শেষ দৃশ্যের পরেও থেকে যায় তার অনুভূতি

মাহমুদ নেওয়াজ জয়
মাহমুদ নেওয়াজ জয়

হুমায়ুন ফরীদির নামটা বাংলাদেশের অভিনয় জগতে শুধু একজন অভিনেতাকে বোঝায় না। এটা এমন এক অভিজ্ঞতা, যেটা ব্যাখ্যা করতে গেলে শব্দগুলো একটু ছোট হয়ে যায়। তাকে ভিলেন বলা যায়, প্রতিনায়কও বলা যায়। কিন্তু কোনো সংজ্ঞাই তার পুরোটা ধরতে পারে না। কারণ তিনি চরিত্রের মধ্যে থাকতেন না, চরিত্রকে নিজের ভেতরে নিয়ে নিতেন। আর সেই ভেতর থেকে যা বেরিয়ে আসত, সেটাই দর্শকের মনে গভীর ছাপ রেখে যেত।

জন্মদিনে (২৯ মে) তাকে মনে করতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি বোঝা যায়, তিনি কোনো নির্দিষ্ট ভূমিকায় সীমাবদ্ধ ছিলেন না, তিনি ছিলেন নিজেই এক ধরনের ফেনোমেনা, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

ফরীদির অভিনয়ের সবচেয়ে অদ্ভুত এবং শক্তিশালী দিক ছিল তার উপস্থিতির আগেই তৈরি হওয়া প্রভাব। অনেক সময় দেখা যেত, তিনি দৃশ্যে ঢোকার আগেই দর্শক একটু থমকে গেছে। যেন কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। কিন্তু কী ঘটবে সেটা বোঝা যাচ্ছে না। এই অনিশ্চয়তাটাই তার অভিনয়ের একটা অংশ হয়ে যেত। তিনি আসতেন ধীরে, কখনো তাড়াহুড়ো করতেন না, কিন্তু সেই ধীরতার মধ্যে কোনো দুর্বলতা ছিল না। বরং সেটা ছিল এমন এক নিয়ন্ত্রণ, যেন পুরো দৃশ্যটা তার আসার জন্যই অপেক্ষা করছে।

তার চোখের দিকে তাকালে সবচেয়ে বেশি বোঝা যেত তিনি কীভাবে চরিত্র ‘প্লে’ করেন। সেখানে কোনো অতিরঞ্জন ছিল না, কোনো স্পষ্ট সংকেতও ছিল না। তবু দর্শক বুঝে যেত, এখানে কিছু একটা লুকানো আছে। তিনি ভয় দেখাতেন না, কিন্তু ভয়ের আবহ তৈরি হয়ে যেত। তিনি রাগ দেখাতেন না, কিন্তু রাগের আবহ অনুভূত হতো। তার চোখ যেন কথা বলত না, বরং চুপচাপ পরিস্থিতিটা বদলে দিত। এই জায়গাটাই তাকে আলাদা করেছে। কারণ তিনি শব্দ উচ্চারণের আগেই অনুভূতিকে দাঁড় করিয়ে দিতেন।

Humayun Faridi
ছবি: সংগৃহীত

বাংলা পর্দায় ভিলেন চরিত্র বহুবার এসেছে। কিন্তু বেশিরভাগ সময় তারা ছিল সহজভাবে বোঝার মতো। তাদের আচরণ, সংলাপ, উপস্থিতি অনেকটাই অনুমানযোগ্য ছিল। ফরীদি সেই জায়গাটাকেই ভেঙে দিয়েছিলেন। তার চরিত্র কখন কী করবে, কী বলবে, সেটার কোনো আগাম ধারণা দর্শকের থাকত না। এই রোমাঞ্চ তৈরির ক্ষমতাই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। তিনি চরিত্রকে স্থির রাখতেন না, বরং প্রতিটি মুহূর্তে নতুন করে তৈরি করতেন। তাই তার সামনে থাকা দর্শক কখনোই নিরাপদ বোধ করত না, বরং সতর্ক হয়ে থাকত।

