সিভির যেসব ভুলের কারণে ইন্টারভিউর ডাক আসে না

স্টার অনলাইন ডেস্ক

চাকরির জন্য সিভি বানালেন, পাঠিয়েও দিলেন চাকরিদাতার কাছে। এরপর একদিন যায়, এক মাস যায়, চলে যায় আরও লম্বা সময়ও, কিন্তু কোনো উত্তর আসে না।

চাকরি খুঁজেছেন, এমন প্রায় সবাই কোনো না কোনো সময় এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছেন। সবচেয়ে হতাশার বিষয় হলো, অনেক সময় নিজের সিভির দিকে তাকিয়ে বড় কোনো সমস্যা খুঁজে পাওয়া যায় না। পড়াশোনা আছে, অভিজ্ঞতা আছে, বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার তথ্যও আছে। তারপরও ইন্টারভিউ কল কেন আসছে না, তা যেন গোলকধাঁধায় ফেলে দেয়। কেউ কেউ তখন ধরে নেন, তাদের সিভি যথেষ্ট ভালো নয়। কিন্তু একটি সিভি ভালো হলেই যে সেটি নিয়োগদাতার চোখে পড়বে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। এর পেছনে আরও কিছু কারণ থাকতে পারে।

সব চাকরির জন্য একই সিভি

একটি সিভি তৈরি করে সেটি সব চাকরির জন্য ব্যবহার করার অভ্যাস আমাদের দেশে অনেক দেখা যায়। কিন্তু নিয়োগদাতারা সাধারণত খোঁজেন, আবেদনকারী তাদের নির্দিষ্ট পদের জন্য কতটা উপযুক্ত। ফলে একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য কার্যকর সিভি অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে ততটা গুরুত্বপূর্ণ নাও মনে হতে পারে। ধরুন, একটি প্রতিষ্ঠানে লেখালেখির অভিজ্ঞতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আরেকটিতে গবেষণার দক্ষতা। আপনি যদি দুটো ক্ষেত্রকেই সমান গুরুত্ব দিয়ে রাখেন, তাহলে কোনো ক্ষেত্রই আলাদা করে চোখে নাও পড়তে পারে। তাই চাকরির ধরন অনুযায়ী সিভির কিছু অংশ পরিবর্তন করা প্রয়োজন হতে পারে।

দায়িত্ব আছে, অর্জন নেই

সিভিতে প্রায়ই দেখা যায়, মানুষ কী কী কাজ করেছেন তার দীর্ঘ তালিকা দেওয়া আছে। কিন্তু সেই কাজের ফল কী ছিল, সেটি লেখা নেই। ধরুন, আপনি একটি প্রতিষ্ঠানের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিচালনা করেছেন। এই তথ্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নিয়োগদাতা আরও জানতে চাইতে পারেন, এর ফলে কী পরিবর্তন এসেছে। পাঠক বেড়েছে? অনুসারী বেড়েছে? কোনো প্রচারণা সফল হয়েছে? শুধু দায়িত্ব নয়, কাজের প্রভাবও তুলে ধরতে পারলে সিভি অনেক বেশি শক্তিশালী হয়।

গুরুত্বপূর্ণ তথ্য খুঁজে পাওয়া কঠিন

অনেক সময় সিভিতে এত তথ্য থাকে যে মূল বিষয়গুলোই হারিয়ে যায়। স্কুলজীবনের পুরস্কার, বহু বছর আগের কর্মশালা, অপ্রাসঙ্গিক প্রশিক্ষণ সবকিছু একসঙ্গে যুক্ত করতে করতে সিভি দীর্ঘ হয়ে যায়। ফলে নিয়োগদাতার চোখে প্রথমে পড়ার কথা ছিল যে তথ্যগুলো, সেগুলোই আড়ালে চলে যায়। সিভি পড়ার জন্য সাধারণত খুব বেশি সময় দেওয়া হয় না। তাই কোন তথ্যটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সেটি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা জরুরি।

