‘তাহার পরিধানে ছিল সাদা পাজামা ও পাঞ্জাবি’
সাংবাদিকতার শিক্ষার্থীদের জন্য খুবই প্রয়োজনীয় একটি গ্রন্থ ‘দ্য কমপ্লিট রিপোর্টার’। জুলিয়ান হ্যারিস, স্ট্যানলি জনসন ও কেলি লেইটারের লেখা বইটিতে ফিলিপ এল. গ্রাহামের ভাষায় সংবাদের একটি সংজ্ঞা আছে। তাতে বলা হয়েছে, ‘নিউজ ইজ দ্যা ফার্স্ট রাফ ড্রাফট অব হিস্ট্রি।’ অর্থাৎ, সংবাদ হলো ইতিহাসের প্রাথমিক খসড়া।
সংজ্ঞাটি তাৎপর্যপূর্ণ ও কালজয়ী, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সংবাদপত্রের পাতাতেই ইতিহাসের প্রাথমিক খসড়া থাকে। সেটা হয়তো পরিশুদ্ধ ইতিহাস নয়, তবে নিশ্চিতভাবেই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোররাতে বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের ঘটনাপ্রবাহে অনেকেরই আগ্রহ রয়েছে। যে ইতিহাস পাঠের অন্যতম সূত্র হতে পারে সংবাদপত্র। দেখে নেওয়া যাক, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের সেই ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ কীভাবে এসেছিল সংবাদপত্রের পাতায়।
ব্যানার হেডলাইন, প্রেসনোটে রাষ্ট্রপতি জিয়া হত্যার খবর
১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোররাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। এই হত্যাকাণ্ডের খবর সংবাদপত্রে প্রথম প্রকাশিত হয় ৩১ মে রোববার।
এদিন তৎকালীন প্রায় সব দৈনিক সংবাদপত্রে আট কলামের ব্যানার হেডলাইন ছিল রাষ্ট্রপতি জিয়ার হত্যাকাণ্ড নিয়ে। যেমন: দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনাম ছিল, ‘প্রেসিডেন্ট জিয়া নিহত’। একইসঙ্গে বিচারপতি সাত্তারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের সংবাদও প্রকাশিত হয়েছিল গুরুত্ব সহকারে। এ ছাড়া, সারাদেশে জরুরি অবস্থা জারির খবরও ছিল সংবাদপত্রের পাতায়।
১৯৮১ সালে দেশে অন্যতম প্রধান দৈনিক ছিল ‘আজাদ’। এই সংবাদপত্রটিও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যার সংবাদ গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ করে। দৈনিক আজাদের আট কলামে প্রধান শিরোনাম ছিল, ‘প্রেসিডেন্ট জিয়া নিহত’। আজাদের এই সংবাদে বলা হয়, ‘প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান গতকাল সকালে চট্টগ্রামে দুষ্কৃতীকারীদের হাতে নিহত হইয়াছেন (ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইয়া ইলাইহে রাজেউন)। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের শাসনতন্ত্রের ৫৫ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ভাইস-প্রেসিডেন্ট বিচারপতি জনাব আবদুস সাত্তার প্রেসিডেন্টের দায়িত্বভার গ্রহণ করিয়াছেন। দেশে জরুরী অবস্থা ঘোষণা করা হইয়াছে। বিচারপতি জনাব সাত্তার এক বেতার ভাষণে এই দায়িত্বভার গ্রহণের কথা ঘোষণা করেন। অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট আমাদের মহান নেতার মৃত্যুতে ৪০ দিনব্যাপী জাতীয় শোক পালনের কথ্য ঘোষণা করিয়াছেন। এই সময় জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হইবে। অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট বেতার ভাষণে বলেন, বাংলাদেশ সরকার ও অন্যান্য দেশগুলির মধ্যকার সকল আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক চুক্তি বলবৎ থাকিবে। অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট দেশপ্রেমিকতায় উদ্বুদ্ধ হইয়া শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য দেশবাসীর প্রতি আবেদন জানান। তিনি জানান, মন্ত্রী পরিষদের সকল সহস্য যথারীতি তাহাদের দায়িত্ব পালন করিতেছেন।’ (আজাদ, ৩১ মে ১৯৮১)
