ঈদে শিশুর পোশাক কিনতে যেসব বিষয়ে খেয়াল রাখা প্রয়োজন

নুসরাত জাহান

ঈদের কেনাকাটা করতে গেলে শিশুদের জন্য পোশাক কেনার আনন্দই যেন আলাদা। এই আনন্দের সঙ্গে অন্য কিছুর তুলনা করা সত্যিই কঠিন। ছোট ছোট পাঞ্জাবি, মিনি কামিজ, ছোট্ট ওয়েস্টকোট কিংবা ফুলানো জামা—এসব দেখলেই যেন মন ভালো হয়ে যায়। আর শিশুদের উৎসবের পোশাকে দেখলেই যেন ঈদ ঈদ মনে হয়।

কোনো একটি ড্রেস পরে শিশুকে দেখতে কতটা সুন্দর লাগছে বা সেই ড্রেস পরে ছবি তুললে কেমন দেখাবে—এসব ভাবতে গিয়েই আমরা অনেক সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভুলে যাই। কারণ শিশুরা সাধারণত ড্রেসের ডিজাইন কেমন বা সেটি পরে তাকে দেখতে কেমন লাগবে, এসব নিয়ে খুব একটা ভাবে না।

উৎসবের দিন তারা বেশিরভাগ সময় ছুটোছুটি করতে থাকে, খাওয়া দাওয়ার দিকে খুব একটা মনোযোগ থাকে না, কখনো এই ফার্নিচারের মাথায় লাফিয়ে উঠছে তো কখনো অন্য কোনো জায়গা থেকে লাফিয়ে পড়ছে আবার দৌড়াচ্ছে। তাই ঈদের সময় শিশুদের পোশাক নির্বাচন করার সময় আরামের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া উচিত।

Kid's Eid Fashion

আরামদায়ক পোশাক

বড়রা চাইলে কিছুটা টাইট হাতার পোশাক বা ভারী কাজ করা ওড়না পরে স্বাচ্ছন্দ্যে ঘুরে বেড়াতে পারে। কিন্তু শিশুরা তা করতে পারে না। পোশাক যদি আরামদায়ক না হয়, তারা সহজেই অস্বস্তিতে পড়ে। তাই শিশুর ক্ষেত্রে, দেখতে যতই সুন্দর হোক না কেন, অস্বস্তিদায়ক পোশাক নির্বাচন করা উচিত নয়।

ঈদের সকালে বাসায় মেহমান আসে, কোলাকুলি হয়, সবাই মিলে নানা মজার খাবার খাওয়া হয়, আর বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে গিয়ে স্মৃতির জন্য অনেক ছবি তোলা হয়। তাই পোশাক এমন হওয়া উচিত নয় যা আরামদায়ক না, খুব চাপা বা ভারী বা যা পরে নড়াচড়া করা কঠিন। এমন হলে শিশুরা অস্বস্তি বোধ করবে, বিরক্তি তৈরি হবে এবং সারাদিনের আনন্দটাই মাটি হয়ে যাবে।

শিশুদের পোশাক নির্বাচনের ক্ষেত্রে নরম, আরামদায়ক কাপড় বেছে নেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। হালকা সিল্ক-কটন মিক্সড কাপড়, লন বা নরম সাটিনের পোশাক শিশুদের জন্য বেশ উপযোগী। অনেক সময় ছোট বাচ্চাদের জন্য ভেতরে খসখসে কাপড় ব্যবহার করে ফুলানো ধরনের ড্রেস তৈরি করা হয়। এসব পোশাক কেনা থেকে বিরত থাকাই ভালো।

ছেলে বাচ্চার ক্ষেত্রে নরম পাঞ্জাবির সঙ্গে আরামদায়ক ট্রাউজার বা পাজামা নির্বাচন করা উচিত। পাঞ্জাবির সঙ্গে ওয়েস্টকোটও বেশ মানানসই লাগে। তবে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যেন সেটি খুব টাইট না হয়। আর যদি দেখা যায় যে এসব পোশাক পরে বাচ্চা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে না, তাহলে ছবি তোলা শেষ হওয়ার পরই পোশাক পরিবর্তন করে তাকে আরামদায়ক অন্য পোশাক পরিয়ে দেওয়া ভালো।

