হারিয়ে যাওয়া ৫০০টির বেশি নদী-খালের সন্ধান যে বইয়ে

ইমরান মাহফুজ
ইমরান মাহফুজ

যে নদী খাল আমাদের বাঁচায়, সে নদী মারছি আমরা কতভাবে। ফলে আমরা আমাদেরই শেষ করে দিচ্ছি। সুজলা-সুফলা ও শস্য-শ্যামল বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে পরিচিতি পেয়েছে এখানকার অসংখ্য নদ-নদীর প্রবাহের কারণে। সেই চেনা নদী অচেনা খাল আজ বিপন্ন। অথচ দেশের জলসভ্যতার এক গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু ক্রমশ হারিয়ে যাওয়া অংশ হলো দীঘি, পুষ্করিণী ও প্রাচীন জলাশয়। নদী গবেষক ও লেখক মাহবুব সিদ্দিকী তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের নদ-নদী ও জলাশয় নিয়ে কাজ করছেন। তার গবেষণা ও লেখালেখিতে নদীর অপরিহার্য গুরুত্ব এবং হারিয়ে যাওয়া নদী ও খালগুলোর করুণ চিত্র উঠে এসেছে।

‘বাংলাদেশের বিলুপ্ত দীঘি-পুষ্করিণী জলাশয়’ শিরোনামের বইতে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে দলিলভিত্তিকভাবে সামনে আনার চেষ্টা করেছেন গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী। অনুসন্ধান করে বের করেছেন ৫০০-এর বেশি বিলুপ্ত নদী-খালের পথরেখা। বইটিতে বাংলাদেশের ইতিহাস, পরিবেশ ও লোকজ সভ্যতার এক বিস্মৃত অধ্যায়কে পুনরাবিষ্কারের চেষ্টা করেছেন তিনি।

বইটির প্রধান শক্তি হলো মাঠগবেষণা ও তথ্যনির্ভরতা। লেখক দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা বহু প্রাচীন দীঘি ও পুষ্করিণীর ইতিহাস খুঁজে বের করেছেন স্থানীয় মানুষ, পুরোনো দলিল, মানচিত্র ও স্মৃতিচারণের মাধ্যমে। অনেক জলাশয় আজ ভরাট হয়ে গেছে, অনেকগুলো আবার অবহেলায় বিলীন হয়েছে। এসব হারিয়ে যাওয়া জলাধারের নাম, অবস্থান, ইতিহাস ও সামাজিক গুরুত্ব তিনি যতটা সম্ভব সংরক্ষণ করার চেষ্টা করেছেন। ফলে বইটি শুধু গবেষণা নয়, এক অর্থে বাংলাদেশের হারিয়ে যাওয়া জলভূগোলের নথিও হয়ে উঠেছে।

বাংলার গ্রামীণ সমাজে দীঘি ও পুষ্করিণীর গুরুত্ব ছিল বহুমাত্রিক। এগুলো শুধু পানির উৎসই ছিল না; ধর্মীয় আচার, সামাজিক যোগাযোগ, কৃষিকাজ ও জনজীবনের কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। অনেক দীঘি রাজা-জমিদার বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করত জনকল্যাণের উদ্দেশ্যে। লেখক দেখিয়েছেন, এসব জলাশয় স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ধরে রাখা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। আধুনিক উন্নয়ন ও নগরায়ণের চাপে এই ঐতিহ্য কীভাবে হারিয়ে যাচ্ছে—বইটিতে তার একটি সতর্কতামূলক চিত্রও উঠে এসেছে।

বইটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইতিহাসের সঙ্গে ভূগোল ও পরিবেশচর্চার সংযোগ। লেখক কেবল জলাশয়ের নামের তালিকা দেননি; বরং সেগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্থানীয় কিংবদন্তি, স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহাসিক পটভূমিও তুলে ধরেছেন। এতে পাঠক বুঝতে পারেন যে প্রতিটি দীঘি বা পুষ্করিণী ছিল একেকটি সামাজিক-সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। অনেক ক্ষেত্রে এসব জলাশয়ের সঙ্গে মন্দির, মসজিদ বা প্রাচীন বসতির সম্পর্কও তিনি উল্লেখ করেছেন, যা ইতিহাস গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে।

ভাষা ও উপস্থাপনার দিক থেকেও বইটি সহজপাঠ্য। গবেষণাধর্মী হলেও লেখক জটিল একাডেমিক ভাষা ব্যবহার করেননি; বরং তথ্যকে সহজভাবে সাজিয়েছেন। ফলে সাধারণ পাঠকও বিষয়টি আগ্রহ নিয়ে পড়তে পারেন। পাশাপাশি বইটিতে স্থাননাম ও তথ্যের সংগ্রহ ভবিষ্যৎ গবেষকদের জন্য একটি ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে পারে।

তবে বইটির সীমাবদ্ধতার কথাও বলা যায়। বাংলাদেশের সব অঞ্চলের তথ্য সমানভাবে পাওয়া সম্ভব হয়নি, ফলে কিছু জায়গায় তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক উৎসের বিশদ বিশ্লেষণ আরও বিস্তৃত হতে পারত। তবু এসব সীমাবদ্ধতা বইটির সামগ্রিক গুরুত্বকে কমিয়ে দেয় না।

সব মিলিয়ে ‘বাংলাদেশের বিলুপ্ত দীঘি-পুষ্করিণী জলাশয়’ বইটি বাংলাদেশের পরিবেশ, ইতিহাস ও লোকজ ঐতিহ্য নিয়ে আগ্রহী পাঠকের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে উন্নয়নের নামে হারিয়ে যাওয়া জলাশয় শুধু একটি ভৌগোলিক পরিবর্তন নয়; বরং একটি সভ্যতার স্মৃতি মুছে যাওয়ার প্রক্রিয়া। সেই স্মৃতিকে সংরক্ষণের আহ্বানই যেন এই বইয়ের মূল বার্তা।