একইদিন সংবাদপত্রে প্রকাশিত আরেকটি খবর ছিল লক্ষণীয়। সে সময় বিভিন্ন ধরনের বড় ঘটনায় সরকার থেকে প্রেসনোট প্রকাশের রীতি ছিল। বিশেষ করে বড় কোনো হত্যাকাণ্ড, এমনকি আন্দোলন-সংগ্রামে পুলিশের গুলিতে কেউ নিহত হলেও সরকারের তরফে প্রেসনোট প্রকাশ করা হতো।
১৯৮১ সালের ৩১ মে এমন এক প্রেসনোট থেকে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড বিষয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়। তাতে বলা হয়, ‘সরকার গভীর দুঃখের সহিত ঘোষণা করিতেছেন যে, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীর উত্তম শনিবার ভোরে চট্টগ্রামে কতিপয় দুষ্কৃতকারীর হাতে নিহত হন। এই আকস্মিক ঘটনায় প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা রক্ষী এবং আরও কয়েকজন প্রাণ হারাইয়াছেন। ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় নিহত ব্যক্তিদের সঠিক সংখ্যা জানা এখনও সম্ভব হয় নাই। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের শাসনতন্ত্রের ৫৫ (১) ধারা মোতাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট বিচারপতি জনাব আবদুস সাত্তার গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রেসিডেন্টের দায়িত্বভার গ্রহণ করিয়াছেন। ইহার পর পরই মন্ত্রী পারিষদের এক জরুরী বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় এবং পরিস্থিতি পর্যালোচনায় পর অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট সারাদেশে জরুরী অবস্থা সংক্রান্ত ঘোষণা জারী করেন। অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট এবং তাহার মন্ত্রী পরিষদের সদস্যরা সারাদিনব্যাপী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। সশস্ত্র বাহিনী, বাংলাদেশ রাইফেলস ও পুলিশ বাহিনীর প্রধানগণ দেশের নিয়মতান্ত্রিক সরকারের প্রতি তাহাদের পূর্ণ আনুগত্যের কথা পুনরুল্লেখ করিয়াছেন।’
‘ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট এবং সেনাবাহিনী প্রধান চট্টগ্রামের দুষ্কৃতীকারী, যাহারা নিজেদেরকে বিপ্লবী পরিষদ হিসাবে উল্লেখ করিয়াছে, তাহাদের প্রতি অবিলম্বে সরকারের নিকট আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়াছেন। ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট গতকাল সন্ধ্যায় পরিস্থিতি সম্পর্কে সকল জাতীয় রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দকে অবহিত করেন। সমবেত নেতৃবৃন্দ চট্টগ্রামে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে হত্যার কথা পুর্নব্যক্ত করেন এবং সন্ত্রাসের রাজনীতির নিন্দা করেন। নেতৃবৃন্দ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ইন্তেকালে গভীর দুঃখ প্রকাশ এবং শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন। তাহার প্রেসিডেন্টের রুহের মাগফেরাত কামনা করিয়াছেন।’ (আজাদ, ৩১ মে ১৯৮১)
