জাঠিভাঙ্গা গণহত্যা: উত্তরাঞ্চলের সর্ববৃহৎ গণহত্যার বিষাদমাখা বয়ান
২৩ এপ্রিল, জাঠিভাঙ্গা গণহত্যা দিবস। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের আজকের দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসরেরা ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার শুখানপুকুরী ইউনিয়নের জাঠিভাঙ্গায় নির্বিচারে গুলি চালিয়ে অন্তত ৩ হাজার মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করে।
জাঠিভাঙ্গা গণহত্যা ছিল দেশের উত্তরাঞ্চলে সংঘটিত সর্ববৃহৎ গণহত্যা।
ঠাকুরগাঁওয়ের শান্ত সুনিবিড় ইউনিয়ন শুখানপুকুরী। ইউনিয়নটির মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে সীমান্তবর্তী খরস্রোতা নদী পাথরাজ। নদীর এক পাড়ের তীর ঘেঁষে জাঠিভাঙ্গা। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জাঠিভাঙ্গা ও পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতে বসবাসকারী হিন্দু জনগোষ্ঠীর বাসিন্দারাই ছিলেন সংখ্যাগরিষ্ঠ। ধর্মীয় সহাবস্থানের কারণে গ্রামবাসীদের মধ্যে ছিল না কোনো বিরোধ।
মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে পাকিস্তানি বাহিনীর নারকীয় গণহত্যা ও নির্যাতনের মুখে প্রাণ বাঁচাতে দেশ ছেড়ে শরণার্থী হয়ে ভারতে পাড়ি জমাতে শুরু করেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সাধারণ মানুষ। তবে এ ক্ষেত্রে কিছুটা ব্যতিক্রম ছিল শুখানপুকুরী ইউনিয়নের গ্রামগুলো। প্রত্যন্ত জনপদ হওয়ায় পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকাররা তখনও এই ইউনিয়নে প্রবেশ করেনি। পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারদের উপদ্রব না থাকায় এই রুটটি পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলা ও দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার পলাশবাড়ী ইউনিয়ন থেকে আগত ভারতগামী শরণার্থীদের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছিল। ফলে এই রুট ধরে দিনে দিনে বাড়তে থাকে বিভিন্ন জেলা থেকে আগত শরণার্থীর সংখ্যা।
একপর্যায়ে পাকিস্তানি বাহিনী রাজাকারদের মাধ্যমে শরণার্থীদের এই রুটের সম্পর্কে জেনে যায়। পাকিস্তানি বাহিনীর আসন্ন হামলার আশঙ্কায় ও পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন অঞ্চলে গণহত্যার খবর শুনে শুখানপুকুরি ও পার্শ্ববর্তী জগন্নাথপুর, চকহলদি, সিংগিয়া, চণ্ডীপুর, বালিয়া, বাসুদেবপুর, মিলনপুর, গৌরীপুর, খামার ভোপলা গ্রামের বাসিন্দারাও শেষমেশ প্রাণের ভয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
২২ এপ্রিল তারা ভারতের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন। এদিন বিকেলে শরণার্থীদের অনেকেই পাখরাজ নদী তীরবর্তী জাঠিভাঙ্গায় পৌঁছান। আগে থেকেই জাঠিভাঙ্গায় অন্য অঞ্চল থেকে আসা শরণার্থীরা রাত্রিযাপনের জন্য অবস্থান করছিলেন। ফলে সেখানে জনসমাগম বেশি হয়ে যায়। এ সময় স্থানীয় রাজাকাররা তাদের রাত্রিযাপন করতে বলে সহযোগিতার আশ্বাস দেন এবং পরদিন সকালে সীমান্তের দিয়ে যাত্রা করার অনুরোধ করেন। সন্ধ্যা গড়িয়ে যাওয়ায় নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের কথা ভেবে এবং রাজাকারদের আশ্বাসে বিশ্বাস করে শরণার্থীরা জাঠিভাঙ্গায় রাত্রিযাপনের সিদ্ধান্ত নেন।
