এসএমএসের দিনগুলো মনে আছে?
আজকাল কারও সঙ্গে কথা বলতে চাইলে আমরা হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার বা অন্য কোনো অ্যাপে ঢুকে যাই। ছবি পাঠাই, ভয়েস মেসেজ পাঠাই, ভিডিও কল করি। এত কিছু করার সুযোগ এখন হাতের মুঠোয়। কিন্তু খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, যখন মোবাইল ফোনে যোগাযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল এসএমএস।
একটি ছোট্ট মেসেজ এসে পৌঁছানোর শব্দ শুনেই অনেকের বুক ধড়ফড় করে উঠত। ফোন বের করে দেখার আগ পর্যন্ত শান্তি মিলত না। কে পাঠিয়েছে? কী লিখেছে? সেই কৌতূহলের আলাদা একটা আনন্দ ছিল।
ফিচার ফোনের সেই সময়টায় এসএমএস ছিল অনেকের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। তখন সবাই সারাক্ষণ ইন্টারনেটে থাকতেন না। কারও সঙ্গে কথা বলার প্রয়োজন হলে কল করতে হতো, আর কথা না বলে কিছু জানাতে চাইলে এসএমএসই ছিল সবচেয়ে সহজ উপায়।
এসএমএসেরও আবার ছিল নিজস্ব নিয়মকানুন। একটি বার্তায় নির্দিষ্ট অক্ষরের বেশি লেখা যেত না। ফলে অনেকেই ছোট ছোট বাক্যে কথা বলতেন। কেউ ইংরেজি অক্ষরে বাংলা লিখতেন, কেউ আবার শব্দ ছোট করে ফেলতেন। ‘কেমন আছ?’ হয়ে যেত ‘kmn aso’, ‘ভালোবাসি’ হয়ে যেত ‘vlobashi’। সেই লেখাগুলো আজ পড়লে হয়তো অনেকেরই হাসি পাবে, কিন্তু তখন সেগুলোই ছিল স্বাভাবিক।
প্রেমের গল্পেও এসএমএসের বড় ভূমিকা ছিল। অনেকের প্রথম ‘ভালোবাসি’ বলা, প্রথম অভিমান, প্রথম ঝগড়া কিংবা প্রথম ক্ষমা চাওয়া হয়েছে এসএমএসে। সরাসরি বলতে সংকোচ লাগলেও মেসেজে লিখে পাঠিয়ে দেওয়া যেত। তারপর শুরু হতো অপেক্ষা। উত্তর আসবে কি আসবে না, এ নিয়ে কত মানুষ যে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকেছে, তার হিসাব নেই। একটি মেসেজ পাঠানোর পর অনেকেই মিনিট গুনতেন। ফোনে আলো জ্বললেই মনে হতো উত্তর এসেছে। পরে দেখা যেত সেটি হয়তো মোবাইল অপারেটরের কোনো প্রচারণামূলক বার্তা। হতাশ হয়ে আবার অপেক্ষা।
বন্ধুত্বের ক্ষেত্রেও এসএমএসের আলাদা জায়গা ছিল। পরীক্ষার আগের রাতে বন্ধুদের শুভকামনা, জন্মদিনের প্রথম শুভেচ্ছা, ঈদের শুভেচ্ছা কিংবা হঠাৎ করে পাঠানো কোনো কৌতুক সবই আসত এসএমএসে। অনেকের ইনবক্সে শত শত মেসেজ জমে থাকত। প্রিয় বন্ধু বা বিশেষ কারও পাঠানো মেসেজ ডিলিট করার প্রশ্নই উঠত না।
ঈদের সময়ের কথা আলাদা করে বলতেই হয়। ঈদের আগের রাত থেকেই শুরু হয়ে যেত শুভেচ্ছা বার্তা পাঠানোর প্রতিযোগিতা। কার মেসেজ সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে ব্যতিক্রমী কিংবা সবচেয়ে আগে পৌঁছাবে—এসব নিয়েও ছিল নীরব প্রতিযোগিতা। অনেকেই আলাদা খাতায় ঈদের শুভেচ্ছা বার্তা লিখে রাখতেন, পরে কপি করে একে একে পাঠাতেন!