১৯৮১ সালের ১ জুনের সংবাদপত্রেও ছিল রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের খবর। এদিন সংবাদপত্রগুলোতে প্রকাশিত হয়েছিল রাষ্ট্রপতির গায়েবানা জানাজার ছবি ও খবর। একইসঙ্গে ছিল বিদ্রোহ অবসানে জিওসি মেজর জেনারেল এম এ মঞ্জুর ও তার অনুগত সেনাদের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি। এদিন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার, সেনাপ্রধান হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ ও মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানীর বরাতে বেশকিছু সংবাদ প্রকাশিত হয়। সেগুলোর মূল বিষয় ছিল, বিদ্রোহের অবসান। একইসঙ্গে দ্রুত আত্মসমর্পণ না করলে কঠোর ব্যবস্থার হুশিয়ারিও ছিল তাদের কণ্ঠে।
এদিন দ্য বাংলাদেশ অবজারভারের প্রধান শিরোনাম ছিল, ‘STERN ACTION ORDERED’. যার বাংলা অর্থ দাঁড়ায়, ‘কঠোর ব্যবস্থার সিদ্ধান্ত’। এই সংবাদে বলা হয়, বাসস এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার রোববার মেজর জেনারেল মঞ্জুরের নেতৃত্বে প্রতিরক্ষা বাহিনীর ‘কিছু বিপথগামী’ সদস্যের বিদ্রোহ দমনের জন্য সেনাপ্রধান ও অন্যান্য বাহিনীর প্রধানদের অবিলম্বে ‘কঠোর ব্যবস্থা’ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এইচ. এম. এরশাদ রোববার মেজর জেনারেল মঞ্জুরসহ চট্টগ্রামের সব দুষ্কৃতকারী ও তাদের কমান্ডিং অফিসারদের ১ জুন সোমবার সকাল ৬টার মধ্যে আত্মসমর্পণ করার জন্য চূড়ান্ত নির্দেশনা জারি করেছেন। আগের দিন রোববার দুপুর পর্যন্ত আত্মসমর্পণের যে সময়সীমা ছিল, তা ১৮ ঘণ্টা বাড়ানো হয়েছে। জেনারেল এরশাদ জানিয়েছেন, বিপুল সংখ্যক অনুগত কর্মকর্তা ও সৈনিক আত্মসমর্পণ শুরু করায় এই সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে।
দ্য বাংলাদেশ অবজারভারের এই প্রতিবেদনে যে বর্ণনা ছিল, তাতে চট্টগ্রামের এই বিদ্রোহ দমনে রাষ্ট্রর সর্বোচ্চ হুঁশিয়ারির বিষয়টি স্পষ্ট। উল্লেখ্য, সংবাদটি ছিল বেশ বড় ও বিস্তৃত। সেখানে পরের দিকে উঠে এসেছে নৌ-বাহিনী প্রধানের একটি ঘোষণা। সেখানে নৌ-প্রধান ভাইস মার্শাল এম. এ. খান এক বেতার ও টেলিভিশন ভাষণে জানিয়েছেন, নৌ-বাহিনী পরিপূর্ণভাবে নির্বাচিত সরকারের প্রতি অনুগত। একইসঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর ও নেভাল বেজ পুরোপুরিভাবে তার নিয়ন্ত্রণে আছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এ দিন দ্য বাংলাদেশ অবজারভারে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মরদেহ হস্তান্তরে মঞ্জুরের অসম্মতি নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। শিরোনাম ছিল, ‘Manzoor refuses to hand over Zis body’. বাসস-এর বরাতে দ্য বাংলাদেশ অবজারভারের প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারের অনুরোধে চট্টগ্রামে রেড ক্রসের কর্মকর্তারা সাক্ষাৎ করতে গেলে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নেতা জেনারেল মঞ্জুর প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মরদেহ হস্তান্তর করতে অস্বীকৃতি জানান। রেড ক্রস চেয়ারম্যান বিচারপতি শাহাবুদ্দিনকে উদ্ধৃত করে সরকারের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এই অস্বীকৃতি জেনেভা কনভেনশন এবং অ-আন্তর্জাতিক সশস্ত্র সংঘাত সম্পর্কিত অতিরিক্ত প্রোটোকলের লঙ্ঘন।
