বাংলা বারো মাসের নাম কীভাবে এলো?
ভারতীয় উপমহাদেশে নক্ষত্র, গ্রহ, রাশি ও জ্যোতির্বিদ্যার প্রভাব কখনোই শুধু ধর্ম বা ব্যক্তিগত বিশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। হাজার বছর ধরে রাষ্ট্র পরিচালনা, অর্থনীতি, কৃষি, যুদ্ধ, আইন, সাহিত্য, স্থাপত্য এবং মানুষের দৈনন্দিন সময়বোধও গড়ে উঠেছে আকাশের দিকে তাকিয়ে।
প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ভারতে রাজারা রাজজ্যোতিষী নিয়োগ করতেন। গ্রহণ, ধূমকেতু বা গ্রহের বিশেষ অবস্থানকে রাষ্ট্রের ভবিষ্যতের সংকেত হিসেবে দেখা হতো। রাজ্যাভিষেক ও যুদ্ধযাত্রার শুভক্ষণ ঠিক করা হতো নক্ষত্র দেখে। মুসলিম সালতানাতের শাসকেরাও জ্যোতির্বিদদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। এর ফলে পারস্য, আরব ও ভারতীয় জ্ঞান মিলে গড়ে ওঠে এক ইন্দো-ইসলামিক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঐতিহ্য।
বাংলাতেও মুঘল আমলে স্থানীয় জ্যোতিষীরা রাজদরবারে কাজ করতেন। এই রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা নক্ষত্রভিত্তিক পঞ্জিকাকে টিকিয়ে রাখার একটি বড় কারণ ছিল। কৃষকের বীজ বোনা ও ফসল কাটার সময়, এমনকি রাজস্ব আদায়ের সূচিও নির্ধারিত হতো নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ ও পঞ্জিকার ভিত্তিতে।
এই দীর্ঘ ঐতিহ্যের প্রভাব থেকে বাংলা বাদ পড়েনি। বরং বাংলার নিজস্ব সন-পঞ্জিকা, বিশেষ করে বারো মাসের নামকরণ, এই জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ও জ্যোতিষীয় চিন্তাধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ ফল।
নক্ষত্র থেকেই কি মাসের নাম
প্রাচীন ভারতীয় জ্যোতির্বিদরা চাঁদ ও সূর্যের অবস্থান নির্ণয়ের জন্য আকাশপথকে ২৭টি নক্ষত্রখণ্ডে ভাগ করেছিলেন। এই নক্ষত্রগুলোর নাম থেকেই ধীরে ধীরে বাংলা মাসগুলোর নাম এসেছে বলে প্রচলিত মত রয়েছে।
যে মাসে পূর্ণিমার চাঁদ কোনো নির্দিষ্ট নক্ষত্রের কাছাকাছি অবস্থান করত, সেই নক্ষত্রের নামেই মাসটির পরিচিতি তৈরি হয়। ফলে প্রতিটি মাসের নাম একটি নির্দিষ্ট নক্ষত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত। সময়ের সঙ্গে সেই নক্ষত্রের অবস্থান, দৃশ্যমানতা ও প্রতীকী অর্থ মানুষের সাংস্কৃতিক কল্পনায়ও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
বৈশাখ
বৈশাখ নামের উৎপত্তি বিশাখা নক্ষত্র থেকে। এটি আকাশে তুলা ও বৃশ্চিক নক্ষত্রমণ্ডলীর সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত। এই নক্ষত্রকে লক্ষ্য অর্জন, অগ্রগতি ও নতুন শুরুর প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। তাই নতুন বছরের প্রথম মাস বৈশাখ।
জ্যৈষ্ঠ
জ্যৈষ্ঠ নামের উৎস জ্যেষ্ঠা নক্ষত্র। এর প্রধান তারা অ্যান্টারেস, যা বৃশ্চিক নক্ষত্রমণ্ডলীর উজ্জ্বল লালাভ হৃদয়তারা। প্রাচীন ঐতিহ্যে জ্যেষ্ঠা পরিপক্বতা, নেতৃত্ব ও দায়িত্ববোধের প্রতীক।
