নাক ডাকার কারণ ভিটামিনের ঘাটতি নয় তো?

আয়মান আনিকা

নাক ডাকার সমস্যাটিকে আমরা সাধারণত খুব সামান্য বিষয় মনে করি। আমরা ধরে নিই হয়তো ঘুমানোর সময় মাথাটা ঠিকভাবে বালিশে ছিল না, ওজন বেড়ে গেছে বা ঠান্ডা লেগে নাক বন্ধ থাকায় এমন হচ্ছে।

তবে সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, রাতে নাক ডাকার পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ থাকতে পারে, যেটি বেশিরভাগ সময়ই আমরা হয়তো উপেক্ষা করি: শরীরে ভিটামিন ‘ডি’-এর ঘাটতি।

দেহের হাড় গঠনে ভিটামিন ‘ডি’-এর ভূমিকা সম্পর্কে আমরা জানি। কিন্তু এছাড়াও যে আমাদের শরীরে এই ভিটামিনের আরও কিছু প্রভাব রয়েছে, সেগুলো সম্পর্কে আমরা হয়তো খুব একটা জানি না। ভিটামিন ‘ডি’ পেশীকে মজবুত করতে, নার্ভ সিগনালিং বজায় রাখতে এবং ইনফ্ল্যামেশন প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং এই প্রতিটি বিষয়ই ঘুমের সময় শ্বাসপ্রশ্বাসের প্রবাহের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত।

আরও বিস্তারিত গবেষণায় দেখা গেছে, শরীরে ভিটামিন ‘ডি’-এর ঘাটতি থাকলে পেশীগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সেগুলো ঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। ঘুমের সময় আমাদের শ্বাসতন্ত্রের উপরিভাগ নিয়ন্ত্রণকারী পেশীগুলো মূলত সঠিক নিউরোমাসকুলার নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভর করে।

যখন এই পেশীগুলো তুলনামূলকভাবে কম সক্রিয় হয়ে পড়ে, তখন শ্বাসপ্রশ্বাসের সময় বাতাস স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারে না। ফলে বাতাসের প্রবাহ সুনির্দিষ্ট না হয়ে কিছুটা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে এবং গলার নরম টিস্যুগুলোর মধ্যে কম্পন সৃষ্টি করে।

এই কম্পনের ফলেই আমরা নাক ডাকার শব্দ শুনতে পাই। পেশীগুলো যত বেশি দুর্বল হয়, এই সমস্যার তীব্রতাও তত বাড়তে পারে। বিশেষ করে গভীর ঘুমের সময় এই কম্পন এবং নাক ডাকার শব্দ আরও বেশি প্রকট হয়ে ওঠে।

আর শরীরে যদি কোনো ধরনের প্রদাহ থাকে, তাহলে এই সমস্যাটি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। ভিটামিন ‘ডি’-এর সাধারণত অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তাই শরীরে এই ভিটামিনের ঘাটতি দেখা দিলে বিভিন্ন ধরনের প্রদাহ বাড়তে পারে।

ফ্রন্টিয়ার্স ইন নিউরোলজি জার্নালে প্রকাশিত এবং পাবমেড সেন্ট্রালে অন্তর্ভুক্ত একটি গবেষণাপত্র অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে শরীরে প্রদাহ থাকলে তা শ্বাসতন্ত্রের উপরিভাগের টিস্যুগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে তোলে। এর ফলে টিস্যুগুলো ফুলে যেতে পারে এবং ঘুমের সময় শ্বাসপ্রশ্বাস নিতে গেলে বাতাস চলাচলের পথ সংকুচিত হয়ে যেতে পারে। এর ফলে নাক ডাকার সম্ভাবনা বেড়ে যায় এবং সেই সঙ্গে শব্দের তীব্রতাও বাড়তে থাকে।

২০২৩ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে ভিটামিন ‘ডি’-এর স্বল্পতা, পেশীর দুর্বলতা এবং ঘুমের সময় শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত জটিলতার মধ্যে সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করা হয়। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, শরীরে ভিটামিন ‘ডি’-এর ঘাটতি থাকলে উপরের শ্বাসনালীর সংকোচনের ঝুঁকি বাড়ে এবং নিউরোমাসকুলার নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ে। এই বিষয়গুলো নাক ডাকা এবং অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়ার জন্য বিশেষভাবে দায়ী।

যদিও এই গবেষণায় শুধুমাত্র ভিটামিন ‘ডি’-এর অভাবের কারণেই যে নাক ডাকার সমস্যা হয়—এমনটি দাবি করা হয়নি। তবে এই সমস্যার জন্য যে ভিটামিন ‘ডি’-এর স্বল্পতার ভূমিকা রয়েছে, সে ব্যাপারে যথেষ্ট বায়োলজিক্যাল ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।

আমাদের অনেকের শরীরেই ভিটামিন ‘ডি’-এর ঘাটতি দেখা যায়। বিশেষ করে শহুরে জীবনযাত্রা, ঘরের ভেতরে কাজ করা, রোদের সংস্পর্শে কম থাকা, বায়ুদূষণ এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস—এসব কারণ মিলেই শরীরে এই ভিটামিনের স্বল্পতা তৈরি হয়। এই ভিটামিনের ঘাটতি থাকা অনেকের ক্ষেত্রেই শুরুতে কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না, ফলে বিষয়টি প্রায়ই অজান্তেই থেকে যায়।

শরীরে ভিটামিন ‘ডি’-এর ঘাটতি আছে কি না, তা শনাক্ত করা নাক ডাকা বা স্লিপ অ্যাপনিয়ার সরাসরি সমাধান নয়। তবে চিকিৎসকদের মতে, এই ভিটামিনের ঘাটতি পূরণ করার চেষ্টা পেশীশক্তিকে মজবুত করতে সাহায্য করে, প্রদাহ কমায় এবং কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ঘুমের সময় শ্বাসপ্রশ্বাসের বায়ু চলাচল আংশিকভাবে স্বাভাবিক হতে পারে।

শরীরে ভিটামিন ‘ডি’-এর মাত্রা নির্ণয়ের জন্য সাধারণত ব্লাড টেস্ট করা হয়। যদি এই ভিটামিনের মাত্রা কম পাওয়া যায়, তাহলে চিকিৎসকেরা প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় রোদের সংস্পর্শে থাকার পরামর্শ দেন। পাশাপাশি ভিটামিন ‘ডি’-সমৃদ্ধ খাবার, যেমন: চর্বিযুক্ত মাছ ও ফর্টিফাইড-সমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার কথা বলেন। ব্যক্তির প্রয়োজন অনুযায়ী অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের সাপ্লিমেন্টও গ্রহণের পরামর্শ দিয়ে থাকেন চিকিৎসকরা।

নাক ডাকা অনেক সময় একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে ধরা হয়, যা আমাদের জানান দেয়, শরীরে কিছু একটা ঠিকঠাক চলছে না। কিছু ক্ষেত্রে এর কারণ শুধু নাকের ভেতরের টিস্যুর সমস্যা বা ভুলভাবে বালিশে মাথা রাখা নয়; বরং ঘুমের সময় শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে শরীরে যে ভিটামিনগুলোর প্রয়োজন হয়, সেগুলোর ঘাটতিও এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।

অনুবাদ করেছেন শবনম জাবীন চৌধুরী