এই সংবাদটি বিশেষভাবে বিশ্লেষণের দাবি রাখে। এম. এ. মঞ্জুর ও তার সহযোগী কর্মকর্তারা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর মরদেহ হস্তান্তরে অসম্মতি জানিয়েছিল—এই প্রেক্ষাপট ঐতিহাসিক সত্য। শুধু তাই নয়, হত্যাকারীরা জিয়াউর রহমান ও তার দুই নিরাপত্তারক্ষীর মরদেহ চট্টগ্রাম শহরের অদূরে অত্যন্ত অবহেলায় দাফন করেছিল। পরে বিদ্রোহ অবসানের পর রাঙ্গুনিয়া থেকে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং অপর দুজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
বিদ্রোহের অবসান, হত্যাকাণ্ডের আদ্যোপান্ত সংবাদমাধ্যমে
ব্যর্থ বিপ্লবে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের দায় নিজের কাঁধে নেন মঞ্জুর। তবে, কিছু সাবেক সেনা কর্মকর্তার যুক্তি ছিল, এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনায় মঞ্জুর হয়তো জড়িত ছিলেন না। অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মনজুর রশীদ খান তার স্মৃতিকথা ‘আমার সৈনিক জীবন: পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ’-এ এমন আরেকজন কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়েছেন, যিনি মঞ্জুরের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছিলেন। প্রেসিডেন্ট জিয়া হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে মঞ্জুর বলেছিলেন, ‘এটা আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল, তারা এটা করেছে, কিন্তু আমি এর দায় নিচ্ছি। সবকিছুর জন্য আমিই দায়ী।’ (আমার সৈনিক জীবন: পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা ১৪৩)
এ সময়টি চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা বিচ্ছিন্ন ছিল। তাই ব্যর্থ বিদ্রোহের কয়েকদিন চট্টগ্রামে ঠিক কি ঘটেছে, তার প্রতি দেশবাসীর প্রবল কৌতূহল ছিল। যে কারণে বিদ্রোহের অবসানের পর সংবাদপত্রগুলো এ ঘটনার আদ্যোপান্ত নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করে। যে সংবাদগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল ৩০ মে ভোরবেলা জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের ঘটনাপ্রবাহ। এ ছাড়া, জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর তিন সদস্যের একটি বেসামরিক কমিশন গঠিত হয়েছিল। যে কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়ার পর ১৯৮১ সালের আগস্টে দৈনিক ইত্তেফাকসহ অন্যান্য সংবাদপত্র রাষ্ট্রপতি হত্যাকাণ্ড নিয়ে বিস্তারিত সংবাদ প্রকাশ করে।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তথ্য নিয়ে ১৯৮১ সালের ২ জুন প্রকাশিত আজাদের একটি সংবাদে দৃষ্টি দেওয়া যেতে পারে। বাসস পরিবেশিত ‘সেই ভয়াল রাতের ঘটনা’ শিরোনামের সংবাদে বলা হয়—
‘বাংলাদেশের প্রধান নেতা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান গত ৩০শে মে ভোর চারটার দিকে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সেনাবাহিনীর একদল বিপথগামী কমান্ডোর হাতে নিহত হন। কমান্ডোরা প্রথমে সার্কিট হাউজের উপর কতিপয় রকেট বর্ষণ করে। তাহারা কতিপয় পুলিশ প্রহরীকে গুলী করিয়া হত্যা করার পর সংরক্ষিত এলাকায় প্রবেশ করিতে সমর্থ হয়।