শরণার্থীদের আশ্বস্ত হওয়ার খবর পেয়ে এদিন রাতে স্থানীয় কয়েকজন রাজাকার ঠাকুরগাঁও ইপিআর সেক্টর হেড কোয়ার্টারে বিপুল সংখ্যক শরণার্থীর উপস্থিতির খবর জানিয়ে দেয়।
ফারজানা হকের লেখা ‘জাঠিভাঙ্গা গণহত্যা’, মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাকের ‘উত্তরের গণহত্যা ১৯৭১’ বইয়ে জাঠিভাঙ্গা গণহত্যা ও এই গণহত্যার নৃশংসতার বিবরণ রয়েছে। এই দুটি বইয়ের তথ্য এবং মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ও গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া যায় এই গণহত্যায় নারকীয়তার চিত্র।
১৯৭১ সালের ২৩ এপ্রিল ছিল শুক্রবার। এদিন ভোর থেকেই আগের রাতে আসা শরণার্থীদের অনেকেই সীমান্তের দিয়ে যাত্রা শুরু করেন। বিভিন্ন এলাকা থেকে শরণার্থীরা এ সময় জাঠিভাঙ্গা ও শুখানপুকুরী ইউনিয়নের বিভিন্ন জায়গায় জমায়েত হতে শুরু করেছেন। সকাল থেকেই স্থানীয় রাজাকারেরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী পুরুষদের পাথরাজ নদীর উপরে ভাঙা পুল মেরামতের কথা বলে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করে। নিরীহ শরণার্থীরা ঘুণাক্ষরেও টের পাননি তাদের ওপর পৈশাচিক এক গণহত্যা সমাগত।
বেলা বাড়তেই রাজাকারদের সহযোগিতায় দুই ট্রাক ভর্তি পাকিস্তানি সেনা জাঠিভাঙ্গায় পৌঁছায়। প্রথমে তারা জাঠিভাঙ্গা ও পার্শ্ববর্তী এলাকা ঘেরাও করে। এ সময় রাজাকারেরা বিভিন্ন গ্রাম থেকে নিরীহ সাধারণ মানুষ ও শরণার্থীদের তুলে আনে। একপর্যায়ে তুলে আনা গ্রামবাসী ও শরণার্থীদের পাথরাজ নদীর পাড়ে জড়ো করে এবং পাকিস্তানি বাহিনী নির্বিচারে গুলি চালানো শুরু করে।
প্রাণ বাঁচাতে ছুটতে শুরু করেন সাধারণ মানুষ। পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারদের অবিশ্রান্ত গুলিতে অসংখ্য সাধারণ মানুষ শহীদ হন। উপস্থিত মানুষের সংখ্যা বেশি হওয়ায় গণহত্যার একপর্যায়ে হানাদারদের গুলির মজুত কমে আসে। এ সময় দেশীয় ধারালো অস্ত্র দিয়ে বহু মানুষকে নির্বিচারে কুপিয়ে হত্যা করে রাজাকারেরা।
এই গণহত্যার অন্যতম প্রত্যক্ষদর্শী জাঠিভাঙ্গা এসসি উচ্চবিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক রাম কিশোর বর্মণ। দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘এ দৃশ্য স্বচক্ষে না দেখলে কেউ বিশ্বাস করতে পারবে না। ওরা একপাশ থেকে গুলি করছে, আর পুরুষেরা পালাচ্ছে। দৌড়াতে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। গুলি এসে লাগছে, আর সামনে এগোতে না পেরে ঢলে পড়ছে।’
তিনি বলেন, ‘এভাবেও মানুষ মানুষকে মারতে পারে! যুদ্ধের পর গাঙয়ে অনেক মানুষের খুলি পাওয়া গিয়েছিল। অন্য জেলা থেকে আসা বহু মানুষের নাম-পরিচয় আর কখনও জানতে পারিনি।’
