লিখলেই কেন বই ছাপানো উচিত নয়
বাংলা প্রকাশনা জগতে নতুন লেখকদের জন্য প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনামূলক বই খুব বেশি নেই। লেখালেখির কৌশল, পাণ্ডুলিপি প্রস্তুতি, প্রকাশকের সঙ্গে সম্পর্ক কিংবা বই প্রকাশের বাস্তব অভিজ্ঞতা—এসব বিষয়ে অধিকাংশ নবীন লেখককে এগোতে হয় অনুমাননির্ভর হয়ে।
এই বাস্তবতায় দীর্ঘদিন বই নিয়ে কাজ করা বদিউদ্দিন নাজির রচিত ‘বই প্রকাশে লেখকের প্রস্তুতি’ নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী ও কার্যকর সংযোজন।
বর্তমান সময়ে বই প্রকাশের ক্ষেত্রটি আগের তুলনায় অনেক বেশি প্রতিযোগিতাপূর্ণ। এখন শুধু ভালো লিখলেই হয় না; কীভাবে লিখতে হবে, কীভাবে উপস্থাপন করতে হবে, পাঠকের মনোযোগ কীভাবে আকর্ষণ করতে হবে—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বদিউদ্দিন নাজির তার দীর্ঘ প্রকাশনা ও অভিজ্ঞতার আলোকে এই জটিল বিষয়গুলোকে সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করেছেন।
বইটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর অধ্যায় বিন্যাস। মোট ১২টি অধ্যায়ে লেখক বই প্রকাশের প্রায় প্রতিটি প্রয়োজনীয় ধাপ নিয়ে আলোচনা করেছেন। বইটি কেবল লেখালেখিতে অনুপ্রেরণা দেয় না; বরং একজন নতুন লেখক কীভাবে নিজের পাণ্ডুলিপিকে প্রকাশযোগ্য করে তুলতে পারেন, সেই বাস্তব ও প্রযুক্তিগত দিকগুলোও স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
প্রথম অধ্যায় ‘পাণ্ডুলিপি নিয়ে প্রকাশকদের পছন্দ-অপছন্দ’-এ তিনি অত্যন্ত বাস্তবধর্মী কিছু কথা বলেছেন। অনেক সময় নতুন লেখক মনে করেন, ভালো লেখা হলেই প্রকাশক বই ছাপবেন। কিন্তু বাস্তবে প্রকাশককে ভাবতে হয় বাজার, পাঠক, বিক্রয় ও উপস্থাপনার বিষয়ও।
লেখক এই অধ্যায়ে দেখিয়েছেন, প্রকাশকরা কোন ধরনের পাণ্ডুলিপি পছন্দ করেন এবং কী ধরনের ভুলের কারণে অনেক ভালো লেখাও প্রত্যাখ্যাত হয়।
‘লেখার অভ্যাস গড়ে তোলা’ অধ্যায়টি বিশেষভাবে অনুপ্রেরণাদায়ক। লেখক এখানে লেখালেখিকে শুধুমাত্র প্রতিভার বিষয় হিসেবে দেখেননি; বরং চর্চা, শৃঙ্খলা ও ধৈর্যের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
একজন লেখককে প্রতিদিন পড়তে হবে, লিখতে হবে এবং নিজের লেখাকে নিয়মিত পরিমার্জন করতে হবে। এই বার্তাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে। নতুনদের জন্য এটি খুব প্রয়োজনীয় শিক্ষা।
‘বই লেখার জন্য গবেষণা’ অধ্যায়ে লেখক দেখিয়েছেন, গবেষণা ছাড়া শক্তিশালী লেখা সম্ভব নয়। বিশেষ করে নন-ফিকশন লেখার ক্ষেত্রে তথ্যসূত্র, রেফারেন্স ও নির্ভরযোগ্য উপাত্ত কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা তিনি উদাহরণসহ ব্যাখ্যা করেছেন।
একইসঙ্গে ফিকশন লেখকদের জন্যও বাস্তব অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন। ফলে বইটি শুধু গবেষকদের জন্য নয়, সৃজনশীল লেখকদের জন্যও সমান কার্যকর।
বইটির আকর্ষণীয় অধ্যায় হলো ‘পাঠক আকর্ষণের অব্যর্থ তিনটি উপায়’। এখানে লেখক ভাষার স্বচ্ছতা, বিষয় নির্বাচনের গুরুত্ব ও পাঠকের মনস্তত্ত্ব বোঝার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেছেন।
একজন লেখক যখন পাঠকের চাহিদা ও আগ্রহ বুঝতে পারেন, তখন তার লেখা আরও গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। এই বিষয়টি লেখক অত্যন্ত সহজভাবে তুলে ধরেছেন।
