নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়েই উপেক্ষিত নজরুল স্মৃতি ও গবেষণা

ইমরান মাহফুজ
ইমরান মাহফুজ

ত্রিশালের পথে এগোলে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে আজও দাঁড়িয়ে আছে এক ইতিহাস। তবে সেটা বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানার বাইরে। ২০০৫ সালে স্থাপিত বিশ্ববিদ্যালয়টির সেই ভিত্তিপ্রস্তর এখন মূল ক্যাম্পাসের বাইরে পড়ে আছে। এর পাশেই নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত বলে পরিচিত ঐতিহাসিক ‘নজরুল বটতলা’। একটি বিশ্ববিদ্যালয় যার নামে, তার স্মৃতির গুরুত্বপূর্ণ এই দুই চিহ্নই বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানার বাইরে।

বিস্ময়কর এই বাস্তবতার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরেও নজরুল গবেষণার চিত্র খুব আশাব্যঞ্জক নয়। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে দেশের প্রথম ও একমাত্র নজরুল গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার ১২ বছর পরও সেখানে কোনো স্থায়ী পরিচালক নেই। ২৩ জনের অনুমোদিত জনবলের বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটি চলছে মাত্র তিনজনকে নিয়ে।

এর মধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায় চলছে ‘নজরুলবর্ষ’। জাতীয় পর্যায়ে নেওয়া হচ্ছে নানা কর্মসূচি। এমন সময়ে নজরুলের নামে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ে তার স্মৃতি ও গবেষণার দীর্ঘদিনের উপেক্ষা নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।

ময়মনসিংহের ত্রিশাল নজরুলের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিবিজড়িত স্থান। সেই স্মৃতিকে ধারণ করেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিভাগে ‘নজরুল স্টাডিজ’ বাধ্যতামূলক কোর্স হিসেবে চালু রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আট বছর পর ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ইনস্টিটিউট অব নজরুল স্টাডিজ। কবির অমর স্মৃতি সংরক্ষণ, তার জীবন, সাহিত্য, সংগীত ও সামগ্রিক অবদান নিয়ে পাঠদান ও গবেষণা পরিচালনা, রচনাবলি সংগ্রহ ও সংরক্ষণ, প্রকাশনা এবং দেশে-বিদেশে তার ভাবমূর্তি তুলে ধরার লক্ষ্যেই প্রতিষ্ঠিত হয় প্রতিষ্ঠানটি। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এটিই বাংলাদেশের প্রথম ও একমাত্র নজরুল গবেষণা ইনস্টিটিউট।

সেটিও স্থায়ী পরিচালক ছাড়া এবং জনবল সংকটে চলছে। পদাধিকারবলে উপাচার্য দায়িত্ব পালন করলেও বাস্তবে তার পক্ষে গবেষণা ইনস্টিটিউটকে পূর্ণ সময় দেওয়া সম্ভব হয় না। নজরুলকে নিয়ে বৈচিত্র্যময় গবেষণাও সেভাবে হচ্ছে না।

প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন একটি ভবনের একাংশে ইনস্টিটিউট অব নজরুল স্টাডিজ স্থানান্তরের কথা রয়েছে। তবে এত বড় অবকাঠামো প্রকল্পের মধ্যেও দীর্ঘদিন ধরে পরিচালকের পদটি শূন্য রয়েছে।

যদিও গবেষণা অনুদান, আন্তর্জাতিক জার্নাল ও গ্রন্থ প্রকাশ এবং আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি কিছু উল্লেখযোগ্য কাজ করেছে। বিশেষ করে ভারতের কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে প্রকাশিত ‘নজরুল জার্নাল’ এবং আয়োজিত আন্তর্জাতিক সম্মেলন প্রশংসিত হয়েছে। যদিও পরিকল্পনার তুলনায় তা সামান্য বলা যায়।

