুওত হিজরত মেয়ারাজ জংগে বদর মক্কা বিজয় বিদায়ী হজ ইত্যাদি স্মরণীয় ঐতিহাসিক ঘটনাকে আর্টের অলংকারে ভূষিত করিয়া দুই ঈদের উপযোগী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানরূপে প্রবর্তন করা যাইতে পারে। ঈদ-উৎসব দুইটিকে একদিন সমাপ্ত না করিয়া আমাদের মোর্হরম, হিন্দুদের দুর্গোৎসব, খ্রিস্টানদের বড় দিন ও বৌদ্ধদের মাঘী পূর্ণিমার মতো একাধিক দিনে ব্যাপ্ত করা যায়। শুধু এইভাবেই আমরা ধর্মীয় ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানকে নির্মল আনন্দের অফুরন্ত পার্বণে পরিণত করিতে পারি এবং সে আনন্দ-রসের আবেহায়াতে গণমনকে সঞ্জীবিত এবং সমাজকে অপরাধমুক্ত রাখিতে পারি। ঈদ-রিইউনিয়ন, ঈদ-মেলা, ঈদ-জশন, ঈদ-যিয়াফত, ঈদ-মিছিল এই ধরনের যে কোনও নামে আমরা দুইটি ঈদকে প্রাণ-প্রাচুর্যেও সাংস্কৃতিক আনন্দোৎসবে রূপায়িত করিয়া পাক-বাংলার আসমান জমিন উল্লাস-মুখর ও জনগণের জীবন পুণ্যকোজ্জ্বল করিতে পারি। আমাদের তরুণ চিন্তাবিদরা, লেখক-সাহিত্যিকরা এদিকে মনোযোগ দেবেন কি?’

আবুল মনসুরের প্রস্তাবনা কার্যকর করা নিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রকল্পের কোনো পর্যায়ে কিংবা সমাজ-রাষ্ট্রের বিদ্বৎসমাজ ও বুদ্ধিজীবী মহলে কোনো প্রকার আলোচনা জারি রয়েছে বলে দৃশ্যমান উদাহরণ নেই। হ্যাঁ, উনাকে পাঠ করা হয়। কিন্তু ওই পর্যন্তই। পাঠের পরে আমাদের যা করণীয়, তার কিছুই করা হয় না।

বিভিন্ন প্রবন্ধে তিনি যে সিদ্ধান্তগুলো হাজির রেখেছেন এই রাষ্ট্র-সমাজ ও ব্যক্তি মানসের কল্যাণ সাধনে, প্রয়োজনীয়তার নিরিখে তার বাস্তবায়ন নিয়ে নেই কোনো আলাপ বা তর্ক-বিতর্ক। তাহলে আমরা কি ওইগুলো পাঠ করি কেবলই সার্টিফিকেটের প্রত্যাশায়, চাকরি পুলসিরাত পারের বাসনায়? ওখান থেকে কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন বা কার্যকর করার জন্য নয়? যদি তাই-ই হয়, তা হলে এসব পাঠ তো ভীষণ রকমের মেকি ও অর্থহীন এক বাস্তবতা! সেখান থেকে বেরিয়ে আসা কেবল জরুরি নয়, আবশ্যক।

শুধু আবুল মনসুর নয়, আরও যারা এরকম সিদ্ধান্ত হাজির করেছেন, তা কার্যকর করার পন্থা খোঁজা অবিকল্প। সেসবে যোজন-বিয়োজন, সংশোধন, পরিমার্জনসহ হতে পারে আরও অনেক কিছু। কিন্তু একেবারে উপেক্ষা করা সুবিবেচনাপ্রসূত কোনো সিদ্ধান্ত নয়। অথচ তেমনটাই করা হচ্ছে। সেটা কীভাবে? আবুল মনসুরের লেখা ‘বাংলাদেশের কালচার’ বইয়ের ‘আনন্দের জোয়ার ঈদুল-ফিতর’ প্রবন্ধের আলোকে একটু বিশদে দেখে নেওয়া যাক।

২.