‘বই লেখার কয়েকটি গুপ্ত বিপদ’ অধ্যায়ে লেখক নবীন লেখকদের সাধারণ কিছু ভুল ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে সতর্ক করেছেন। অতিরিক্ত আবেগ, অপ্রয়োজনীয় দীর্ঘতা, দুর্বল সম্পাদনা কিংবা তথ্যগত অসংগতির মতো বিষয় কীভাবে একটি সম্ভাবনাময় বইকে দুর্বল করে দিতে পারে, তা তিনি স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। এই অংশটি নতুন লেখকদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, অনেকেই লেখার পর নিজস্ব সীমাবদ্ধতা বুঝতে পারেন না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কপিরাইট, অনুমতিপত্র ও প্রকাশকের সঙ্গে চুক্তির মতো বাস্তব বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা। বাংলা ভাষায় প্রকাশনাবিষয়ক বইয়ে সাধারণত এসব আলোচনা কম দেখা যায়। অথচ একজন লেখকের জন্য নিজের স্বত্ব ও আইনি অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়া অত্যন্ত জরুরি। বদিউদ্দিন নাজির এই বিষয়ে সহজ ভাষায় প্রয়োজনীয় ধারণা দিয়েছেন, যা নতুন লেখকদের সচেতন হতে সাহায্য করবে।
‘থিসিস থেকে বই’ অধ্যায়টি গবেষকদের জন্য বিশেষভাবে উপকারী। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাপত্রকে কীভাবে সাধারণ পাঠকের উপযোগী বইয়ে রূপান্তর করা যায়, সে বিষয়ে লেখক বাস্তব নির্দেশনা দিয়েছেন।
একইভাবে ‘রিভিশন ও শেল্ফ এডিটিং’, ‘প্রুফরিডিং’ ও ‘বইয়ের ইনডেক্স’ অধ্যায়গুলো বই নির্মাণের কারিগরি দিক সম্পর্কে পাঠককে সচেতন করে তোলে।
অনেক নতুন লেখকই মনে করেন, লেখা শেষ হলেই কাজ শেষ। কিন্তু এই বইটি দেখায়, প্রকৃতপক্ষে সম্পাদনা, সংশোধন ও উপস্থাপনাই একটি বইকে পূর্ণতা দেয়।
ভাষাগত দিক থেকেও বইটি প্রশংসার দাবি রাখে। লেখকের ভাষা সহজ, সাবলীল ও পাঠকবান্ধব। কোথাও অতিরিক্ত জটিলতা নেই, আবার প্রয়োজনীয় তথ্যেরও ঘাটতি নেই। ফলে নতুন লেখক, গবেষক কিংবা বইপ্রেমী—সব ধরনের পাঠক বইটি সহজেই পড়তে পারবেন।
বইটির আরেকটি শক্তি হলো এর বাস্তবমুখী দৃষ্টিভঙ্গি। লেখক শুধু তাত্ত্বিক আলোচনা করেননি; বরং প্রকাশনা জগতের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে উদাহরণ এনে বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করেছেন।
এই বই পড়তে গিয়ে প্রাসঙ্গিকভাবেই আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের কথা মনে পড়ছে। সৈয়দ শামসুল হকের ‘হৃৎ কলমের টানে’ ও ‘মার্জিনে মন্তব্য’ এবং ফারুক নওয়াজের ‘লেখালেখির ব্যাকরণ’ বইগুলোও নতুন লেখকদের জন্য সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এসব বই লেখালেখির অন্তর্গত শৃঙ্খলা, ভাষাবোধ, সম্পাদনা ও সৃজনশীলতার নানা দিক নিয়ে ভাবতে শেখায়। বাংলা ভাষায় এ ধরনের বই আরও বেশি প্রয়োজন। কারণ, সাহিত্যচর্চা কেবল প্রতিভার বিষয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রস্তুতি, অধ্যবসায় ও প্রকাশনা সংক্রান্ত বাস্তব জ্ঞানও।
সব মিলিয়ে ‘বই প্রকাশে লেখকের প্রস্তুতি’ একটি প্রয়োজনীয়, তথ্যসমৃদ্ধ ও সময়োপযোগী বই। বিশেষ করে যারা নতুন লিখতে শুরু করেছেন কিংবা ভবিষ্যতে বই প্রকাশের স্বপ্ন দেখছেন, তাদের জন্য এটি হতে পারে একটি কার্যকর গাইডলাইন।
লেখালেখি যদিও পুরোপুরি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শেখার বিষয় নয়, তবু ভালো লেখক হয়ে ওঠার জন্য কিছু প্রস্তুতি, সচেতনতা ও কারিগরি জ্ঞান প্রয়োজন—এই সত্যটিই বইটির মূল বার্তা।
বইটি প্রকাশ করেছে কথাপ্রকাশ। মূল্য ৬০০ টাকা। আগ্রহী পাঠকরা বইটি সংগ্রহ করতে পারেন বাতিঘর, প্রথমা এবং অনলাইন বুকশপ রকমারি ডটকম থেকে।