ব্রেকআপের পর ক্লোজার: আসলেই দরকার নাকি মিথ?

অনিন্দিতা চৌধুরী
অনিন্দিতা চৌধুরী

‘সবই ঠিক আছে, কিন্তু একবার যদি জানতে পারতাম...’, ‘একবার চেষ্টা করলে কি ঠিক হতো?’ কিংবা ‘আচ্ছা, আমাদের গল্পের শেষটা কি সত্যিই হয়ে গেছে?’

এমন বহু দীর্ঘশ্বাসের সুর আর ক্রমশ বাড়তে থাকা আফসোসবাণীর আলাপ শোনা যায়, যখন একটি প্রণয়ঘটিত সম্পর্কে যেকোনো এক পক্ষ ইতি টানেন। অন্য পক্ষ তখন ধোঁয়াশার মধ্যে হাতড়াতে থাকেন বহু না পাওয়া উত্তর, আর সেইসঙ্গে থেকে যাওয়া এক রাশ মন খারাপের ঝুলি। তখন তার জীবনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুই সেই একটিমাত্র প্রশ্নকে পাহাড়সম বানিয়ে উত্তর খোঁজার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। এর মধ্যে দিনরাত এক হয়ে যাচ্ছে, কাজকর্মের বারোটা বাজছে—আর হয়তো একইসঙ্গে অনেক সান্ত্বনা দিয়েও হার মানতে বাধ্য হচ্ছেন ব্যক্তিটির প্রিয়জনেরা।

কিন্তু এই উত্তর, রহস্যের শেষ চাবিটি বা এককথায় বললে বেশ পরিচিত একটি শব্দ ‘ক্লোজার’ পাওয়া কি আসলে সম্ভব? আর যদি না ক্লোজার একেবারে না-ই পাওয়া যায়, সেক্ষেত্রে বাস্তবতা কোথায় এসে দাঁড়ায়? এমন বিভিন্ন প্রশ্নের অলিগলিতে ঢুঁ মেরে আসা যাক।

Closure
ছবি: সংগৃহীত

কখনো হ্যাঁ, কখনো না

জগতের বেশিরভাগ কথাই যখন একটি ফর্মুলায় বেঁধে দিতে পারবেন না, তখন মানুষ সাধারণত এই অতি সুবিধাজনক তবে বেশ মানানসই এই সূত্রের কাছে এসে ধরনা দেয়। কারো সঙ্গে সম্পর্ক কেন ভেঙেছে, এর একটা মোটামুটি উত্তর কিন্তু সম্পর্ক ভাঙার সময়ই পাওয়া যায়। কিন্তু কেউ কেউ সেটিতে সন্তুষ্ট হতে পারেন না। তাদের মনে আরও প্রশ্ন ঘুরপাক খায়, মেলানোর থাকে আরও বহু অঙ্ক। সেসব অঙ্কের তাড়ায় ক্রমশ জর্জরিত হতে থাকে তাদের মন, মনের স্বস্তি এবং জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্র।

Closure
ছবি: সংগৃহীত

ক্লোজার কি তবে কোনো মিথ?

তবে হ্যাঁ, ক্লোজারকে একেবারে মিথের পর্যায়ে ফেলে দেওয়াটাও ভুল হবে। কেননা এই বিষয়টি বেশিরভাগই নির্ভর করে, অপর পক্ষের ওপর। তিনি ব্যক্তি হিসেবে ঠিক কেমন, তিনি কি হুট করে চলে যাওয়ার দলে নাকি খুব স্পষ্টভাবে আলোচনার মাধ্যমে ‘ক্লোজার’ দিয়ে তারপর যাওয়ার দলে—সেটিই এখানে মুখ্য বিষয়। আবার দ্বিতীয় পক্ষ, যিনি ক্লোজারের আশায় বসে রয়েছেন, তার মনস্তত্ত্বও এখানে বেশ ভূমিকা রাখে। কেউ কেউ নিজের মতো করে খুব সহজেই এসব ব্যাপারে উত্তর বানিয়ে নিতে পারেন। তারা কিছুটা অন্যের জায়গায়, কিছুটা নিজের জায়গায় থেকে সম্ভাব্য কারণগুলো খতিয়ে মানানসই একটা উত্তর ভেবে নিয়ে সাবলীলভাবে জীবনে এগিয়ে যান। সমস্যাটা হয় দ্বিতীয় পক্ষের, যারা কি না, প্রশ্নের পর প্রশ্নের মালা গাঁথেন এবং ভেবেই বসেন, সম্পর্ক ভাঙার আনুষ্ঠানিকতা যিনি করেছেন, তার কাছেই সবকিছুর উত্তর।

অনেকক্ষেত্রে ক্লোজার আবার শুধু অজুহাতের ভূমিকাও পালন করে। মানে কেউ যদি আসলে সম্পর্কটা শেষ না করতেই চায় এবং তার মনে থেকে যাওয়া আবেগী ব্যাপারস্যাপার তাকে অশান্তিতে রাখে—তখন তিনি ‘ক্লোজার’কে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে নিজেকে ব্যস্ত করে তোলেন। একটি সম্পর্ক যে শেষ হয়েছে, তার অস্বীকৃতিতেও গাঁথা থাকে এই আরোপিত ক্লোজারের চাহিদাখানা। তাই আদতে ক্লোজারের দরকার আছে কি নেই, তার উত্তরও একইরকম। আপনি নিজে ছাড়া সত্যিকার অর্থে কেউ আপনাকে আসলে কাঙ্ক্ষিত উত্তরটি দিতে পারবেন না। কেননা যতক্ষণ না আপনি বিশ্বাস করছেন, ততক্ষণ সবই অহেতুক।

Closure
ছবি: সংগৃহীত

‘আঁকড়ে থেকো না কিছু’

রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর এই বহু চেনা সত্যের মতো কথাটিই সবশেষে বলতে হয়। যদি বা কোনো গল্প আপনার মনমতো শেষ নাও হয়, এর মানে এই নয় গল্প শেষ হয়নি। মানুষ যতই নিজের জীবনকে তার খেয়ালখুশি মতো পরিচালনা করতে চাক না কেন, তার কিছু সুতো থাকে অন্যের হাতেও। ফলে ‘ক্লোজার’ পাওয়া কিংবা না পাওয়াটুকুও নির্ভরশীল হয় অন্য পক্ষের ইচ্ছা ও চাহিদার ওপর। হয়তো কেউ খুব কঠিনভাবে সম্পর্ক শেষের পর যোগাযোগের সব রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে কিংবা তার সঙ্গে যোগাযোগ মানেই আসলে আপনার কাছে অপমানসুলভ। এসব ক্ষেত্রে যোগাযোগের চেষ্টা না করাটাই ভালো। যতই ক্লোজারের লোভ মনের মধ্যে সুড়সুড়ি দিক না কেন, নিজের মস্তিষ্ককে শান্ত করুন, মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করুন অন্য কোথাও। যতই চেষ্টা করে যাই না কেন, সব সম্পর্কের শেষটুকু সবসময় কেউ বুঝতে পারে না, আর সে না বোঝাও জীবনের বহমান স্বভাবের মতোই স্বাভাবিক।