প্রবন্ধের বিষয়বস্তু ঈদুল ফিতর। অ্যাক্টিভিস্ট আবুল মনসুর এই প্রবন্ধটি লিখছেন ১৯৬৩ সালে। ‘বাংলাদেশের কালচার’ বই প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৬৬ সালে। তখন নাম ছিল ‘পাক বাংলার কালচার’। ১৯৭১ সালে সেদিনের পূর্ব পাকিস্তান, লেখকের ভাষায় ‘পাক বাংলা’ স্বাধীন হয়ে গঠিত হয় বাংলাদেশ রাষ্ট্র। স্বাধীনতার পর সঙ্গত কারণেই বইটির নাম পরিবর্তন করে ‘বাংলাদেশের কালচার’ রাখা হয়। প্রবন্ধের সংখ্যা এখানে দশ—বাংলাদেশের কালচার; সাহিত্যের প্রাণ, রূপ ও আংগিক; ভাষা আন্দোলনের মর্মকথা; পাক-বাংলার রেনেসাঁ; শিক্ষার মিডিয়াম; আনন্দের জোয়ার ঈদুল-ফিতর; আমার স্বপ্নের শহীদ মিনার; আমাদের ভাষা; বাংলাদেশের কৃষ্টিক পটভূমি এবং বাংলাদেশের জাতীয় আত্মা।

‘আনন্দের জোয়ার ঈদুল-ফিতর’ প্রবন্ধে প্রকাশিত হয়েছে অ্যাক্টিভিস্ট ও প্রাবন্ধিক আবুল মনসুরের স্বাতন্ত্র্যবাদী চিন্তার এবং সংস্কৃতি ভাবনার ওজস্বীরূপ। লেখক যে কথা বলেছেন তার সংক্ষিপ্ত সার হলো, দেশে ঈদুল ফিতরকে পরিগণিত করা হয়েছে প্রার্থনার দিন হিসেবে। দিনটির ধর্মীয় তাৎপর্য যা, তা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না। যা করা হচ্ছে তা জাতির জন্য কোনো মঙ্গল বয়ে তো আনছেই না, উপরন্তু জাতিকে দুর্বল করছে।

তিনি মনে করেন, রোজা মানে সংযম, যে পরীক্ষায় দীর্ঘ একমাস ধরে উত্তীর্ণ হতে হয়েছে মুসলিমদের। রোজার পর ঈদ আসার অর্থ হলো আনন্দ করা, কারণ সংযম পালন করা হয়েছে একমাস ধরে। এ কারণে ঈদুল ফিতরের দিন আনন্দ করাটাই যুক্তিযুক্ত ও সঙ্গত। এর ব্যতিক্রম হলে সেটা যথার্থ নয়।

তিনি মনে করেন, ‘আনন্দোৎসবকে এবাদতের অনুষ্ঠানে পরিণত করায় আমাদের জাতির ঘোরতর লোকসান হইয়াছে। ব্যক্তিগত জীবনে যেমন, জাতীয় জীবনেও তেমন, অতিরিক্ত ধার্মিক হওয়া অধর্ম। সব ব্যাপারের মতোই ধর্ম কার্যেও আতিশয্য খারাপ। খেলার সময় খেলা পড়ার সময় পড়ার মতো এবাদতের সময় এবাদত, আমোদের সময় আমোদ, এটা খাঁটি সত্য কথা এবং জীবনের অলঙ্ঘনীয় কানুন। এ কানুন অমান্য করিলে শাস্তি পাইতে হইবে। মানুষের সকল ইন্দ্রিয়-বৃত্তিই আল্লাহর দেওয়া। ও-গুলির অসদ্ব্যবহার করা যেমন পাপ, ব্যবহার না করাও তেমনি পাপ। সে পাপ শুধু পরকালের নয়, ইহকালের জন্যও।’

আবুল মনসুর এতটুকু বলেই ক্ষান্ত দেননি। এভাবে ঈদুল ফিতর পালন করার রেওয়াজটা কখন, কীভাবে শুরু হলো, কেন করা হয়েছে; অনুসন্ধান করেছেন তার কার্যকারণও। তিনি মনে করেন, এর পেছনে রয়েছে ঔপনিবেশিক সময়ের রূঢ় বাস্তবতা। ফলে, মুসলমানের পক্ষে চাইলেও আনন্দ করা ছিল দুরূহ ও অসম্ভব। আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা প্রফুল্ল চিত্তে মজমাস্তি করার অনুকূলে ছিল না। সেই সুযোগও দেওয়া হতো না শাসক-প্রশাসকদের পক্ষে।

