যে কারণে লাল রঙ বেছে নেয় বাংলাদেশি কনেরা

সাবরিনা এন ভূঁইয়া

চোখ বন্ধ করে নিজেকে কনে হিসেবে কল্পনা করুন তো। মনের মধ্যে যে ঝলমলে ছবি ফুটে উঠবে, সেখানে লাল ছাড়া অন্য কোনো রঙের অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনা খুব কম। বিশেষ দিনে 'কবুল' বলার জন্য ভালোবাসা, আবেগ আর প্রাণশক্তির প্রতীক এই রঙকেই সচরাচর মানুষ বেছে নেয়।

দেবীরা নাকি লাল বস্ত্রে সজ্জিত হয়ে মর্ত্যের মানুষকে রক্ষা করতেন, এমন বিশ্বাসে গভীরভাবে প্রোথিত এই রঙ প্রাণশক্তিতে পরিপূর্ণ। দক্ষিণ এশীয় সংস্কৃতিতে লাল কেবল একটি রং নয়, এটি সৌভাগ্য, উর্বরতা ও সমৃদ্ধির প্রতীক। অশুভ শক্তিকে দূরে রেখে এই রঙ নারীর জীবনে সামঞ্জস্য, আনন্দ, সৌভাগ্য ও সুখ বয়ে আনে বলেই বিশ্বাস করা হয়। আর সেই কারণেই দাম্পত্য সুখের সঙ্গে এর সম্পর্ক এত গভীর ও অটুট।

মানুষের অনুভূতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত এই রঙটি যেকোনো দম্পতির ভালোবাসা ও আবেগের অবিনাশী আগুনের প্রতিচ্ছবি। আর এই আগুন আজীবন ধরে জ্বলার স্বপ্ন দেখে সবাই। শোক ও বেদনার প্রতীক সাদা রঙের সম্পূর্ণ বিপরীত এই রঙ। লাল হলো নতুন সূচনা, সৌভাগ্য, উর্বরতা ও ভালোবাসার বার্তাবাহক। শুধু তাই নয়, এর উজ্জ্বলতা কনেকে ভিড়ের মধ্যে আলাদা করে তোলে, নতুন জীবন ও নতুন ভূমিকায় পা রাখার মুহূর্তে তাকে অনন্য করে তোলে। বিয়েতে কনের লাল পরার পেছনে রয়েছে অনেক রকম যুক্তি, যা বলে শেষ করা যাবে না।

দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে এই শুভ রঙটি বিশেষভাবে প্রিয়। কারণ লাল সব ধরনের ত্বকের সঙ্গেই মানানসই। প্রত্যেক ত্বকের জন্যই রয়েছে ভিন্ন রকমের লাল। আপনার বিশেষ দিনের জন্য লাল বেছে নিতে হলে নিজের গায়ের রঙের সঙ্গে সবচেয়ে মানানসই শেডটি খুঁজে নেওয়াই জরুরি। আর যদি এখনো বুঝে না থাকেন কোন লালটি আপনার জন্য একেবারে নিখুঁত, তবে গবেষণা শুরু করে দিন।

এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, উষ্ণ আন্ডারটোনযুক্ত ত্বকের জন্য গাঢ়, কমলা আভাযুক্ত লাল এবং সিঁদুরে লাল সবচেয়ে মানানসই। এগুলো ত্বকের স্বাভাবিক উষ্ণতাকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে। এই তালিকায় গাঢ় কোরাল ও পার্সিমন লালও রয়েছে, যা বিয়ের পোশাকের জন্য দারুণ একটি পছন্দ হতে পারে।

ফর্সা ত্বক ও ঠান্ডা আন্ডারটোনযুক্ত নারীদের ক্ষেত্রে নীলচে আভাযুক্ত লাল, যেমন উজ্জ্বল চেরি রেড সবচেয়ে ভালো মানায়। এতে ত্বকের নীলচে শিরাগুলো সুন্দরভাবে ফুটে ওঠে। রাস্পবেরি লালও তাদের জন্য আরেকটি চমৎকার বিকল্প হতে পারে।

অলিভ স্কিন টোনের নারীদের জন্য কমলা আভাযুক্ত লাল, যেমন ব্রিক রেড ও ক্রিমসন ভীষণ মানানসই। কারণ এগুলো ত্বকের সবুজাভ আভাকে সুন্দরভাবে তুলে ধরে। মাঝারি থেকে হালকা ত্বকের জন্য স্ট্রবেরি লাল বেছে নিতে পারেন অনায়াসে।

শ্যামলা ত্বকের নারীরা আরও গাঢ় ও সমৃদ্ধ লালের শেড, যেমন অক্সব্লাড ও মার্লো পরে দেখতে পারেন। এ ছাড়াও বোর্দো ও গাঢ় অবার্ন লাল বর্ণালির একেবারে শেষ প্রান্তে থাকা দুটি শেড, যা কনের পোশাকের জন্য বিবেচনায় রাখা যেতে পারে।

বিয়ের শাড়ির কথা উঠলেই বেনারসি কাতান আজও সবার শীর্ষে। মায়ের সিঁদুরে লাল বিয়ের কাতান গায়ে জড়িয়ে অনেক মেয়েই একদিন নিজে কনে হওয়ার স্বপ্ন দেখে। আর সেই স্বপ্নের রেশ আজীবন হৃদয়ে থেকে যায়। কালজয়ী, গভীর অর্থবহ, অমূল্য লাল কাতান সবসময়ই এক নিখুঁত পছন্দ।

তবে নিজের জন্য সঠিক লাল কাতান বেছে নেওয়াটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রঙের পাশাপাশি কাপড়ের মান ও কাজের দিকে ভালো করে নজর দিন। লালের প্রায় সব শেডেই দারুণ সব কাতান পাওয়া যায়। তাই নিজের সঙ্গে সবচেয়ে মানানসইটিই বেছে নিন।

নতুন প্রজন্মের কনেরা, যারা একটু ভিন্ন কিছু চান, তারাও আজ নানা বিকল্পে ভরপুর। সম্পূর্ণ লাল লেহেঙ্গা হতে পারে এক দুর্দান্ত স্টেটমেন্ট—আধুনিক আর অভিজাত। সোনাকে পাশ কাটিয়ে হীরা বা রুবি গয়না বেছে নিলেই লুকটা হয়ে উঠবে একেবারে অনন্য।

লাল লেহেঙ্গাও কিন্তু দারুণ সুন্দর। কনট্রাস্ট বর্ডার বা ওড়না আর সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী গহনায় দারুণ লুক তৈরি হতে পারে। লাল শাড়ি গাউনেও সেজে উঠতে পারেন। বিশেষ করে যারা রিসেপশনে লাল পরতে চান, তাদের জন্য এটি খুব ভালো একটি পছন্দ হতে পারে। কারণ কেনই বা নয়? আধুনিক কনে যা ইচ্ছে তাই পরতেই পারেন, যখন ইচ্ছে লাল পরতেই পারেন। দিনটা তো আসলে তারই!

ছবি: হাউস অব আহমেদ
পোশাক: হাউস অব আহমেদ

অনুবাদ করেছেন সৈয়দা সুবাহ আলম