এই অনিশ্চয়তার ভেতরেই ছিল তার সবচেয়ে বড় শক্তি। তিনি সংলাপকে আগেই তৈরি করা কোনো জিনিস হিসেবে ব্যবহার করতেন না। তিনি সংলাপকে মুহূর্তের মধ্যে জন্ম নিতে দিতেন। তাই তার বলা কথা অনেক সময় এমনভাবে আসত, যা আগে থেকে অনুমান করা যেত না। এই অপ্রত্যাশিত আচরণই তার চরিত্রকে জীবন্ত করে তুলত। দর্শক বুঝে উঠতে পারত না, তিনি পরের মুহূর্তে শান্ত থাকবেন নাকি হঠাৎ বদলে যাবেন। এই দোলাচলই তাকে অত্যন্ত বাস্তব করে তুলত।

তার অভিনয়ের আরেকটা বড় বৈশিষ্ট্য ছিল সংযম। তিনি কখনোই অতিরিক্ত কিছু করতেন না। বরং তিনি জানতেন, কোথায় থামতে হবে। অনেক সময় একটি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বা অল্প কিছু সময়ের নীরবতা দিয়ে তিনি পুরো দৃশ্যকে অন্য দিকে নিয়ে যেতেন। এই সংযম তাকে আলাদা করেছে। কারণ তিনি জানতেন, সবকিছু বলার প্রয়োজন নেই, কিছু বিষয় অনুভব করাতে পারাই যথেষ্ট।

Humayun Faridi
ছবি: সংগৃহীত

তার চরিত্রগুলো কখনো একরকম ছিল না। তারা ছিল ভাঙা, জটিল, অনেক স্তরের মধ্যে ঢাকা। এই জটিলতা দর্শককে পুরোপুরি দূরে সরিয়ে দিত না, বরং কাছে টেনে নিত। কারণ সেখানে কোথাও না কোথাও এক ধরনের মানবিক ভাঙন থাকত। সেই ভাঙনই প্রশ্ন তৈরি করত। একজন মানুষ কেন এমন হলো, কী তাকে এই জায়গায় নিয়ে এলো, এই প্রশ্নগুলোই তার চরিত্রকে গভীর করে তুলত।

তার অভিনীত কিছু চরিত্র এই বহুমাত্রিকতার সবচেয়ে পরিষ্কার উদাহরণ। দহন (১৯৮৪) সিনেমায় তিনি ছিলেন জীবনযুদ্ধে বিপর্যস্ত এক বেকার যুবক, যেখানে হতাশা আর বাস্তবতার চাপ একসঙ্গে ভেঙে পড়েছিল। সন্ত্রাস (১৯৯১) সিনেমায় তিনি রাজাকার ও অপরাধীর চরিত্রে এমন এক অন্ধকার দেখিয়েছিলেন, যেখানে ইতিহাস আর ব্যক্তিগত বিকৃতি একসঙ্গে মিশে যায়।

ত্যাগ (১৯৯২) চলচ্চিত্রে তিনি ছিলেন সাধু বেশে লুকানো খুনী, যেখানে বাইরের পবিত্রতা আর ভেতরের হিংস্রতা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকে। ঘৃণা (১৯৯৪) সিনেমায় দুর্নীতিগ্রস্ত মাফিয়া রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি ক্ষমতার বিকৃতি খুব ঠান্ডা মাথায় তুলে ধরেছিলেন। বিশ্বপ্রেমিক (১৯৯৫) ছবিতে তার চরিত্র সাইকোপ্যাথের মনস্তত্ত্বে ঢুকে যায়, যেখানে বাস্তবতা আর বিকারের সীমা আলাদা করা যায় না। ভণ্ড (১৯৯৮) চলচ্চিত্রে তিনি আবার সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পথে হাঁটেন, যেখানে কমেডির মধ্যেও অস্বস্তি লুকানো থাকে, আর হাসির ভেতরেও একটা অদৃশ্য চাপ কাজ করে।

Humayun Faridi
ছবি: সংগৃহীত

এই চরিত্রগুলোর দিকে তাকালে বোঝা যায়, ফরীদি কখনোই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকেননি। তিনি প্রতিটি চরিত্রকে আলাদা করে নির্মাণ করেছেন। কিন্তু সেই আলাদা চরিত্রগুলোর ভেতরেও একটা অভিন্ন ছায়া থাকে, যা একান্তই  তার। এই ছায়াই তাকে ফেনোমেনন বানিয়েছে।