অ্যাক্টিভিস্ট আবুল মনসুরের এই কথার যৌক্তিকতা রয়েছে। এই অঞ্চলে ২৫ বছর ধরে ছিল মুসলিম শাসন। ইংরেজদের আগমনের মধ্যে দিয়ে অবসিত হয় সেই অধ্যায়, বিশেষ করে ১৭৫৭ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্ণধার লর্ড ক্লাইভের কাছে নবাব সিরাজদ্দৌলার পরাজয়ের মধ্যে দিয়ে। তারও আগে পর্তুগিজ, ডাচরা এ দেশে এলেও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মতো ওরা ক্ষমতার কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কুক্ষিগত করিনি। হয়তো সেই অভিপ্রায়ও ছিল না। কিন্তু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেটা ছিল। সিরাজদ্দৌলার পরাজয়ের মধ্যে দিয়ে প্রথমে বাংলা অঞ্চলে, পরে ভারতবর্ষে মুসলিম শাসনের অবসান হয়। মুসলিমদের ভাগ্যে নেমে আসে ঘোর অমানিশা।

আবুল মনসুর মনে করেন, এই অমানিশার কারণেই মুসলমানদের মনে আনন্দ ছিল না। ক্ষমতার পরিচালক ভূমিকা থেকে ছিটকে পড়ায় শাসক ও প্রশাসকদের সঙ্গে যেমন দূরত্ব তৈরি হয়, তেমনি অদৃশ্য দেয়াল রচিত হয় উভয়ের মধ্যে। একে অপরকে প্রতিদ্বন্দ্বী বা শক্র জ্ঞান করার একটা বাস্তবতাও হাজির হয়। হয়তো এরকম শত্রু জ্ঞান করার যুৎসই কোনো কারণ ছিল না। কিন্তু সেটা সমাজ-রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে যে ক্রিয়াশীল ছিল এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই কোনো। এই অবস্থা চলতে থাকে পুরো ঔপনিবেশিক শাসনজুড়ে। শাসক-প্রশাসকের সঙ্গে মুসলিমদের দূরত্বের সুযোগ কাজে লাগায় হিন্দুরা। মুসলমানরা যখন ক্ষমতা হারিয়ে পর্যুদস্ত বা অভিমানী, ওরা তখন বাস্তববাদী হয়ে ওঠে। ক্ষমতার পরিচালক শক্তির সঙ্গে সৌহাদ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলে। বাংলায়-ভারতবর্ষে তখন দুটো বৃহৎ সম্প্রদায়ের বসবাস, যার একটা রাষ্ট্রের প্রযত্নে সবকিছুতেই এগিয়ে যেতে থাকে, বিপরীতে অন্যটি পিছিয়ে যায়। আবুল মনসুর মনে করেন, ওই ঐতিহাসিক বাস্তবতায় মুসলমানরা ঈদের দিনও পরিপূর্ণ আনন্দ করা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়। ঈদ উৎসবকে কেবল প্রার্থনার মধ্যে সীমিত করে।

৩.

আবুল মনসুর আহমদের ‘বাংলাদেশের কালচার’ বই আমাদেরকে শেকড়সন্ধানকে নিয়ে যায় অনিবার্য এক আকাঙ্ক্ষার দিকে, বাংলাদেশের অতীত ও বর্তমানকে খোলতাই করে গভীরতর এক তাৎপর্যে। অতীতে কী ছিল, বর্তমানে কী আছে, আর বাস্তবিক অর্থে কী হওয়া প্রয়োজন—পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় তা নিয়ে ভাবনার খোরাক যোগায়। সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নের তাগিদ অনুভব করায়। পাশাপাশি এও দেখায়, আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে অপসংস্কৃতি ক্রিয়া করে যাচ্ছে কীভাবে।