গ্রীষ্মের প্রখরতা এবং ফলের পরিপক্বতার সময় হিসেবে জ্যৈষ্ঠ মাসের সঙ্গেও এই ধারণার একটি মিল দেখা যায়।
আষাঢ়
আষাঢ় এসেছে উত্তরাষাঢ়া নক্ষত্র থেকে। এটি ধনু ও মকর নক্ষত্রমণ্ডলীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত। এই নক্ষত্রের সঙ্গে দৃঢ়তা, সহিষ্ণুতা ও নৈতিক সংকল্পের ধারণা যুক্ত।
বর্ষার শুরুতে আষাঢ়ে প্রকৃতির প্রতিকূলতার মুখোমুখি হওয়ার যে বাস্তবতা, তার সঙ্গে এই প্রতীকী অর্থেরও মিল রয়েছে।
শ্রাবণ
শ্রবণা নক্ষত্র থেকে এসেছে শ্রাবণ নামটি। এটি ঈগল নক্ষত্রমণ্ডলীর উজ্জ্বল তারা এল্টেয়ারের সঙ্গে সম্পর্কিত। শ্রবণা নক্ষত্রের প্রতীক কান। 'শ্রবণা' শব্দের মধ্যেই 'শ্রবণ' বা শোনার ধারণা রয়েছে।
পৌরাণিক মুনি-ঋষিরা শ্রুতির মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করতেন। তাই জ্ঞানার্জন, মনোযোগ ও প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবেও এই নক্ষত্রকে কল্পনা করা হয়েছে।
ভাদ্র
ভাদ্র মাসের নাম এসেছে ভাদ্রপদ নক্ষত্র থেকে। এর অবস্থান পেগাসাস ও অ্যান্ড্রোমিডা নক্ষত্রমণ্ডলীর অঞ্চলে।
সংস্কৃত 'ভাদ্র' শব্দের অর্থ মঙ্গলময়, কল্যাণকর বা শুভ। 'পদ' অর্থ স্থান বা চরণ। ফলে ভাদ্রপদ শব্দের অর্থ দাঁড়ায় 'কল্যাণময় পদক্ষেপ' বা 'সুদিনের আগমন'।
ঋতুচক্রে ভাদ্র বর্ষার শেষ এবং শরতের আগমনের সময়। বর্ষা থেকে শরতে উত্তরণের মতোই এই মাসকে আত্মিক রূপান্তরের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ভাদ্রপদ নক্ষত্র আত্মজিজ্ঞাসা, গভীর চিন্তা ও অন্তর্দর্শনের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত।
আশ্বিন
আশ্বিন নাম এসেছে অশ্বিনী নক্ষত্র থেকে। মেষ নক্ষত্রমণ্ডলীর শেরাটান ও মেসারথিম তারার সঙ্গে এই নক্ষত্রের সম্পর্ক রয়েছে।
অশ্বিনীকে প্রাণশক্তি, দ্রুততা, আরোগ্য ও নতুন শুরুর প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। শরতের নির্মল আকাশ ও উৎসবের আবহের সঙ্গে এই অর্থের মিলও রয়েছে।
কার্তিক
কার্তিকের নামের উৎস কৃত্তিকা নক্ষত্রগুচ্ছ। আন্তর্জাতিকভাবে এই নক্ষত্রগুচ্ছের পরিচিতি প্লেইয়াডিস নামে। ঋগ্বেদের ঋষিরা একে অগ্নির সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। সিদ্ধান্তজ্যোতিষে এটি কৃত্তিকা নামে পরিচিত।
বৃষ নক্ষত্রমণ্ডলীতে অবস্থিত এই তারাগুচ্ছ বহু সভ্যতায় গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কৃত্তিকাকে অগ্নিশক্তি, সাহস ও শুদ্ধিকরণের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
অগ্রহায়ণ
অগ্রহায়ণ মাসের সঙ্গে যুক্ত মৃগশিরা নক্ষত্র। এটি ওরায়ন বা কালপুরুষ নক্ষত্রমণ্ডলের মাথার অংশে অবস্থিত মেইসা তারার সঙ্গে সম্পর্কিত।