টেলিভিশনের ক্ষেত্রেও তার প্রভাব সমানভাবে শক্তিশালী। সংশপ্তক (১৯৮৯) নাটকে সেই ‘কানকাটা রমজান’ চরিত্র আজও দর্শকের মনে আছে। সেখানে তিনি ছিলেন নির্মম, কিন্তু পুরোপুরি একরৈখিক ছিলেন না। তার ভেতরেও কোথাও না কোথাও একটি ভাঙন ছিল, যা চরিত্রটিকে আরও বাস্তব করে তুলেছিল। প্রেত (২০০১) নাটকে তিনি দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করেন। একদিকে ছিলেন জ্ঞানী প্রফেসর, আবার অন্যদিকে শয়তান উপাসকের মতো এক রহস্যময় উপস্থিতি। এই দুই বিপরীত চরিত্র একসঙ্গে বহন করার ক্ষমতা একজন শক্তিশালী অভিনেতারই থাকে। বিষকাঁটা (২০০২) নাটকে তিনি প্রতিশোধে উন্মত্ত, প্রায় ভেঙে পড়া এক মানুষের রূপ নিয়েছিলেন, যেখানে প্রতিটি সংলাপের ভেতরে অস্থিরতা লুকানো ছিল।

এসব চরিত্রের মধ্যে একটা মিল খুব স্পষ্ট। ফরীদি কখনোই সহজ পথ নেননি। তিনি সবসময় চরিত্রের ভেতরের অজানা জায়গাগুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন। সেই জায়গাগুলোই তাকে ব্যতিক্রমী অভিনেতায় পরিণত করেছে। তার অভিনয়ে কোনো কিছুই সরলভাবে উপস্থাপিত হয়নি, বরং প্রতিটি মুহূর্তে একটা অদৃশ্য স্তর কাজ করেছে, যা দর্শককে ভাবতে বাধ্য করেছে।

Humayun Faridi
ছবি: সংগৃহীত

তার শরীরী ভাষাও ছিল আলাদা। তিনি শরীরকে ব্যবহার করতেন চরিত্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য, গিমিক প্রদর্শনের জন্য নয়। তার দাঁড়ানোর ভঙ্গি, হাঁটার গতি বা সামান্য নড়াচড়াও অনেক কিছু বলে দিত। অনেক সময় মনে হতো, তিনি শুধু দাঁড়িয়ে আছেন, কিন্তু সেই দাঁড়িয়ে থাকাটাই পুরো দৃশ্যের ভারসাম্য বদলে দিত। সহশিল্পীরাও তার সামনে দাঁড়িয়ে অন্যভাবে পারফর্ম করতেন, কারণ তার উপস্থিতি নিজেই আলাদা একটি আবহ তৈরি করত।

ফরীদি চরিত্রকে কখনো অনুমানযোগ্য রাখেননি। এই দক্ষতাই তাকে আলাদা করেছে। এতে করে তার অভিনীত চরিত্রগুলো শুধু গল্পের অংশ হয়ে থাকত না, বরং বাস্তব মানুষের মতো আচরণ করত, যেখানে সবকিছু আগে থেকে জানার উপায় থাকে না।

হুমায়ুন ফরীদি তাই শুধু একজন অভিনেতা নন। তিনি এমন একজন শিল্পী, যাকে ব্যাখ্যা করা যায়, কিন্তু পুরোপুরি ধরা যায় না। তার অভিনয় যুক্তির বাইরে গিয়ে অনুভবের জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে।

কেউ তাকে ভিলেন বলে, কেউ বলে প্রতিনায়ক। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই সব সংজ্ঞাই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়। কারণ হুমায়ুন ফরীদি শেষ দৃশ্যের মানুষ নন। তিনি সেই অনুভূতি, যা শেষ দৃশ্যের পরেও থেকে যায়। আর সেটাই তাকে শুধু অভিনেতা নয়, এক ফেনোমেনন বানিয়ে দেয়।