‘সপ্তাহে একটি বই পড়ি’ ব্যতিক্রমী এক পাঠচক্র
আমরা কোন পথে এগোচ্ছি—সৃষ্টি না ধ্বংসের দিকে? সৌন্দর্য বা আনন্দের দিকে, না ভয়ের দিকে? সর্বোপরি—জ্ঞানের দিকে, না অজ্ঞতার দিকে? প্রশ্নগুলো সামনে রেখে যশোরের সুলতানপুরে অনুষ্ঠিত হলো ব্যতিক্রমধর্মী পাঠচক্র 'জ্ঞানযাত্রা ও প্রতিবেশ অধ্যয়ন ২০২৬'।
'সপ্তাহে একটি বই পড়ি' উদ্যোগের আয়োজনে শনিবার যশোরের সুলতানপুরে সরিষাক্ষেতের মাঝে দিনব্যাপী আয়োজনের কেন্দ্রে ছিল নোবেলবিজয়ী লেখক পাওলো কোয়েলহো'র বিশ্বখ্যাত গ্রন্থ 'দ্য আলকেমিস্ট'। প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে, গ্রাম ও শহরের মানুষের মিলিত অংশগ্রহণে জ্ঞানচর্চা, পাঠ-আলোচনা ও মানবিক সংলাপের মধ্য দিয়ে দিনটি রূপ নেয় এক অনন্য সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতায়।
বিস্তৃর্ণ হলুদ রঙের দিগন্তপ্লাবিত সরিষাক্ষেতে গোলাকারভাবে বসে শীতের মৃদুমন্দ বাতাস ও মিঠে রোদের আবহে আয়োজন করা হয়েছে পাঠচক্রের। আলোচনা, আড্ডা, গান ও কবিতায় বিকেলে হয়ে সন্ধ্যায় অবতীর্ণ হয় জ্ঞানযাত্রা ও প্রতিবেশ অধ্যয়ন।
সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শাহজাহান কবীর বইটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। পাঠচক্র সদস্য সায়মা আক্তার তৌফার সঞ্চালনায় স্বাগত বক্তব্য প্রদান করে পাঠচক্রবন্ধু অভিজিৎ কুমার তরফদার। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন প্রথম আলোর সাংবাদিক মনিরুল ইসলাম, নুরুন্নবী হৃদয়, মিঠুন হোসেন, লিমা, স্বপ্না, জান্নাতুল ফৈরদৌস ইলা, খালিদ হাসান মৃধা প্রমুখ। অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন করেন লিমা এবং কবিতা আবৃত্তি করেন স্বপ্না। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সাংবাদিক রাহুল রায় ও এস এ সিয়াম।
আয়োজকরা বলেন, সমাজে জ্ঞানের চর্চা দুর্বল হলে জন্ম নেয় অজ্ঞতা, অন্ধত্ব, বর্বরতা ও দাসত্ব—যা সহজেই সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে বিপন্ন করে তোলে। শিক্ষা ও জ্ঞান মানুষকে মুক্ত করে এই অন্ধকার থেকে। গড়ে তোলে সৌন্দর্যবোধসম্পন্ন, মানবিক ও কল্যাণমুখী মনন।
তাদের ভাষায়, উদার, সহনশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈচিত্র্যময় সমাজ নির্মাণে জ্ঞানের প্রবাহ অপরিহার্য। সমতা, ন্যায় ও ন্যায্যতার চেতনায় আলোকিত সমাজ গঠনের জন্য দরকার উন্নত মানুষ—আর উন্নত মানুষের জন্য প্রয়োজন রুচির উন্নয়ন ও শীলিত জীবনবোধের দীক্ষা।
পাঠচক্রে আলোচনায় উঠে আসে 'দ্য আলকেমিস্ট'-এর কেন্দ্রীয় দর্শন। বক্তারা উল্লেখ করেন, এই উপন্যাস আমাদের শেখায়—মানুষ যখন সত্যিকারের কল্যাণমুখী স্বপ্ন দেখে এবং তা বাস্তবায়নে আন্তরিক হয়, তখন প্রকৃতি ও বিশ্ব নিজেই সেই স্বপ্নের পক্ষে সহযাত্রী হয়ে ওঠে। ব্যক্তিগত স্বপ্নের মধ্য দিয়েই যে সার্বজনিক কল্যাণের পথ তৈরি হতে পারে—এ বোধই বইটির প্রধান অনুপ্রেরণা।
দিনব্যাপী কর্মসূচিতে ছিল আগমন ও অভ্যর্থনা, চা-চক্র, জ্ঞানযাত্রা, হলুদ ফুলের রাজ্যে পরিভ্রমণ, পাঠচক্র ও পাঠ-প্রতিক্রিয়া, মধ্যাহ্নভোজ, উন্মুক্ত পাঠ ও আলোচনা, পিঠা পর্ব এবং স্থানীয় শিশু-কিশোরদের মাঝে বই বিতরণ।