মেয়ে বাচ্চাদের ক্ষেত্রে ঢিলেঢালা ফ্রক, হালকা ঘারারা কিংবা কোমরে হালকা ইলাস্টিক দেওয়া নরম কাপড়ের স্কার্ট পরানো যেতে পারে। এমন পোশাক নির্বাচন করা উচিত যাতে শিশুরা স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারে এবং খেলাধুলা করতে কোনো অসুবিধা না হয়।

আসলে খুব বেশি নজরকাড়া একটি পোশাকের চেয়ে আরামদায়ক পোশাক পরে বাচ্চার হাসিখুশিভাবে দৌড়ঝাঁপ করে বেড়ানো; এটাই কি আমাদের জন্য বেশি আনন্দের নয়?

Kid's Eid Fashion

হালকা ঐতিহ্যবাহী পোশাক

ঈদ আমাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও স্মৃতির এক সুন্দর প্রতিচ্ছবি। শিশুদের যদি দেশীয় ঘরানার পোশাক পরানো হয়, তবে তারা ছোটবেলা থেকেই আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠে।

ছেলে শিশুর জন্য একটি সুন্দর কুর্তা কিংবা মেয়ে শিশুর জন্য হালকা রঙের একটি শারারা হতে পারে দারুণ পছন্দ। এটি শুধু ফ্যাশনের প্রকাশ নয়, বরং আমাদের চিরাচরিত ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সৌন্দর্যকেও ফুটিয়ে তোলে।

ঐতিহ্যবাহী পোশাক মানেই যে খুব ভারী কাজ করা পোশাক হতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। চাইলে হালকা কাজের পোশাকও বেছে নেওয়া যেতে পারে। যেমন: পুরো পোশাকজুড়ে ভারী নকশা না রেখে গলা বা হাতায় হালকা এমব্রয়ডারির ছোঁয়া থাকলেই সেটি বেশ সুন্দর ও মার্জিত দেখায়।

ছোট মেয়ে শিশুদের ক্ষেত্রে হালকা কাজের একটি ওড়না বেছে নেওয়া যেতে পারে, আবার আরামের কথা ভেবে চাইলে ওড়না না দিলেও চলে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আমাদের শিশুরা যেন ঐতিহ্যবাহী পোশাকের সঙ্গে পরিচিত হয় এবং একইসঙ্গে আরামদায়ক সেই পোশাকে তাদের উৎসবমুখর দেখায়।

Kid's Eid Fashion

রঙিন পোশাক

বড়দের তুলনায় ছোটদের ওপর উজ্জ্বল রঙগুলো অনেক বেশি মানিয়ে যায়। গাঢ় লাল, রয়্যাল ব্লু, সূর্যমুখী হলুদ, মিন্ট গ্রিন বা কোরাল—এসব রঙের পোশাকে শিশুদের দেখতে দারুণ লাগে। বড়দের ঈদের পোশাক বেছে নিতে অনেক সময় রঙ ও ডিজাইন নিয়ে ভাবতে হয়, কিন্তু শিশুদের ক্ষেত্রে প্রায় সব রঙের শেড ও ডিজাইনই সহজেই মানিয়ে যায়।

পোশাকে বিভিন্ন ধরনের প্যাটার্ন যেমন ফ্লোরাল প্রিন্ট, স্ট্রাইপ, টাই-ডাই ইফেক্ট বা ছোট ছোট নকশা যুক্ত থাকলে তা আরও দৃষ্টিনন্দন হয়ে ওঠে।

সহোদর ভাইবোনদের জন্য একই রঙের পোশাক নির্বাচন করা যেতে পারে। এমনকি পুরো পরিবারের ক্ষেত্রেও একই রঙের থিম রেখে ভিন্ন ভিন্ন স্টাইল বা প্যাটার্নের পোশাক বেছে নিলে সেটি বেশ আকর্ষণীয় দেখায়।

Kid's Eid Fashion

ক্যাজুয়াল পোশাক

একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, শিশুদের ক্ষেত্রে বড়দের মতো করে অতিরিক্ত সাজগোজ বা ভারী সাজপোশাকের প্রয়োজন নেই।

