‘কারবালা’: মর্মান্তিক-ঐতিহাসিক কাহিনীর রূপায়ন

স্টার অনলাইন ডেস্ক

৬৮০ খ্রিস্টাব্দে ইমাম হুসাইন, তার পরিবার ও সঙ্গীদের শাহাদাতের মর্মান্তিক ও ঐতিহাসিক কাহিনী উঠে এসেছে ‘কারবালা’ নাটকে। প্রগতি নাট্যম প্রযোজিত এই নাটকের মঞ্চায়ন হয়েছে সম্প্রতি।

প্রাচীন ইসলামিক পুরাণ ও ঐতিহ্যের কাহিনিনির্ভর নাটকে ফোরাত কূলের কারবালা প্রান্তরে হজরত ইমাম হোসাইন ও এজিদ বাহিনীর মধ্যকার অসম যুদ্ধের প্রেক্ষাপট এই নাটকের মধ্য দিয়ে মঞ্চে উপস্থাপিত হয়েছে। নাটকের কাহিনিতে ইতিহাসের অনুসরণে খানিকটা কল্পনার আশ্রয় সংযোজন করা হয়েছে। হয়তোবা সে কারণে এই নাটক ইসলামি ইতিহাসের হুবহু উপস্থাপনা নয়- বরং তাতে ইতিহাসের সঙ্গে কল্পনার অনুরঞ্জনে নাট্য ইতিবৃত্তের নির্মাণ সম্ভব হয়ে উঠেছে।

'কারবালা' নাটকে হজরত আলী (রা.)-এর শাসনামলের অন্তিমকাল এবং ঘটনাক্রমে হজরত হাসানের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শাসকরূপে হজরত মুয়াবিয়ার উত্থানের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। তৎপরে এজিদের শাসনামলে কারবালার যুদ্ধে সংঘটিত হয়। এতে ইমাম হোসাইন পরিবারের সঙ্গে এজিদ বাহিনীর যুদ্ধ নাটকে উপজীব্য হয়ে উঠেছে।

ইতিহাস ও পুরাণের অনুষঙ্গে দেখা যায়, যুদ্ধকৌশলে এজিদ বাহিনী কারবালায় ফোরাত নদীর পানি বন্ধ করে দেয়। ফলে ইমাম হোসাইনের তাঁবুতে তৃষ্ণার হাহাকার নেমে আসে। শুরু হয় উভয়পক্ষের যুদ্ধ। যুদ্ধে ইমাম হোসাইনের পরিবারের সদস্য ও অন্যান্য সহযোদ্ধারা শাহাদত বরণ করতে থাকেন। শত্রুপক্ষের তীব্র তীরে শিশুপুত্র আজগর ও আলী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। হাসানপুত্র কাশেম অসম বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করে শহীদ হন।

পরিশেষে হজরত ইমাম হোসাইনের পালা। যুদ্ধ করতে করতে তিনি অত্যন্ত ক্লান্তি অনুভব করেন এবং তৃষ্ণাকাতর হয়ে ফোরাত নদের পানি পান করতে চাইলে তার ওপর আক্রমণ চালিয়ে হত্যা করা হয়। এরপর এই মহাবীরের পুণ্যদেহখানি অশ্বখুরে দলিত-মথিত করা হয়। তার খণ্ডিত দেহ দেখে বোন জয়নব কান্নায় ভেঙে পড়েন। তার রোদন ধ্বনির মধ্য দিয়ে ‘কারবালা’ নাটকের সমাপ্তি ঘটে।

নাটকের চরিত্র ও পোশাক নির্মাণে ইসলামি ঐতিহ্যকে অনুসরণের চেষ্টা করা হয়েছে। নাটকের আবহ সংগীতে ইসলামি ঘরানাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া নৃত্যগীতের সুরারোপেও মিশরীয় কিংবা আরবীয় ঘরানার সুরকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। নাটকের মঞ্চসজ্জা একেবারে নিরাভরণ।

পশ্চাৎ মঞ্চের মধ্যখানে একটি বৃত্তাকার বেদির দুই পাশে দুইটি ছোট অর্ধবৃত্তাকার সিঁড়ি। তাতে কখনও রাজ সিংহাসন আবার কখনও অন্যান্য প্রয়োজনীয় আসবাব ও আয়োজন সম্পন্ন হয়। নাটকে যুদ্ধাস্ত্রের ব্যবহারে খানিকটা বাস্তবানুগ ও ইঙ্গিতপূর্ণ উপায় অবলম্বন করা হয়েছে। নাট্যদৃশ্যে মঞ্চালোক পরিকল্পনা ও প্রক্ষেপণের ক্ষেত্রে মুন্সিয়ানার দেখা মিলেছে।

অভিনয়শৈলীতে কোনো কোনো শিল্পীর মধ্যে জড়তা অথবা দুর্বলতা লক্ষণীয়। তবে কারো কারো মধ্যে যথাযথ চরিত্র নির্মাণের প্রচেষ্টা অব্যাহত ছিল। বিশেষ করে মুয়াবিয়া, এজিদ, ইমাম হোসাইন, শীমার প্রভৃতি চরিত্র রূপায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শিল্পীরা যথাযথ ভূমিকা পালনে সমর্থ হয়েছেন। নাটকের নৃত্যদৃশ্যে শারাবান তাহুরার অভিনয়শৈলী ছিল সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করার মতো। তবে নাটকটিকে আরও নান্দনিক ও মনোগ্রাহী করার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত অনুশীলনের প্রয়োজন ছিল- তা বলাই যায়।

‘কারবালা’ নাটকের বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করছেন হাসান শাহরিয়ার রহমান, ভাস্কর রায়, জাবেদ হামিন, শারমীন সুলতানা মনি, সানজিদা আক্তার, দিনা আক্তার, আব্দুর রহমান রাকিব, তোফায়েল আহমেদ প্রিয়াদ, সোহানা ইসলাম, রাজিব জিসান, যারিন তাসলিম ইয়াশফা, সারা আহমেদ, নুরায়িন সারা রহমান, নুরিয়া সারা রহমান, ফারহানা হামিদ, নিয়ামুল জাহান তৃপ্ত, তাসনীম, নেহা, নবাব তুষার প্রমুখ।

নাটকের কস্টিউম ডিজাইনে এনামতারা সাকী, মঞ্চসজ্জা ও লাইট হেনড্রি পলাশ, নৃত্য ও কোরিওগ্রাফিতে মো. রোমন ইসলাম ছাড়াও নেপথ্যে অনেকে ভূমিকা রেখেছেন। নাটকের রচনা ও নির্দেশনায় ছিলেন ড. জাহারাবী রিপন। নাটক মঞ্চায়নের আগে ‘ইসলামি খেলাফত থেকে রাজতন্ত্র: কারবালা ঘটনার প্রেক্ষাপট’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কবি ও কথাকার মনিরুজ্জামান বাদল। সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন কথাসাহিত্যিক রায়হান সিদ্দিক।