তখন আবার মোবাইল অপারেটরগুলো বিভিন্ন এসএমএস প্যাকেজও দিত। নির্দিষ্ট টাকায় শত শত মেসেজ পাঠানোর সুযোগ পাওয়া যেত। দিনের শেষে হিসাব থাকত, আজ কতটি এসএমএস পাঠানো হলো।
অনেকেরই হয়তো মনে আছে এসএমএস বান্ডেলের কথা। ১০ টাকা, ২০ টাকা বা ৩০ টাকার বিনিময়ে কয়েক শ, কখনো আবার হাজারখানেক এসএমএস পাঠানোর সুযোগ পাওয়া যেত। বিশেষ করে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে এসব বান্ডেলের জনপ্রিয়তা ছিল বেশ। মাসের শুরুতে কেউ কেউ প্রথমেই এসএমএস বান্ডেল কিনে রাখতেন। বান্ডেল শেষ হয়ে গেলে আবার রিচার্জ করার জন্য অপেক্ষা করতে হতো। বন্ধুদের মধ্যেও প্রায়ই কথা হতো, ‘আমার বান্ডেল শেষ, পরে মেসেজ দিও।’ আজকের দিনে শুনতে অদ্ভুত লাগলেও একসময় দীর্ঘ আড্ডা, বন্ধুত্ব আর প্রেমের বড় একটি অংশই চলত এসব এসএমএস বান্ডেলের ওপর ভর করে।
রাত ১২টার পরের সময়টাও ছিল বিশেষ। কিছু অপারেটর নির্দিষ্ট সময়ের পর বাড়তি এসএমএস বা কম খরচে মেসেজ পাঠানোর সুযোগ দিত। ফলে অনেকেই রাত জেগে সেই সময়টার অপেক্ষা করতেন। দিনের বেলায় সংক্ষিপ্ত কথাবার্তা হলেও রাত গভীর হওয়ার পর ইনবক্স জমে উঠত। বন্ধুর সঙ্গে গল্প, পরীক্ষার দুশ্চিন্তা, মনের কথা কিংবা স্রেফ ঘুমানোর আগে ‘গুড নাইট’ বলা এসবের জন্যও ভরসা ছিল এসএমএস।
ফোনের মেমোরিও তখন খুব সীমিত ছিল। ফলে ইনবক্স ভর্তি হয়ে গেলে পুরোনো মেসেজ মুছে নতুন মেসেজের জায়গা করতে হতো। কিন্তু কিছু মেসেজ ছিল, যেগুলো মানুষ সহজে মুছতে পারতেন না। বছরের পর বছর ধরে সেগুলো ফোনে জমা থাকত। অনেক সময় নতুন ফোন কেনার পরও সেই মেসেজ অন্য ফোনে তুলে রাখার চেষ্টা করা হতো।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে বিষয়টি অদ্ভুত মনে হতে পারে। কারণ এখন আমরা প্রতিদিন যত মেসেজ পাঠাই, তার সংখ্যা হয়তো তখন এক মাসেও পাঠানো হতো না। কিন্তু পরিমাণ বাড়লেও সেই অপেক্ষার অনুভূতিটা আর নেই। এখন কোনো মেসেজ দেখার সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর দেওয়া যায়। কেউ অনলাইনে আছেন কি না, সেটিও দেখা যায়। কিন্তু এসএমএসের যুগে যোগাযোগের গতি ছিল একটু ধীর। আর সেই ধীরগতির মধ্যেই ছিল এক ধরনের উত্তেজনা। একটি মেসেজ পৌঁছাতে সময় লাগত, উত্তর পেতেও সময় লাগত। ফলে প্রতিটি বার্তার আলাদা গুরুত্ব ছিল।
হয়তো সে কারণেই পুরোনো ফোন হাতে পেলে বা অনেক বছর আগের কোনো এসএমএসের কথা মনে পড়লে মানুষ একটু নস্টালজিক হয়ে পড়ে। প্রযুক্তি এগিয়েছে, যোগাযোগ সহজ হয়েছে, কিন্তু একটি নতুন এসএমএস আসার শব্দ শুনে যে অনুভূতিটা হতো, সেটি আজকের নোটিফিকেশনের ভিড়ে কোথাও যেন হারিয়ে গেছে।