যে ঐতিহাসিক বটগাছকে কেন্দ্র করে নজরুল-স্মৃতি সংরক্ষণের আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, সেই বটগাছ আজও বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে অবহেলা ও অযত্নে পড়ে আছে। ত্রিশালের গবেষক আমিনুল হক এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এখন এই ফলকে ফুল দেওয়ার লোকের অভাব নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্বোধনী ফলকে বেগম খালেদা জিয়ার নাম থাকায় “নজরুল বটতলা” নিয়ে গত ১৭ বছরে কেউ কথা বলেনি। না নজরুলপ্রেমী, না জাতীয়তাবাদী—কেউ। এমন একটি কাজ হয়েছে, কিন্তু কেউ টু শব্দ বা প্রতিবাদ করেনি। আমাদের লজ্জা হওয়া উচিত, এমন একটি কাজ কীভাবে দিনের পর দিন উপেক্ষিত থাকল।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক বলেন, ‘শিক্ষকতা ও গবেষণা ছাড়া আমি কোনো দলাদলিতে জড়াই না। ফলে এমন অনেক ন্যায্য বিষয়েও চুপ থাকতে হয়। কথা বললে নানাভাবে কোণঠাসা বা নাজেহাল করা হয়। কিন্তু এখানে নজরুল নিয়ে একধরনের নৈরাজ্য চলছে। প্রতি বছর যেভাবে নজরুলের জন্মবার্ষিকীর আয়োজন হয়, নজরুলবর্ষে সেটি আরও ভালো হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকীর আয়োজন হয়েছে একেবারেই সাদামাটাভাবে। অনেক শিক্ষার্থীর মাঝেও এ নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘অন্যদিকে “নজরুল সিটি”র নামে নতুন করে বাণিজ্য উৎসবের পরিকল্পনা চলছে। এটি ভাবতে লজ্জা লাগে যে আমি এখানে শিক্ষকতা করছি।’

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমি নতুন এসেছি। এর মধ্যেই ভিত্তিপ্রস্তরের পাশের জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে ভাবছি আমরা। জমি অধিগ্রহণ করা সম্ভব হলে ভিত্তিপ্রস্তরটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানার ভেতরে নেওয়া হবে। আমি ব্যক্তিগতভাবেও দেখে এসেছি। আমরা দ্রুত এটি বাস্তবায়ন করতে পারব বলে আশা করছি। স্থানীয় সংসদ সদস্যের সঙ্গে এ বিষয়ে পরামর্শ করা হয়েছে।’

ইনস্টিটিউট অব নজরুল স্টাডিজের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের একটি ভবন হচ্ছে। এটি এ বছরের শেষে বুঝে পাওয়ার কথা। সেখানে ইনস্টিটিউট অব নজরুল স্টাডিজ চলে যাবে এবং দেশসেরা কোনো নজরুল গবেষক বা বিশেষজ্ঞকে ইনস্টিটিউটের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও ওয়ার্কস দপ্তরের পরিচালক মো. হাফিজুর রহমান বলেন, প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে ভবনটির নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে প্রায় দুই বছর আগে। আশা করা হচ্ছে, চলতি বছরের ডিসেম্বরে ভবনটি বুঝিয়ে দেওয়া হবে। সেখানে ইনস্টিটিউট অব নজরুল স্টাডিজ ছাড়াও আরও চারটি ইনস্টিটিউট স্থানান্তর করা হবে।

নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে নজরুল-স্মৃতির বটতলা উপেক্ষিত থাকা এবং ১২ বছরেও ইনস্টিটিউট অব নজরুল স্টাডিজে পরিচালক নিয়োগ না হওয়া প্রসঙ্গে ত্রিশালের স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য মো. মাহবুবুর রহমান লিটন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘গত ১৭ বছরে শুধু নজরুল বটতলা নয়, পুরো নজরুলই উপেক্ষিত ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হয়েছে। পরিপূর্ণ সিন্ডিকেট গঠিত হলে নজরুল বটতলা মূল ক্যাম্পাসে চলে আসবে এবং নজরুল স্টাডিজের পরিচালকও নিয়োগ দেওয়া হবে। এমন আরও কিছু কাজের পরিকল্পনা আমাদের আছে।’

নজরুল গবেষক ও কবি মজিদ মাহমুদ বলেন, ‘নজরুল শুধু নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়েই উপেক্ষিত নন; নজরুল ইনস্টিটিউটসহ সরকারি-বেসরকারি প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়েই তিনি খণ্ডিতভাবে উপস্থিত। কোথাও তিনি কেবল কবি, কোথাও বিদ্রোহী, কোথাও সংগীতস্রষ্টা, কোথাও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতীক—কিন্তু তার সামগ্রিক সাহিত্য, দর্শন, চিন্তা ও জীবনদর্শনকে একসঙ্গে ধারণ করার উদ্যোগ খুবই সীমিত।’

তিনি বলেন, ‘নজরুলের নামে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়েই যদি তার স্মৃতি, চিন্তা ও সামগ্রিক সৃষ্টিকর্ম উপেক্ষিত হয়, তাহলে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের সঙ্গে নজরুল থাকার যৌক্তিকতা কোথায়? এটি শুধু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সাংস্কৃতিক ব্যর্থতা নয়, রাষ্ট্রেরও জবাবদিহির বিষয়। নজরুলের নামে প্রতিষ্ঠান তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; সেই প্রতিষ্ঠানে তার মুক্তচিন্তা, সাম্য, মানবতা, বিদ্রোহ ও সৃষ্টিশীলতার চর্চা নিশ্চিত করতে হবে।’