শেষ হলো ৯ম নন-ফিকশন বইমেলা, গ্রন্থ সম্মাননা পেলেন নূরুল কবীর ও মুহম্মদ ইউসুফ সিদ্দিকি
শিক্ষার্থী ও পাঠকদের কাছে সহজে ও সাশ্রয়ী মূল্যে নন-ফিকশন বই পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে আয়োজিত নবম 'নন-ফিকশন বইমেলা-২০২৫' শেষ হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ ও বণিক বার্তা আয়োজিত তিন দিনব্যাপী এই বইমেলা আজ সোমবার শেষ হয়েছে।
এবার 'নন-ফিকশন গ্রন্থ সম্মাননা-২০২৫' পেয়েছেন নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীর ও গবেষক মুহম্মদ ইউসুফ সিদ্দিকি।
সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টা ড. সি আর আবরার। বিশেষ অতিথি ছিলেন ঢাবির উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ।
মেলায় অংশ নেওয়া প্রকাশকদের মনোনীত নন-ফিকশন বই থেকে বিচারক প্যানেল দুটি নির্বাচন করে লেখকদের সম্মানিত করা হয়। এবার একই সঙ্গে গ্রন্থগুলোর প্রকাশককেও সম্মাননা দেওয়া হয়।
'দ্বিরালাপ: চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান ও পূর্বাপর রাজনীতি সম্পর্কে বিশ্লেষণমূলক আলাপচারিতা' বইয়ের জন্য সম্মাননা দেওয়া হয়েছে নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীরকে। বইটি প্রকাশ করেছে কথাপ্রকাশ।
গবেষক মুহম্মদ ইউসুফ সিদ্দিকি সম্মাননা পেয়েছেন 'শিলালিপি: বাংলার আরবি-ফারসি প্রত্নলেখমালা' বইয়ের জন্য। এ বইটি প্রকাশ করেছে প্রথমা প্রকাশন।
এবারে চার সদস্যের জুরি বোর্ডের সভাপতি ছিলেন বাংলা একাডেমির সভাপতি আবুল কাসেম ফজলুল হক। অন্য সদস্যরা হলেন—অবসরপ্রাপ্ত সচিব ও ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষক অধ্যাপক ফয়জুল লতিফ চৌধুরী, কথাসাহিত্যিক ও ব্র্যাক ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান ফারুক মঈনউদ্দীন এবং জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক আফসানা বেগম।
বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন প্রধান ও বিশেষ অতিথিরা। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন লেখক ও অনুবাদক এবং সাবেক সচিব আমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া, সাউথইস্ট ব্যাংকের এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. মুশফিকুর রহমান প্রমুখ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. সি আর আবরার বলেন, 'নন-ফিকশন বই কেবল তথ্য দেয় না। নন-ফিকশন বই চিন্তা তৈরি করে, প্রশ্ন তোলে, যুক্তি শেখায় এবং সমাজকে বুঝতে সাহায্য করে। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন তথ্যের অভাব নেই, কিন্তু জ্ঞানের ঘাটতি রয়েছে।'
তিনি বলেন, 'সোশ্যাল মিডিয়া, দ্রুত সংবাদচক্র এবং খণ্ডিত মতামতের ভিড়ে গভীর, যাচাইকৃত ও বিশ্লেষণধর্মী জ্ঞানের প্রয়োজন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। সেই প্রয়োজন পূরণে নন-ফিকশন বইয়ের ভূমিকা অপরিসীম।'
বইমেলা সম্পর্কে উপদেষ্টা বলেন, 'এই বইমেলার একটি বড় তাৎপর্য হলো এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালের ভেতরের জ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে নিয়ে এসেছে। গবেষণা, ইতিহাস, অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতি, সমাজবিজ্ঞান এসব বিষয় যখন সহজ ভাষায়, দায়িত্বশীল প্রকাশনার মাধ্যমে পাঠকের হাতে পৌঁছায়, তখন জ্ঞান সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সবসময়ই চিন্তার কেন্দ্র। কিন্তু আজকের এই আয়োজন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব শুধু ডিগ্রি দেওয়া নয়, সমাজকে ভাবতে শেখানোও তার দায়িত্ব।'
আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, 'কোনো জাতির উন্নতির পরিচায়ক অনেক কিছু হতে পারে। তবে বই তার মধ্যে অন্যতম। কথাসাহিত্য, গল্প বা উপন্যাসের গুরুত্ব যেমন আছে, তেমনি চিন্তা ও গবেষণাভিত্তিক বইও জাতীয় জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।'
তিনি বলেন, 'এগুলো জাতিকে উন্নতির পথে এগিয়ে নিতে সহায়তা করবে। আমাদের ন্যায়-নীতিবোধ বাড়ানো গেলে আমরা আরও অনেক দূর যেতে পারব। জাতির চিন্তাধারা বিকশিত হলে ন্যায়-নীতির দিকে মানুষের আগ্রহ বাড়বে। জাতীয়ভাবে এসব বিষয়ে আলোচনা হওয়া দরকার।'
জুরি বোর্ডের সদস্য অধ্যাপক ফয়জুল লতিফ চৌধুরী বলেন, 'আমি তিন বছর ধরে বিচারক হিসেবে কাজ করছি। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার আমরা অনেক ভালো ভালো বই পেয়েছি। তবে তরুণদের বই এবার কম এসেছে। আমরা মূলত রাজনৈতিক ও সামাজিক তাৎপর্য আছে— এমন বইগুলোই পুরস্কারের জন্য বেছে নিয়েছি।'