অভিজ্ঞতা আছে, কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু নেই

নিয়োগদাতারা প্রায়ই দেখতে চান একজন ব্যক্তি নিজেকে কতটা হালনাগাদ রাখছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি বা পুরোনো অভিজ্ঞতা অবশ্যই মূল্যবান। কিন্তু কয়েক বছর ধরে নতুন কোনো প্রশিক্ষণ, দক্ষতা বা কাজের অভিজ্ঞতা যুক্ত না হলে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে প্রযুক্তি, গণমাধ্যম বা করপোরেট খাতের মতো দ্রুত পরিবর্তনশীল ক্ষেত্রগুলোতে নতুন কিছু শেখার আগ্রহও গুরুত্ব পায়।

আবেদন করছেন ভুল জায়গায়

কখনো কখনো সমস্যা সিভিতে নয়, আবেদন করার জায়গায়। তিন বছরের অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়েছে, কিন্তু আবেদন করছেন সদ্য স্নাতক একজন। অথবা কাজটির সঙ্গে নিজের দক্ষতার মিল খুব কম। এমন পরিস্থিতিতে সিভি যতই ভালো হোক, ইন্টারভিউ কল পাওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। অনেক চাকরিপ্রার্থী প্রতিদিন যত বেশি সম্ভব আবেদন পাঠানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু লক্ষ্যভিত্তিক আবেদন সাধারণত বেশি কার্যকর হয়।

ছোট ভুলের বড় প্রভাব

ভুল ফোন নম্বর, পুরোনো ই-মেইল ঠিকানা, কাজ না করা পোর্টফোলিও লিংক কিংবা বানান ভুল—এসব কারণে সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার ঘটনাও কম নয়। নিয়োগদাতার দৃষ্টিতে এগুলো শুধু ভুল নয়, এগুলো আবেদনকারীর মনোযোগ ও পেশাদারিত্ব সম্পর্কেও ধারণা তৈরি করে। তাই সিভি পাঠানোর আগে কয়েকবার দেখে নেওয়া ভালো। সম্ভব হলে অন্য কাউকে দিয়েও পড়িয়ে নেওয়া যেতে পারে।

শুধু সিভি পাঠিয়েই থেমে যাওয়া

চাকরি খোঁজার পুরো প্রক্রিয়াটিকে অনেকেই শুধু সিভি পাঠানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেন। কিন্তু বাস্তবে এর বাইরেও অনেক কিছু আছে। ইন্টার্নশিপ, প্রশিক্ষণ, সেমিনার, পেশাগত অনুষ্ঠান কিংবা পরিচিত মানুষের মাধ্যমে অনেক সময় এমন সুযোগের খবর জানা যায়, যা সাধারণ চাকরির বিজ্ঞাপনে আসে না। তাই চাকরি খোঁজা মানে শুধু আবেদন করা নয়, নিজের ক্ষেত্রের মানুষদের সঙ্গেও যুক্ত থাকা।

প্রতিযোগিতাটাও বাস্তব

একটি চাকরির জন্য কয়েকশ আবেদন জমা পড়া এখন খুবই সাধারণ ঘটনা। সেখানে বহু যোগ্য মানুষ আবেদন করেন। ফলে ইন্টারভিউ কল না পাওয়া মানেই যে আপনার সিভিতে বড় কোনো সমস্যা আছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। কখনো কখনো বিষয়টি শুধু প্রতিযোগিতারও হতে পারে।

ইন্টারভিউ কল না এলে নিজের যোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ করা সহজ। কিন্তু সব দায় সিভির ওপর চাপানোর আগে পুরো বিষয়টি একটু ভেবে দেখা প্রয়োজন। অনেক সময় ছোট কিছু পরিবর্তন, আরও লক্ষ্যভিত্তিক আবেদন এবং নিজের অভিজ্ঞতাকে আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরাই পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। আর কখনো কখনো দরকার হয় শুধু আরও কিছু সময় ও ধৈর্যের।