দুষ্কৃতকারীরা চারিদিক হইতে সার্কিট হাউস ঘেরাও করার পর প্রথমে দুলাল নামে একজন পুলিশ কর্মচারীকে হত্যা করে। সাথে সাথে তাহারা প্রবল গুলীবর্ষণের আড়ালে সার্কিট হাউসের উপর তলার উঠিয়া যায়। বিএনপির সেক্রেটারী জেনারেল প্রফেসর বদরুদ্দোজা চৌধুরী জানান যে ঐ রাত্র ছিল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এবং মর্মান্তিক ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তিনি কিছুই টের পান নাই। তিনি জানান, রাত প্রায় চারটার দিকে মুহুর্মূহ রকেট বর্ষণের শব্দে তিনি ঘুম হইতে জাগিয়া উঠেন এবং বাহিরে কি ঘটতেছে তা বুঝিবার চেষ্টা করেন। কিন্তু মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই সমগ্র সার্কিট হাউস এলাকা শব্দে প্রকম্পিত হইতে থাকে এবং চারিদিকে ধুম্র ছাড়া আর দেখা যায় নাই। প্রফেসর বদরুদ্দোজা চৌধুরী সাবেক সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী সৈয়দ মহিবুল হাসানের সহিত সার্কিট হাউসের দোতলায় প্রেসিডেন্ট যে রুমে ছিলেন, তাহার ঠিক বিপরীত রুমে অবস্থান করিতেছিলেন।
জনাব হাসান জানান দুষ্কৃতিকারীরা এত দ্রুত গুলীবর্ষণ করিতেছিল যে শুধু ভয়াবহ শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যায় নাই। কয়েক মিনিটের মধ্যেই দুষ্কৃতিকারীরা দোতলায় উঠে যায়।
তিনি জানান যে বুলেট বৃষ্টির মধ্যে আমরা মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করিতেছিলাম। মুহূর্তের মধ্যেই দুষ্কৃতিকারীরা প্রেসিডেন্টের রুমের দরজার সম্মুখে প্রহরারত সেন্টিকে হত্যা করে।
প্রফেসর বদরুদ্দোজা চৌধুরী জানান, শত শত বুলেট আমাদের রুমের মধ্যে আসিয়া আমাদের বিছানা ও জানালায় আঘাত হানিতেছিল। আমরা ঠিক যেন শেষ মুহুর্তের জন্য অপেক্ষা করিতেছিলাম। তিনি আরও জানান, ইহার পর মরহুম প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত সচিব কর্ণেল মাহফুজের নিকট সর্বপ্রথম জানিতে পারেন যে, দুষ্কৃতিকারীরা সার্কিট হাউজ ত্যাগ করিয়েছে।
সাবেক মহিলা বিষয়ক মন্ত্রী মিসেস আমেনা রহমানের ঐ রাতে সার্কিট হাউসে ছিলেন। তিনি জানান, দুস্কৃতিকারীরা কয়েক মিনিটের মধ্যে প্রেসিডেন্টকে হত্যা করিয়া তাহার লাশ ফেলিয়া চলিয়া যায়। ঘটনার সময় শত শত বুলেট দরজা দিয়া তাহার রুমে ভেতর প্রবেশ করে এবং তখন তিনি নামাজ পড়ার উদ্দেশ্যে ওজু করিবার জন্য বাথরুমে যান।
বিএনপি’র শ্রমিক দলের নেতা মীজানুর রহমানও ঐ রাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে ছিলেন। তিনি জানান, প্রেসিডেন্ট ও অন্যান্য লোকদের হত্যা করিয়া দুষ্কৃতিকারীরা চলিয়া যাইবার পর তিনি তাহার রুম হইতে বাহির হইয়া কর্ণেল মাহফুজের সহিত দেখা করেন। পরে তাহারা প্রেসিডেন্টের রক্তাক্ত মৃতদেহ পড়িয়া থাকিতে দেখেন। প্রফেসর বদরুদ্দোজা চৌধুরী জানান, ভোর প্রায় সাড়ে ৪টার দিকে মাহবুবুল হাসান ও তিনি রুম হইতে বাহির হন এবং প্রেসিডেন্টের রক্তাক্ত লাশ দেখিতে পান। প্রেসিডেন্টের রুমের দরজা হইতে এক কদম দূরে মরদেহ পড়িয়াছিল ছিল।
তিনি বলেন, সম্ভবত প্রেসিডেন্ট গুলীর শব্দ শুনিয়া রুম হইতে বাহির হইয়াছিলেন এবং সাথে সাথে দুষ্কৃতিকারীদের গুলিতে নিহত হন। তাহার পরিধানে ছিল সাদা পাজামা ও পাঞ্জাবি।’ (আজাদ, ২ জুন ১৯৮১)
শুধু আজাদ নয়, এ সময় দেশের অন্যান্য সংবাদপত্রও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের সংবাদ বিস্তারিত প্রকাশ করে। যা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস গবেষক ও উৎসুক পাঠকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
রাহাত মিনহাজ: সহকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়