শেকড় কতদূর পর্যন্ত জারি আছে, হাজরা দেয় তার সুলুকসন্ধান। সংস্কৃতির কোন অংশ ‘আত্তীকরণে’র আর কোন অংশ ‘সাঙ্গীকরণে’র, উন্মোচন করে তার গভীরতর স্বরূপ ও কার্যকারণ। এই লেখায় ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিত আলোচনার পাশাপাশি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কিছু অভিজ্ঞতাও তুলে ধরা হলো। যাতে বুঝতে সহায়ক হয়, বিষয়ের গভীরতা ও প্রস্তাবনার ইতিবাচক তাৎপর্য। যার আলোকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রকল্পের কুম্ভকর্ণের নিদ্রা টুটে এবং তাগিদ বোধ করে অ্যাক্টিভিস্ট আবুল মনসুরের প্রস্তাবনাকে বিবেচনায় নেওয়ার।

‘আনন্দের জোয়ার ঈদুল ফিতর’ পাঠান্তে জেগে ওঠে আমাদের গ্রামের এ সংক্রান্ত অগণন স্মৃতিকথা। আবুল মনসুর জন্মেছিলেন ময়মনসিংহের ত্রিশালের ধানীখোলা গ্রামে। তারপর পড়াশোনা নিজ গ্রাম-শহর ময়মনসিংহ, ঢাকা ও কলকাতায়। সাংবাদিকতা-সম্পাদকতা, রাজনীতি ও আইন পেশা কেটেছে কলকাতা, ময়মনসিংহ, ঢাকা ও পশ্চিম পাকিস্তানে। তারপর থিতু হয়েছেন রাজধানী ঢাকায়। এই হচ্ছে ওনার ইহজাগতিকতার দিনপঞ্জি।

৪.

লজ্জার হলেও এ কথা সত্যি, আমরা ক্রমশ এমন একটা সময় ও বাস্তবতার দিকে যাচ্ছি, যেখানে প্রকৃত সত্য আড়ালে পড়ে যাচ্ছে। নানা কিছুর নামে এমন সব বিষয় চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা গ্রহণীয় নয়। কিন্তু এসব নিয়ে কথা বলাও দুরূহ। আবুল মনসুর আমাদের সংস্কৃতির যে তাৎপর্য প্রয়োজনীয়তা ও গভীরতা উপলব্ধি করেছিলেন, তা কি আমরা সেভাবে করছি। তিনি যে ভাষায় লিখেছিলেন, আমরা কি সেভাবে লিখছি? আমরা কেন পারছি না ওরকম করে প্রকৃত সত্যকে হাজির করতে? তা যদি সংখ্যাগরিষ্ঠের বিপক্ষেও যায়, তা বলা কি বুদ্ধিজীবীর দায় নয়, কর্তব্য নয়? রাষ্ট্র ও সমাজের মূল দায়িত্ব তাহলে কী? গণমাধ্যমের দায় ও দরদের ভূমিকা কোথায়?

সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিয়ে হলেও আবুল মনসুরের পথে হাঁটা প্রয়োজন। ওনার মতো কথা বলতে হবে। সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করার লড়াইয়ে উজানে তরী বাইতে হবে। ‘বাংলাদেশের কালচার’ আমাদেরকে বাংলাদেশি হতে শেখায়। বাংলাদেশের জন্য কী করণীয়, তার মন্ত্র হাজির করে।

আবুল মনসুর লিখেছেন, ‘অতএব ঈদ আনন্দকে আমাদের সাংস্কৃতিক আনন্দোৎসব ও পাকিস্তানের (পড়ুন বাংলাদেশের) জাতীয় উৎসবে পরিণত করা নিতান্ত প্রয়োজন। মুসলমানদের সামাজিক ও আত্মিক কল্যাণের জন্যই এটা দরকার। কাজটা তেমন কঠিন নয়। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সুধীজনের উদ্যমে আর্ট-সাহিত্যের মাধ্যমে ধর্মীয় ঐতিহ্যের সাংস্কৃতিক রূপায়ন সম্ভব।’

