বই রিভিউ

পথ আছে, কিন্তু যাওয়া যাচ্ছে না: সলিমুল্লাহ খানের ‘রতি ও বিরতি’ প্রসঙ্গে

মঞ্জুরুল ইকরাম

বইয়ের শুরুতেই আন্তোনিও মাচাদো। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতি নিয়ে সাক্ষাৎকারের বই, অথচ গোঁড়ায় এসে বসে আছেন একজন স্প্যানিশ কবি। কিছুটা অপ্রত্যাশিতই। কিন্তু অপ্রত্যাশিত বলেই বোধ হয় যথাযথ। মাচাদো বলেছিলেন, পথ আগে থেকে থাকে না; হাঁটতে হাঁটতেই তৈরি হয়। জুলাইয়ের পর বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য এরচেয়ে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা পাওয়া কঠিন। মানুষ পথে নেমেছে, পুরোনো পথের অনেকটা ভেঙেছে, কিন্তু নতুন পথটি ঠিক কোথায় যাচ্ছে, সে বিষয়ে পথিকদের মধ্যে যথেষ্ট মতপার্থক্য আছে। কেউ বলছে সংস্কার, কেউ নির্বাচন, কেউ বিপ্লব, আর কেউ পুরোনো রাস্তার ওপর নতুন নামফলক বসিয়ে ফেলতে ব্যস্ত।

সলিমুল্লাহ খানের ‘রতি ও বিরতি’ এই অনিশ্চিত পথযাত্রার মধ্যেই এসে পড়ে। জুলাইয়ের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস নয়, চূড়ান্ত ব্যাখ্যাও নয় এটি। ইতিহাস এখনো ঘটছে। ফলে চূড়ান্ত ব্যাখ্যা দিতে গেলে একটু তাড়াহুড়োই হয়ে যায়। বরং, ২০২৪ থেকে ২০২৬-এর মধ্যে দেওয়া সাক্ষাৎকারগুলোর ভেতর দিয়ে সলিমুল্লাহ খান বারবার জানতে চেয়েছেন, আসলে কী বদলেছে, আর কোন কোন বিষয় শুধু জায়গা বদল করে আগের মতোই রয়ে গেছে?

জুলাইয়ের পর বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত জিনিস যদি কিছু হয়ে থাকে, সেটা মতামত। সবচেয়ে কম উৎপাদিত জিনিস সম্ভবত প্রশ্ন। কে বিপ্লবী, কে প্রতিবিপ্লবী, কে ফ্যাসিবাদের দোসর, কে নতুন বন্দোবস্তের মালিক—এসবের উত্তর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পাওয়া যায়। কিন্তু রাষ্ট্রের বৈধতা কোথা থেকে আসে, সংবিধান জনগণকে ক্ষমতা দেয় নাকি জনগণ সংবিধানকে, অথবা শাসক চলে গেলেও শাসনের অভ্যাস কেন যায় না—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে একটু বসতে হয়। ‘রতি ও বিরতি’ মূলত সেই বসে থাকার বই। তবে নিশ্চুপ বসে থাকা নয়, কথোপকথনের ভেতর দিয়ে কয়েকটি পুরোনো গিঁট নতুন করে দেখা।

বইটি সম্পাদনা করেছেন আবুল খায়ের মোহাম্মদ আতীকুজ্জামান। ‘আত্মভাব’ গ্রন্থমালার দ্বিতীয় খণ্ড হিসেবে প্রকাশিত বইটির প্রধান পর্ব ‘রতি’, ‘বিরতি’ ও ‘আরতি’; সঙ্গে ‘সংবর্ধনা’, যেখানে সলিমুল্লাহ খানের আটটি নতুন লেখা যুক্ত হয়েছে। নামগুলোর মধ্যে একধরনের গতি আছে। কোনো ঘটনায় নিবিষ্ট হওয়া, মাঝখানে থেমে পেছনে তাকানো, তারপর আবার প্রশ্নের কাছে ফেরা।

সূচিতে চোখ রাখলে মনে হয়, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতির কোনো জরুরি প্রশ্নই যেন এই বইয়ের বাইরে থাকতে পারেনি। গণঅভ্যুত্থান, অন্তর্বর্তী সরকার, নির্বাচন, সংবিধান, পুলিশ, রাজনৈতিক দল, শিক্ষা, শিল্পায়ন, ইসলাম, জাতীয়তাবাদ, শাহবাগ, শাপলা—কিছুই বাদ দেওয়া হয়নি। এতে সলিমুল্লাহ খানেরও কিছু দায় আছে। তাকে নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বেশিক্ষণ নির্বাচনে থাকেন না। একটু পরই চলে যান বৈধতায়। বৈধতা থেকে রাষ্ট্রে, রাষ্ট্র থেকে পুলিশে, সেখান থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পায়নে। প্রথমে মনে হয়, লোকটা প্রসঙ্গ পাল্টাচ্ছেন। পরে টের পাওয়া যায়, তার কাছে প্রসঙ্গ পাল্টায়নি; বদলেছে কেবল পাঠকের ধৈর্য।