ছেলে শিশুদের জন্য শার্ট-প্যান্ট, গেঞ্জি-প্যান্ট কিংবা পাঞ্জাবি-পাজামা—এ ধরনের যেকোনো ক্যাজুয়াল পোশাকেই তাদের দেখতে খুব সুন্দর লাগে। আর মেয়ে শিশুদের ক্ষেত্রে নরম সুতি কাপড়ের একটি ফ্রক হতে পারে দারুণ আরামদায়ক। বিশেষ করে ঈদের দ্বিতীয় বা তৃতীয় দিনে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে আনন্দ করা বা বাইরে ঘুরতে যাওয়ার জন্য এসব পোশাক বেশ উপযুক্ত।

অনেক সময় দেখা যায়, ঈদের পোশাক পরে ছবি তোলা শেষে শিশুরা পোশাক পরিবর্তন করে আরামদায়ক পোশাক পরে স্বাচ্ছন্দ্যে থাকে। যদি দেখেন যে আপনার ছোট্ট সোনামণিরা পোশাক পরে আরামে, হেসেখেলে আনন্দ করে বেড়াচ্ছে, বুঝবেন যে তাদের জন্য আপনার পোশাক নির্বাচন সঠিক হয়েছে।

Kid's Eid Fashion

অ্যাক্সেসরিজ

শুধু পোশাকই নয়, ছোট শিশুদের ঈদের সাজকে পূর্ণতা দিতে কিছু সুন্দর আনুষঙ্গিক জিনিসও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

মেয়ে শিশুদের ক্ষেত্রে ছোট ছোট কানের দুল, চুড়ি এবং চুলের বিভিন্ন ধরনের ক্লিপ বা হেয়ার ব্যান্ড পরানো যেতে পারে। তবে খেয়াল রাখতে হবে, যেন কোনো ভারী বা অস্বস্তিকর অ্যাক্সেসরিজ ব্যবহার না করা হয়।

ছেলে শিশুদের জন্য ট্র্যাডিশনাল স্যান্ডেল, লোফার বা আরামদায়ক যেকোনো জুতা বেছে নেওয়া যেতে পারে। এমন জুতা নেওয়া উচিত নয় যা পরে অস্বস্তি হয়। জুতা বা স্যান্ডেল যাই কিনুন না কেন সেটা পরে শিশুরা যেন স্বাচ্ছন্দ্যে হাঁটাহাঁটি বা দৌড়াদৌড়ি করতে পারে।

এছাড়াও তাদের হাতে একটি সুন্দর ঘড়ি পরিয়ে দেওয়া যেতে পারে। ছোট শিশুদের হাতে একটি ঘড়ি সত্যিই দারুণ দেখায়।

শিশুর পছন্দকে প্রাধান্য দিন

ঈদে শিশুরা যেন নিজেদের মতো করে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারে। তাদের সাজ-পোশাক যেন কোনোভাবেই সেই আনন্দে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়। যদি আপনার মেয়ে তার পছন্দের রঙের ঈদের জামা কিনতে চায়, তাহলে তাকে সেই রঙের জামাই কিনে দিন। আর যদি আপনার ছেলে কুর্তার সঙ্গে একটু ভিন্ন ধরনের জুতা পরার বায়না ধরে, তবে সেটিও তাকে পরতে দিন।

শিশুরা সাধারণত মনে রাখে না তারা কোন স্টাইল বা ডিজাইনের পোশাক পরেছিল; কিন্তু কতটা আনন্দ নিয়ে তারা ঈদ উদযাপন করেছে, সেই স্মৃতিটাই তাদের মনে থেকে যায়। তাই অভিভাবক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো, ঈদের কেনাকাটায় তাদের স্বাচ্ছন্দ্যকে গুরুত্ব দিয়ে উপযুক্ত স্টাইলের পোশাক নির্বাচন করা।

শিশুরা যে পোশাকই পরুক না কেন, তাতেই তাদের অপূর্ব সুন্দর লাগে। এই ছোট্ট শিশুরাই তো আমাদের ঘরের প্রাণ, হাসি আর আনন্দের উৎস।

অনুবাদ করেছেন শবনম জাবীন চৌধুরী

ছবি: আদনান রহমান
স্টাইলিং অ্যান্ড ফ্যাশন ডিরেকশন: সোনিয়া ইয়াসমিন ইশা
মডেল: আনাইজা, জুন, রাফিদ, ইসা, শেহনা, মুগ্ধ
ওয়্যারড্রোব: শিশু পরিবহন
লোকেশন: বাবুল্যান্ড, বেইলি রোড