জুরি বোর্ডের আরেক সদস্য ফারুক মঈনউদ্দীন বলেন, 'পুরস্কারের জন্য যোগ্য বইয়ের সংখ্যা এবার অনেক বেশি ছিল। আমরা যা করতে চেয়েছি, তা সম্পূর্ণ নৈর্ব্যক্তিকভাবে করতে পেরেছি। এর মধ্যে কোনো ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ ছিল না। নন-ফিকশন বইমেলার রেওয়াজ আরও বিস্তৃত করা দরকার।'
জুরি বোর্ডে এবার প্রথমবারের মতো যুক্ত হন আফসানা বেগম। তিনি বলেন, 'বর্তমানে সারা বিশ্বে নন-ফিকশন বইয়ের চাহিদা অনেক বেড়ে গেছে। পুরস্কার দেওয়ার বিষয়টি সবসময়ই আনন্দের। এবার অনেক ভালো বই প্রকাশিত হয়েছে এবং আমরা ঐতিহাসিক ভিত্তি আছে—এমন বইগুলোকে বিবেচনায় নিয়েছি।'
পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে নূরুল কবীর বলেন, 'আমার লেখক জীবনে একুশে পদকসহ অনেক সময় বিভিন্ন জায়গা থেকে পুরস্কার প্রদানের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে আমি কখনোই কোনো পুরস্কার গ্রহণ করিনি। কারণ, আমি মনে করি পুরস্কার দেওয়ার আগে তা গ্রহণের জন্য মতামত চাওয়া হলে তা সম্মানজনক হয় না।'
তিনি বলেন, 'এবারই প্রথম আমি কোনো পুরস্কার গ্রহণ করতে এসেছি। কারণ, গতকালই একজন জুরি বোর্ডের সদস্য আমাকে পুরস্কারের বিষয়ে জানিয়েছেন এবং এটি আমার জন্য কিছুটা বিস্ময়কর ছিল।'
দেশের বাইরে থাকায় অনুষ্ঠানে সরাসরি উপস্থিত হতে পারেননি মুহম্মদ ইউসুফ সিদ্দিকি। অনুষ্ঠানে পাঠানো এক শুভেচ্ছা বক্তব্যে তিনি বলেন, 'আরবি ও ফারসি শিলালিপি অধ্যয়ন আমাদের বাংলার ইতিহাসকে আরও গভীরভাবে বুঝতে ও অনুধাবন করতে সাহায্য করবে। এই শিলালিপিগুলো আমাদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে বুঝতে বিশেষভাবে সহায়তা করে।'
তিনি বলেন, 'আমরা এসব শিলালিপির মাধ্যমে বুঝতে পারি যে আমাদের বাঙালি ও বাঙালিয়ানার এক বর্ণময় ইতিহাস বহুত্ববাদ, বৈচিত্র্য ও সহিষ্ণুতার এক ঐতিহ্যবাহী বুনিয়াদের ওপর গড়ে উঠেছিল। বাংলার শিলালিপির ওপর লেখা আমার এই যৎসামান্য বইটিকে এত বড় স্বীকৃতি দেওয়ায় আমি কৃতজ্ঞ।'
এবারের মেলায় প্রথমবারের মতো প্রকাশনী সংস্থাকেও সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। সমাপনী অনুষ্ঠানে কথাপ্রকাশের প্রকাশক জসিম উদ্দিন বলেন, 'বাংলাদেশের প্রকাশকদের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয় পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে। পশ্চিমবঙ্গের কোটি কোটি টাকার বই বাংলাদেশে কেনা হয়, কিন্তু আমাদের বই পশ্চিমবঙ্গে কেনা হয় না। আমরা সে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে চাই। পশ্চিমবঙ্গেও আমরা আমাদের বই বিক্রি করতে চাই।'
প্রথমা প্রকাশনের প্রতিনিধি হিসেবে সমাপনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ। তিনি বলেন, '"শিলালিপি" গ্রন্থটি অত্যন্ত নান্দনিক প্রকাশভঙ্গিতে লেখা হয়েছে। লেখক এ বইয়ে বাংলার পুনর্জাগরণকে নতুনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। বাংলা অঞ্চলের মিলেমিশে থাকার যে ঐতিহ্য আজ হারিয়ে গেছে, তা এই গ্রন্থে ফিরে পাওয়া যায়। আমাদের চিন্তাকে সবসময় নবায়ন করতে হয়। বর্তমানে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা কমে গেছে, সেখানে এই মেলা উৎসবের আবহ তৈরি করেছে। এই বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই অব্যাহত থাকুক।'
অনুষ্ঠানে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের (ইউপিএল) পরিচালক মাহরুখ মহিউদ্দিন বলেন, 'প্রকাশকদের পরিতৃপ্তি সেখানেই, যখন আমরা পাঠকদের কাছে বই পৌঁছাতে পারি। বইকে আরও বড় পরিসরে সরকারি উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রান্তিক পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে হবে। সরকারি সাহায্য বা পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া আমরা বইকে প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারব না।'
বণিক বার্তার সহকারী সম্পাদক ও বিশেষ সংবাদদাতা মো. বদরুল আলমের সঞ্চালনায় বণিক বার্তার সম্পাদক ও প্রকাশক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ সূচনা বক্তব্য দেন এবং ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মাহমুদ ওসমান ইমাম।
এবারের মেলায় দেশের মোট ৩৯টি প্রকাশনা ও গবেষণা সংস্থা অংশ নেয়। অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর স্টল থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যছাড়ে বই কেনার সুযোগ দেওয়া হয়।
মেলার শেষ দিন ক্রেতাদের জন্য র্যাফেল ড্রয়ের আয়োজন করা হয় এবং বিজয়ীদের মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন আকর্ষণীয় পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।