ঋগ্বেদীয় ঋষিরা এই নক্ষত্রকে অগ্রহায়ণীও বলতেন। যজ্ঞকারী ঋষিদের কাছে এটি বছরের শুরু ও সমাপ্তির সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল বলে উল্লেখ পাওয়া যায়।
অনুসন্ধিৎসা, কৌতূহল ও নতুন কিছু আবিষ্কারের আকাঙ্ক্ষা মৃগশিরার প্রধান প্রতীকী অর্থ। ফসল তোলার মৌসুমে প্রাচুর্যের অনুভূতির সঙ্গেও এই নক্ষত্রের একটি সাংস্কৃতিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।
পৌষ
পৌষ নামের উৎস পুষ্যা নক্ষত্র। এটি কর্কট নক্ষত্রমণ্ডলের অ্যাসেলাস অস্ট্রালিস তারার অঞ্চলে অবস্থিত।
পুষ্যা শব্দের অর্থ পুষ্টিদাত্রী। তাই লালন-পালন, পুষ্টি ও শুভতার প্রতীক হিসেবে এই নক্ষত্র বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
তিনটি অনতিউজ্জ্বল তারা মিলে এই নক্ষত্র তৈরি করেছে। সিদ্ধান্তজ্যোতিষে একে পুষ্যা বা তিষ্যা বলা হলেও প্রাচীন ঋগ্বেদীয় ঋষিরা একে ব্রহ্মণস্পতি, বাচস্পতি ও বৃহস্পতি নামেও উল্লেখ করেছেন। পশ্চিমা জ্যোতির্বিজ্ঞানে এই তারাগুলো ডেল্টা ক্যাংক্রাই, গামা ক্যাংক্রাই ও থেটা ক্যাংক্রাই নামে পরিচিত।
মাঘ
মাঘ নামের তাৎপর্য নিহিত মঘা নক্ষত্রে। এর সঙ্গে সিংহ নক্ষত্রমণ্ডলের উজ্জ্বল তারা রেগুলাসের সম্পর্ক রয়েছে।
প্রাচীন ঐতিহ্যে মঘা রাজকীয়তা, বংশগৌরব ও পূর্বপুরুষদের স্মরণের প্রতীক। তাই এই নক্ষত্রের সঙ্গে ঐতিহ্য ও মর্যাদার ধারণা গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। সেই ধারণা ও চর্চার সঙ্গে মাঘ মাসের গ্রামীণ উৎসবগুলোরও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।
ফাল্গুন
ফাল্গুন মাসের উৎস ফল্গুনী নক্ষত্র। এর সঙ্গে সিংহ নক্ষত্রমণ্ডলের ডেনেবোলা ও আশপাশের তারাগুলোর সম্পর্ক রয়েছে।
ফল্গুনী বলতে আসলে দুটি নক্ষত্রকে বোঝায়, পূর্বা ফল্গুনী ও উত্তরা ফল্গুনী। প্রাচীন বিশ্বাস অনুযায়ী, পূর্বা ফল্গুনী আনন্দ, সৌন্দর্য, প্রেম, বন্ধুত্ব ও সৃষ্টিশীলতার প্রতীক। উত্তরা ফল্গুনী দায়িত্ববোধ, সম্পর্কের স্থায়িত্ব, সহযোগিতা ও সামাজিক বন্ধনের প্রতীক।
পূর্বা সম্পর্কের শুরু এবং উত্তরা সেই সম্পর্ককে ধরে রাখার দিকটি তুলে ধরে। তাই প্রেম, আনন্দ, সৌন্দর্য ও নতুন প্রাণের প্রতীক হিসেবে ফল্গুনী নক্ষত্রকে কল্পনা করা হয়েছে। এ কারণেই ফাল্গুন বসন্তের মাস, ফুল ফোটা, নতুন পাতা, রঙের উৎসব ও প্রাণবন্ততার মাস।
চৈত্র
বাংলা বছরের শেষ মাস চৈত্রের নাম এসেছে চিত্রা নক্ষত্র থেকে। এর প্রতীক একটি উজ্জ্বল মণি বা মুক্তা। পুরাণ অনুযায়ী, এর অধিষ্ঠাতা দেবতা বিশ্বকর্মা, যাকে শিল্পের দেবতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
চিত্রা কন্যা নক্ষত্রমণ্ডলের উজ্জ্বল তারা স্পিকার সঙ্গে সম্পর্কিত। সৌন্দর্য, শিল্পবোধ, নকশা ও সৃজনশীলতার প্রতীক হিসেবে চিত্রার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। বছরের শেষ মাস হিসেবে চৈত্রও প্রকৃতির এক বর্ণিল ও নান্দনিক রূপের প্রতিনিধিত্ব করে।
