সহজ যোগব্যায়ামে যেভাবে দূর করতে পারবেন পিঠের ব্যথা
গাদাগাদি করে সিএনজিচালিত অটোরিকশার পেছনের সিটে বসা হোক বা শ্রেণিকক্ষের বেঞ্চে কিংবা ঝুঁকে বসে ল্যাপটপে কাজ করা—পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, আমাদের মেরুদণ্ড সবসময় আমাদের সাপোর্ট দিয়ে যায়। বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে প্রতিদিন সিঁড়ি বেয়ে পাঁচতলায় বাজারের জিনিসপত্র তোলা বা ট্রাফিক জ্যামে দীর্ঘসময় বসে থাকা সাধারণ অভ্যাস, সেখানে আমরা প্রায় স্বাভাবিকভাবেই পিঠের ব্যথাকে জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে মেনে নিয়েছি।
কিন্তু এই সমস্যাকে আমরা আর কতদিন উপেক্ষা করব?
সমস্যা উপেক্ষার পরিণতি
সাম্প্রতিক সময়ে মেরুদণ্ড–সংক্রান্ত নানা সমস্যা—দীর্ঘদিনের পিঠে ব্যথা, লাম্বার স্পন্ডাইলোসিস, সায়াটিকা কিংবা স্লিপড ডিস্ক—উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। আশঙ্কার বিষয় হলো, এসব সমস্যার প্রকোপ এখন বেশি দেখা যাচ্ছে তরুণদের মধ্যেই। কিন্তু কেন?
এর পেছনে কেবল ভুল আসবাবপত্র ব্যবহার বা ভারী জিনিস তোলাই দায়ী নয়। বরং দিনের বেশিরভাগ সময় ঝুঁকে বসে ডিজিটাল দুনিয়ায় ডুবে থাকার অভ্যাসই বড় কারণ। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় 'টেক্সট নেক'।
স্মার্টফোন বা ল্যাপটপ ব্যবহার করার সময় আমাদের মাথা স্বাভাবিকভাবেই সামনের দিকে ঝুঁকে থাকে। আর যখন প্রতিদিন দীর্ঘ সময় এভাবে কাটানো হয়, তখন ঘাড় ও উপরিভাগের মেরুদণ্ডে ওজনের হিসেবে প্রায় ৫–৬ কেজির অতিরিক্ত চাপ পড়ে। এর সঙ্গে যোগ হয় শারীরিক পরিশ্রমহীন জীবনধারা, অপুষ্টি, নিয়মিত ব্যায়ামের অভাব এবং সচেতনতার ঘাটতি।
এর ফলাফল হিসেবে ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে এমন এক প্রজন্ম, যাদের নিত্যসঙ্গী পিঠে ব্যথা, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পিঠ বেঁকে যাচ্ছে, আর সাময়িক স্বস্তির জন্য নিজেরাই ব্যথানাশক ওষুধের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
যোগব্যায়াম: মেরুদণ্ডের যত্নে প্রাচীন ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি
যোগব্যায়ামে মেরুদণ্ডকে কেবল শরীরের একটি কাঠামো হিসেবে দেখা হয় না; বরং একে দেহের চলনশক্তি ও প্রাণশক্তির কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সংস্কৃতে মেরুদণ্ডকে বলা হয় 'মেরুদণ্ডা', যার অর্থ জীবনের অক্ষ। মেরুদণ্ডকে সচল, মজবুত ও নমনীয় রাখা শুধু সুস্বাস্থ্য বজায় রাখার জন্যই জরুরি নয়, বরং মনোযোগ, মনের মেজাজ এবং মানসিক দৃঢ়তা ধরে রাখতেও এর ভূমিকা অপরিসীম।
তরুণ কিংবা প্রবীণ—শহরে বা গ্রামে—সবাই খুব সহজে অনুশীলন করতে পারেন এমন কিছু যোগব্যায়াম পদ্ধতি এখানে তুলে ধরা হলো, যা আপনার মেরুদণ্ডকে সুস্থ, সবল ও স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করবে।
কপোতাসন (কবুতর আসন)