আলোচনা শুরু হয় জুলাই দিয়ে, কিন্তু দ্রুতই তা পৌঁছে যায় রাজনৈতিক কর্তৃত্বের এক পুরোনো প্রশ্নে। একটি সরকার আইনত ক্ষমতায় থাকতে পারে, তার হাতে পুলিশ, প্রশাসন ও আদালতও থাকতে পারে; কিন্তু বিপুলসংখ্যক মানুষ যখন তার ওপর থেকে সম্মতি সরিয়ে নেয়, তখন ক্ষমতা আর বৈধতা একই জায়গায় থাকে না। বন্দুক সরকারের হাতে থাকে, অথচ কর্তৃত্ব সরে যায় অন্যত্র।

সলিমুল্লাহ খানের কথায় সরকার জনগণকে অধিকার দান করে না; জনগণের অধিকার রক্ষা করার শর্তেই সরকার ক্ষমতা পায়। সংবিধানও আকাশ থেকে নেমে আসা কোনো পবিত্র বস্তু নয়; জনগণের রাজনৈতিক সম্মতিই তাকে কার্যকর করে। ফলে নির্বাচন দরকার বটে, কিন্তু নির্বাচন কোনো জাদুর বাক্স নয় যে, ভোট ঢুকিয়ে দিলে গণতন্ত্র বেরিয়ে আসবে। অর্থবহ নির্বাচনের আগে এমন পরিবেশ দরকার, যেখানে বিরোধিতা করা অপরাধ নয়, পরাজিত হওয়া মানে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া নয়।

পুলিশ প্রসঙ্গেও তিনি সম্পর্কটি উল্টে দেন। পুলিশ শাসকের রক্ষী নয়, নাগরিকের অধিকার রক্ষার প্রতিষ্ঠান। কথাটি শুনতে এতই স্বাভাবিক যে আমাদের বাস্তবতায় প্রায় কল্পকাহিনী মনে হয়।

এতক্ষণ গণঅভ্যুত্থান ও সংবিধান চলছিল। তারপর সলিমুল্লাহ খান হঠাৎ শিল্পায়ন, কারিগরি শিক্ষা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যান। এখানেই তার সাক্ষাৎকার পড়ার মজা। পাঠক ভেবেছিলেন রাজনীতি নিয়ে কথা হচ্ছে; খান জানিয়ে দেন উৎপাদনব্যবস্থাও রাজনীতি। পতাকা, ভূখণ্ড ও সরকার থাকলেই স্বাধীনতা পূর্ণ হয় না; জ্ঞান, প্রযুক্তি ও অর্থনীতিতে নির্ভরতা থাকলে স্বাধীনতার শরীর দাঁড়ায় বটে, হাঁটতে পারে না।

‘গণতান্ত্রিক পরিবেশ আজও আকাশ-কুসুম’ সাক্ষাৎকারে তিনি রাজনৈতিক গণতন্ত্রকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা থেকে আলাদা করেন না। সবাই ভোটে সমান হতে পারে, কিন্তু সম্পদ, শিক্ষা ও রাষ্ট্রে প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে যদি কয়েকজন অনেক বেশি সমান থাকে, তাহলে গণতন্ত্র ব্যালট বাক্সের বাইরে এসে হাঁপিয়ে ওঠে। আমরা অবাধ নির্বাচন চাই, কিন্তু নিজ দলের ভেতরে নির্বাচন চাই না। স্বাধীন গণমাধ্যম চাই, তবে আমাদের সমালোচনা করলে সেটি ষড়যন্ত্র। গণতন্ত্রকে সবাই ভালোবাসে। কিন্তু, শর্ত হলো সেটা যেন প্রতিবেশীর বাড়িতে থাকে।

জুলাইয়ের পর ‘নতুন বাংলাদেশ’ কথাটি জনপ্রিয় হয়েছিল। কিন্তু নতুন বলতে কী? নতুন প্রতিষ্ঠান, নতুন রাজনৈতিক সম্পর্ক, নাকি পুরোনো ঘরে নতুন পর্দা? সলিমুল্লাহ খানের কথোপকথনে এই ‘নতুন’-এর প্রতি স্থায়ী সন্দেহ আছে। কারণ, একজন শাসকের বিদায় আর শাসনের অভ্যাসের অবসান এক জিনিস নয়।