আবুল মনসুরের ঈদ উৎসব ভাবনায় আবুল হুসেনকে একটু স্মরণ করা যাক। ‘মুসলিম কালচার ও উহার দার্শনিক ভিত্তি’ প্রবন্ধে আবুল হুসেনের অভিমত হলো, ‘আজ আমরা ধর্মের দোহাই দিয়ে সকল প্রকার চিন্তার স্ফূর্তিকে রুদ্ধ করিতে চাচ্ছি।... মুসলমান জগৎ বুদ্ধির ঘরে তালা লাগিয়ে কেবল শাস্ত্রের দোহাই দিয়ে মুসলমানের চলার পথে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে।’

একই প্রবন্ধে আবুল হুসেন আরও বলেছেন, ‘কাজের পিছনে চিন্তা নাই। ... চিন্তাই ফিলোসফি। রিলিজিয়ন (ধর্ম) বলছে, “চোখ বুঁজে মেনে চল।” ফিলোসফি (দর্শন) বলছে, “চোখ খুলে চেয়ে দেখ।” একটার বাহন হল ভক্তি, অন্যটার বাহন হল জ্ঞান।’

ঈদ উৎসব ভাবনায় আবুল মনসুরের যে প্রস্তাবনা তাতে আমাদের কোন পথে এগুতে হবে সে সম্পর্কে মোদ্দা কথা আবুল হুসেনের উপর্যুক্ত উদ্ধৃতিতে। এরপরও কি আমরা চোখ বুঁজে হাঁটব? নাকি চোখ খুলে চেয়ে দেখে সিদ্ধান্ত নেবো?

‘বাঙালি মুসলমানের শিক্ষা-সমস্যা’ প্রবন্ধে আবুল হুসেনের অভিমত হলো, ‘আজ আমাদের সকল দুর্গতির কারণ হচ্ছে আমাদের আড়ষ্ট বুদ্ধি, অন্ধবিশ্বাস, বর্তমান জীবন সম্বন্ধে ঔদাসীন্য এবং বর্তমান জগতের জ্ঞানের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কহীনতা।’

আবুল মনসুরের ঈদ উৎসব ভাবনায় আমাদের তিনটি প্রস্তাবনা জানিয়ে শেষ করছি এই লেখা।

১. দেশের রাষ্ট্রকল্পে ঈদ উৎসবকে বাংলাদেশের জাতীয় আনন্দ উৎসব ঘোষণা করা হোক। ঈদের আনন্দে সবাই যেন শরিক হতে পারে, রাষ্ট্র ও সমাজের তরফে থাকুক তার সমুদয় ব্যবস্থা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি।

২. দেশের জাতীয় ঈদগাহসহ সব ঈদগাহে, স্কুল-কলেজের মাঠে, ক্লাব ও পাঠাগার সংলগ্ন আঙ্গিনায়, হাট-বাজারের সর্বত্র আনন্দোৎসব করার জন্য এ দেশের লোকজীবনে যত সাংস্কৃতিক আয়োজন রয়েছে রাষ্ট্রের তরফে দুইদিনব্যাপী তার আয়োজন নিশ্চিত করা হোক। সব শ্রেণী-পেশা, ধর্ম-বর্ণের মানুষ যাতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে দুদিনের এই উৎসবে অংশগ্রহণ করতে পারে, তার পরিসর ও সুযোগের নিশ্চয়তায়, দৃশ্যমান ভূমিকা পালনে আজ্ঞাবহ থাকুক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

৩. বাংলাদেশ রাষ্ট্রকল্প রাজস্ব আদায় ও শাসন করার যন্ত্র না হয়ে যে আনন্দ-উৎসবের সারথি হতে পারে, তা প্রমাণের দায়িত্ব জারি হোক দৃশ্যমানভাবে। ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ায় যেভাবে ঈদুল ফিতরের উৎসব হতো স্বাধীন বাংলাদেশেও যদি তেমন হয়, তা হলে পরাধীনতা-ঔপনিবেশিকতার সঙ্গে স্বাধীন দেশের নাগরিকদের যাপিত জীবনে ফারাক রইলো কোথায়?

কাজল রশীদ শাহীন: চিন্তক, সাংবাদিক ও আবুল মনসুর আহমদ গবেষক