আপনি মতিঝিলের অফিস ডেস্কে কাজ করুন বা গুলশানের আলিসান অফিসে পায়ের ওপর পা তুলে বসুন—আপনার হিপ এবং মেরুদণ্ডের নিম্নাংশ একই ধরনের চাপ অনুভব করে। এই চাপ কমানোর জন্য কপোতাসন বা কবুতর আসন অত্যন্ত উপকারী।
এই আসন হিপের নমনীয় অংশকে আরও নমনীয় করে তোলে এবং পিঠের নিম্নাংশকে শিথিল করতে সাহায্য করে। এটি বিশেষভাবে তাদের জন্য উপকারী, যাদের সায়াটিকা সমস্যা বা কোমরের পেশীর আঁট ধরা থাকে—যারা দীর্ঘ সময় ধরে বসে কাজ করেন, তাদের মধ্যে এটি খুব সাধারণ সমস্যা।
আসনটি ধীরে ধীরে করুন। হিপের নিচে সাপোর্টের জন্য প্রয়োজনে একটা কিছু রাখুন। ধীরে ধীরে গভীরভাবে শ্বাস নিন এবং পেশী শিথিল করুন।
পরামর্শ:
যদি হিপ মাটিতে স্পর্শ না করে, তাহলে হিপের নিচে একটি রোল করা তোয়ালে বা কুশন রাখুন।
উস্ট্রাসনা (উট আসন)
সামনের দিকে ঝুঁকানো কাঁধ, সামনের দিকে গলা বাড়িয়ে আর মেরুদণ্ড প্রশ্নবোধক চিহ্নের মতো করে বাঁকিয়ে আমরা প্রায় সময়ই থাকি। উস্ট্রাসন বা উট আসন এই সমস্যার সমাধান করে, বুককে প্রসারিত করে এবং পিঠের পেশী শক্তিশালী করে।
এই পেছনের দিকে হেলানো ব্যায়াম মেরুদণ্ডকে সোজা এবং প্রসারিত করতে সাহায্য করে, যা মেরুদণ্ডের সঠিক অবস্থান বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং স্পাইনাল ডিস্কে রক্তপ্রবাহ বাড়ায়। এছাড়াও এটি ফুসফুস প্রসারিত করে এবং শ্বাসপ্রশ্বাসে সহায়তা করে—যা দীর্ঘ সময় ডেস্কে বসে কাজ করা বা দীর্ঘদিন অবসাদে ভুগা ব্যক্তিদের জন্য বিশেষভাবে উপকারী।
সতর্কতা:
যাদের মেরুদণ্ডের নিম্নাংশে আঘাত থাকে বা অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপে ভুগে থাকেন, তাদের এই আসনটি না করাই শ্রেয়।
সার্ভাঙ্গাসনা (কাঁধে ভর দিয়ে দাঁড়ানো আসন)
এই আসনকে 'আসনের রানি' বলা হয়। এটি রক্তপ্রবাহকে সুষমভাবে পরিচালনা করে, মেরুদণ্ডের চাপ কমায় এবং মেরুদণ্ডের সঠিক অবস্থান বজায় রাখতে সাহায্য করে। পাশাপাশি, এটি পিঠের উপরিভাগ এবং কাঁধকে শক্তিশালী করে। এর পাশাপাশি মেরুদণ্ডকে আরামদায়কভাবে প্রসারিত ও শিথিল করতে সাহায্য করে।
মনে রাখার বিষয়: নতুন হলে অবশ্যই প্রশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে অনুশীলন করুন। পিরিয়ড চলাকালে বা ঘাড়ে আঘাত থাকলে এই আসন এড়িয়ে চলুন।
মেরুদণ্ডের যত্ন নিতে জিমের মেম্বারশিপ নিয়ে নিয়মিত অনুশীলন করা বা উপযুক্ত দামী চেয়ার ব্যবহারের কোনো প্রয়োজন নেই। দরকার শুধু সচেতন অভ্যাস ও নিয়মিত অনুশীলন। উদাহরণস্বরূপ, আমরা সাধারণভাবে যেভাবে বসি—পা ভাঁজ করে মাটিতে বসা (ওজন গোড়ালি বা পুরো পায়ের ওপর) বা পা ক্রস করে মাটিতে বসা—এমনটা করলে মেরুদণ্ডের সঠিক অবস্থান বজায় রাখতে সাহায্য করে। তাই মাটিতে বসুন, কিন্তু মেরুদণ্ড সোজা রাখুন।
আপনার শিরদাঁড়া সোজা রাখুন—অহংকার বা গর্বের জন্য নয়, বরং শারীরিক সুস্থতা এবং মেরুদণ্ডকে শক্তিশালী রাখার জন্য। এ ছাড়াও, আপনার সন্তানদেরও এই সচেতন ভঙ্গি এবং সঠিক বসার অভ্যাস শেখান।
অনুবাদ করেছেন শবনম জাবীন চৌধুরী