‘মৌলিক সংস্কারের ব্যাপারে আশাবাদী হতে পারছি না’ লেখায় সেই সংশয় আরও স্পষ্ট। নির্বাচন, রাজনৈতিক দল, আমলাতন্ত্র, ব্যাংক, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ—সংস্কারের তালিকা দীর্ঘ। কিন্তু সংস্কার নিয়ে আমাদের সুন্দর জাতীয় ঐকমত্য আছে: সংস্কার জরুরি, যদি কাটাছেঁড়া অন্যের শরীরে হয়। রাজনৈতিক দল গণতান্ত্রিক হবে, তবে নেতৃত্বের প্রশ্ন তোলা যাবে না। ব্যাংক সংস্কার হবে, তবে নিজের লোকের ঋণ নিয়ে এখন কথা না বলাই ভালো।

তবু সলিমুল্লাহ খান রাজনৈতিক দলকে পাশ কাটিয়ে গণতন্ত্র চান না। দল দরকার, কিন্তু দলের ভেতরের পুরোনো পৃষ্ঠপোষকতা অক্ষুণ্ণ রেখে শুধু নতুন নাম বসালে দোকানের সাইনবোর্ড বদলাবে, মালামাল নয়।

‘বিভাজনের রাজনীতি পুনর্জীবিত করার চেষ্টা হচ্ছে’ সাক্ষাৎকারে আসে শাহবাগ ও শাপলা। বাংলাদেশের জটিল সমাজকে দুটি বাক্সে ভরে ফেলা বেশ সুবিধাজনক। একজন যদি শাহবাগের সমালোচনা করেন, তাকে শাপলার বাক্সে পাঠানো যায়; শাপলা নিয়ে প্রশ্ন তুললে শাহবাগে। মাঝখানে দাঁড়ানোর জায়গা নেই। কারণ, মাঝখানে প্রশ্ন থাকে।

সলিমুল্লাহ খানের আপত্তি এই সরল বিভাজনে। যুদ্ধাপরাধের বিচার চাওয়া এবং বিচারপ্রক্রিয়ার ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন করা একইসঙ্গে সম্ভব। মানুষের ধর্মীয় অধিকার স্বীকার করা এবং ধর্মের নামে রাজনীতির সমালোচনাও সম্ভব। কিন্তু ‘একইসঙ্গে’ কথাটি আমাদের রাজনীতিতে বড়ই বিপজ্জনক। এতে দ্রুত কাউকে শত্রুপক্ষ ঘোষণা করা যায় না।

এখানেই বইটির বিভিন্ন কথোপকথন একে অন্যের কাছে ফিরে আসে। নির্বাচন দরকার, কিন্তু অর্থবহ নির্বাচন। দল দরকার, কিন্তু দলের ভেতর গণতন্ত্র লাগবে। ছাত্ররাজনীতি থাকবে, তবে দখলদারি নয়। সংবিধান থাকবে, তবে জনগণের ঊর্ধ্বে নয়। রাষ্ট্র থাকবে, তবে নাগরিকের ওপর চেপে বসা রাষ্ট্র নয়।

‘রতি ও বিরতি’ কোনো প্রস্তুত কর্মসূচি নয়। বরং একটি সময়ের ভেতরে দাঁড়িয়ে করা দীর্ঘ প্রশ্নোত্তর। এখানে জুলাই আছে, কিন্তু জুলাই একা নেই। সঙ্গে আছে ১৯৪৭, ১৯৭১, ১৯৯০, শাহবাগ, শাপলা ও দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রচর্চা। ফলে জুলাইকে একেবারে নতুন সূচনা ভাবার আনন্দে সলিমুল্লাহ খান মাঝেমধ্যে পানি ঢেলে দেন। ইতিহাসে কিছুই শূন্য থেকে শুরু হয় না।

তার বক্তব্যে আশা আছে, আশাবাদ কম। আশা প্রয়োজন, কারণ মানুষ পথ তৈরি করে। আশাবাদ একটু বিপজ্জনক। সেটি কাজ হওয়ার আগেই সাফল্যের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি লিখে ফেলে।

মাচাদোর পথিকের কাছে তাই আবার ফিরে যেতে হয়। পথ আগে থেকে নেই, হাঁটতে হাঁটতেই তৈরি হয়। কথাটির মধ্যে মুক্তি আছে, আবার বিপদও আছে। কারণ, সব হাঁটাই সামনে যায় না; কখনো মানুষ গোল পথে হেঁটে অলক্ষ্যেই বৃত্ত আঁকে, আবার পুরোনো জায়গায় ফিরে আসে। দূর থেকে দেখে অবশ্য সেটিকেও নতুন পথ মনে হতে পারে।

‘রতি ও বিরতি’ সেই পথের শেষ মানচিত্র নয়। বরং পথ চলার ফাঁকে ওঠা কয়েকটি অস্বস্তিকর প্রশ্নের খাতা। সলিমুল্লাহ খান পথ দেখিয়ে দেননি। তিনি বরং মাঝেমধ্যে পথিককে থামিয়ে জিজ্ঞেস করেছেন, আপনি কি নিশ্চিত, আমরা সামনে যাচ্ছি?