তিনি জানান, গণহত্যার আগে পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকাররা বাড়ি বাড়ি ঢুকে প্রথমে এক দফা লুটপাট চালিয়েছিল। গণহত্যা শেষে পাকিস্তানি সেনারা চলে গেলে রাজাকাররা আরেক দফা লুটপাট করে বাড়িঘরে আগুন দেয়। এতে গ্রামগুলোর স্বামী ও স্বজনহারা বিধবারা পুরোপুরি নিঃস্ব হয়ে পড়েন।
‘জাঠিভাঙ্গা গণহত্যা’ বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, এই গণহত্যার মূল উদ্দেশ্য ছিল হিন্দু পুরুষ নিধন। ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার চকহলদি, চণ্ডীপুর, শুখানপুকুরী গ্রামের শত শত নারী স্বামীহারা হয়েছিলেন। গ্রামগুলো পরে বিধবাপল্লী হিসেবে পরিচিতি পায়।
ফারজানা হক দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘জাঠিভাঙ্গা গণহত্যা ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত গণহত্যা। এর মূল উদ্দেশ্যই ছিল এই অঞ্চলকে হিন্দু পুরুষ শূন্য করতে হবে। এ জন্য তারা শরণার্থীদের টার্গেট করে গণহত্যা চালিয়েছিল।’
যুদ্ধের পর জাঠিভাঙ্গা গণহত্যায় স্বামীহারা বিধবাদের অনেককেই জীবিকা উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে ভিক্ষাবৃত্তিকে বেছে নিতে হয়েছিল। কেউবা দিনমজুরি করে সংসার চালাতেন।
জাঠিভাঙ্গা গণহত্যায় এতো বেশি মানুষ শহীদ হয়েছিলেন যে, তাদের সৎকার করা সম্ভব ছিল না। ফলে গুটিকয়েক মরদেহ ছাড়া বেশিরভাগই পাথরাজ নদীতে ফেলেছিলেন স্থানীয়রা।
পাথরাজ নদীর তীরে এই গণহত্যার স্থানে স্থাপন করা হয়েছিল স্মৃতিস্তম্ভ। বর্তমানে সেটি পড়ে রয়েছে অবহেলার সাক্ষী হয়ে।
উত্তরাঞ্চলের সর্ববৃহৎ গণহত্যাটি এখানে হলেও পুরো কমপ্লেক্সেই নেই কোনো নৃশংসতা ও গণহত্যার বিবরণ। সীমানা প্রাচীরের মূল ফটকে নেই কোনো তালাও। সন্ধ্যা হলেই স্মৃতিস্তম্ভের ভেতরে বসে মাদকসেবীদের আড্ডা। স্মৃতিস্তম্ভ ও কমপ্লেক্সের দেখভালের দায়িত্বে নেই কোনো তত্ত্বাবধায়ক বা নিরাপত্তারক্ষী।
সারা বছর জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে থাকলেও স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসে শহীদদের স্মরণ করেন এলাকাবাসী। পুরো বছরে এই দুটি দিনেই স্মৃতিস্তম্ভটি ধুয়ে-মুছে সাফ করা হয়।
শুকানপুকুরী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. সুমন রানা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘স্মৃতিস্তম্ভের জায়গাটি সারা বছরই অবহেলায় পড়ে থাকে। কিছু দর্শনার্থী আগ্রহ নিয়ে আসেন, কিন্তু হতাশ হয়ে ফিরে যান। আমরা বহুবার কেয়ারটেকার ও গার্ডের জন্য চিঠি দিয়েছি। কিন্তু, কাজ হয়নি। স্মৃতিস্তম্ভ কমপ্লেক্সটি এখন পুরোপুরি অরক্ষিত এবং মাদকসেবীদের আড্ডায় পরিণত হয়েছে। মূল গেটে তালা ছিল। মাদকসেবীরা তালা ভেঙে সেখানে ঢুকছে। পানি তোলার মোটর পর্যন্ত চুরি করে নিয়ে গেছে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের ইউনিয়নবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি, জাঠিভাঙ্গা গণহত্যার স্মৃতি সংরক্ষণে জাদুঘর নির্মাণ করা হোক। তাহলে অন্তত নতুন প্রজন্ম জানতে পারবে, স্বাধীনতার জন্য আমাদের কতোটা ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছিল।’