বাংলায় নক্ষত্র-সংস্কৃতির বিকাশ
বাংলায় এই নক্ষত্র-সংস্কৃতি বিশেষভাবে শক্তিশালী হয়েছে তিনটি ধারার মিলনে। এগুলো হলো হিন্দু জ্যোতিষ ও পঞ্জিকা, বৌদ্ধ তান্ত্রিক ও জ্যোতির্বিদ্যাগত ঐতিহ্য এবং আরবি-ফারসি জ্যোতির্বিজ্ঞান ও গণনা পদ্ধতি।
নবদ্বীপ বহু শতাব্দী ধরে জ্যোতিষ ও সংস্কৃত শিক্ষার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে এই ঐতিহ্যকে আরও গভীর করেছে।
বাংলা সনের শুরু যেভাবে
বহুল প্রচলিত মত অনুযায়ী, মুঘল সম্রাট আকবর ষোড়শ শতাব্দীতে, প্রায় ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে, বাংলা সন প্রবর্তন করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল মূলত ব্যবহারিক।
হিজরি চান্দ্র বছরের সঙ্গে কৃষিকাজ ও ফসল তোলার ঋতুচক্রের মিল ছিল না। ফলে রাজস্ব আদায়ে সমস্যা হতো। এই সমস্যা সমাধানে আকবরের দরবারের জ্যোতির্বিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজীর মাধ্যমে সৌর হিজরি সন হিসেবে বাংলা সন প্রবর্তন করা হয়। এটি কৃষকের ফসল তোলার সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। তাই একে 'ফসলি সন'ও বলা হয়।
তবে এ বিষয়ে আরেকটি মত রয়েছে। এই মত অনুযায়ী, সপ্তম শতাব্দীর গৌড়ের রাজা শশাঙ্ক, যার রাজত্বকাল আনুমানিক ৫৯০ থেকে ৬২৫ খ্রিস্টাব্দ, বঙ্গাব্দের প্রকৃত প্রবর্তক। আকবর শুধু আগে থেকে চলে আসা এই সনকে সংস্কার বা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিলেন।
প্রবর্তক নিয়ে মতভেদ থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট। বারো মাসের নাম শুধু আকাশের নক্ষত্র দেখে বসিয়ে দেওয়া হয়নি। এর সঙ্গে দর্শন, রাষ্ট্র, কৃষি ও সমাজের বাস্তব প্রয়োজনও জড়িয়ে ছিল।
আধুনিক আবহাওয়া অধিদপ্তরের যুগ তখনো আসেনি। তাই বাংলা সনের সংস্কার কৃষিকাজ ও খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। অর্থাৎ আকাশ পর্যবেক্ষণ সরাসরি অর্থনীতির অংশ হয়ে গিয়েছিল।
কখন বৃষ্টি হবে, কখন বীজ বোনা উচিত, কখন ফসল কাটতে হবে, এসব সিদ্ধান্ত অনেকাংশে পঞ্জিকা ও নক্ষত্র পর্যবেক্ষণের ওপর নির্ভর করত। রাজস্ব আদায়ের সময়সূচিও কৃষি মৌসুমের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
এই কারণেই মাসের নামগুলোর প্রতীকী অর্থের সঙ্গে কৃষিচক্রেরও মিল দেখা যায়। যেমন অগ্রহায়ণের 'প্রাচুর্য' নবান্নের সময়ের সঙ্গে এবং পৌষের 'পুষ্টি' ঘরে নতুন ধান ওঠার সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত।
এই পঞ্জিকাকে ঘিরেই ধীরে ধীরে বাংলার উৎসব, আচার ও বিশ্বাসের একটি বড় অংশ গড়ে উঠেছে। অর্থাৎ বাংলা বছরের বারো মাস শুধু সময় গণনার নাম নয়। এর প্রতিটি নামের পেছনে রয়েছে আকাশ পর্যবেক্ষণ, কৃষি, রাষ্ট্র, সংস্কৃতি ও মানুষের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার গল্প।