দেয়ালের ক্যালেন্ডার এখনো প্রয়োজন, নাকি শুধু অভ্যাস?
বাংলাদেশি পরিবারগুলোতে একসময় ঘরে ঢুকলেই চোখে পড়ত দেয়ালে ঝোলানো ক্যালেন্ডার। ড্রয়িংরুমে, ডাইনিং স্পেসে তো থাকতই, বাদ যেত না শোবার ঘরও। নতুন বছর শুরু হলেই পুরোনো ক্যালেন্ডার নামিয়ে নতুন ক্যালেন্ডার টাঙানো ছিল অনেক পরিবারের নিয়মিত কাজের একটি।
এখন স্মার্টফোনের এক স্পর্শেই তারিখ, দিন, মাস, এমনকি কয়েক বছর পরের ক্যালেন্ডারও দেখে ফেলা যায়। গুরুত্বপূর্ণ দিন মনে রাখার জন্য আছে রিমাইন্ডার, অ্যালার্ম আর ডিজিটাল ক্যালেন্ডার। মজার বিষয় হলো, প্রযুক্তি যতই এগিয়ে যাক, বাংলাদেশের অনেক বাসা, দোকান, অফিস কিংবা গ্রামের বাড়িতে এখনো দেয়ালের ক্যালেন্ডার টাঙানো দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে সেটি শুধু তারিখ দেখার জন্য নয়, ঘরের একটি পরিচিত অংশ হিসেবেও রয়ে গেছে। ফলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—দেয়ালের ক্যালেন্ডার কি এখনো প্রয়োজন, নাকি এটি শুধু পুরোনো অভ্যাস?
অনেকের শৈশবের স্মৃতির সঙ্গে দেয়ালের ক্যালেন্ডার জড়িয়ে আছে। নতুন বছর শুরু হলে কোনো ব্যাংক, ওষুধ কোম্পানি বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া ক্যালেন্ডার ঘরে আসত। এরপর পরিবারের কেউ একটি সুবিধাজনক জায়গা খুঁজে সেটি টাঙিয়ে দিতেন। মাস শেষ হওয়ার আগে কেউ একজন পাতা উল্টে দিতেন। কখনো আবার আগের মাসের পাতাই ঝুলতে দেখা যেত, কারণ পাতা উল্টাতে সবাই ভুলে গেছেন। বছর শেষে ক্যালেন্ডারের সুন্দর পাতাগুলো চলে যেত ছোটদের নতুন ক্লাসের নতুন বইয়ের মলাট করার কাজে। সেটা যেন ছিল আরেক উৎসব। নতুন বইয়ের গায়ে সেই মলাট লাগিয়ে, সাদা কাগজে নাম-শ্রেণি লিখে দিলে নতুন শিক্ষাবর্ষের প্রস্তুতি যেন অনেকটাই সম্পূর্ণ হয়ে যেত। ক্যালেন্ডার আবার উপহারের জিনিসও ছিল। বছরের শেষ দিকে পরিচিত প্রতিষ্ঠানে নতুন ক্যালেন্ডার এসেছে কি না, সেই খোঁজ রাখতেন অনেকে।
অনেক পরিবারের জন্য ক্যালেন্ডার ছিল ছোটখাটো তথ্যকেন্দ্রের মতো। পরীক্ষার তারিখ, বিয়ের দাওয়াত, বিদ্যুৎ বিল জমা দেওয়ার শেষ দিন কিংবা আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়ার পরিকল্পনা অনেক কিছুই ক্যালেন্ডারের ফাঁকা জায়গায় লিখে রাখা হতো। গোল করে নানা কালির কলমে ক্যালেন্ডারে তারিখ দাগিয়ে রাখতেন অনেকে। মোবাইল ফোন তখন সবার হাতে ছিল না। ফলে দেয়ালের ক্যালেন্ডারই ছিল সবচেয়ে সহজ ভরসা। একটি ক্যালেন্ডার পুরো পরিবারের মাসের পরিকল্পনার সাক্ষী হয়ে থাকত।
এখন অবশ্য সেই প্রয়োজন অনেকটাই কমেছে। দিনের বেশিরভাগ সময় মানুষ ফোন হাতের কাছেই রাখে। কোনো তারিখ জানতে দেয়ালের দিকে তাকানোর চেয়ে ফোনের স্ক্রিনে চোখ বুলিয়ে নেওয়াই সহজ। গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্যও মানুষ কাগজে লিখে রাখার বদলে ডিজিটাল রিমাইন্ডারের ওপর নির্ভর করছে। তবে শুধু প্রয়োজন কমেছে বলেই যে দেয়ালের ক্যালেন্ডার পুরোপুরি হারিয়ে গেছে, বিষয়টি তেমন নয়।
অনেকেই এখনো সকালে ঘুম থেকে উঠে বা কাজের ফাঁকে দেয়ালের ক্যালেন্ডারের দিকে তাকিয়ে তারিখ দেখেন। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষদের মধ্যে এই অভ্যাস এখনো বেশ সাধারণ। ফোন ব্যবহার করলেও দেয়ালে ঝোলানো ক্যালেন্ডার চোখের সামনে থাকায় সেটি অনেক সময় বেশি সুবিধাজনক মনে হয়।
আবার কিছু কিছু ক্যালেন্ডার ঘরের সাজসজ্জার অংশও হয়ে উঠেছে। প্রকৃতির ছবি, গ্রামীণ দৃশ্য, শিল্পকর্ম কিংবা নকশা দিয়ে তৈরি ক্যালেন্ডার এখনো অনেক বাসায় দেখা যায়। বছরের শেষে তারিখের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলেও অনেকে ছবির জন্য ক্যালেন্ডারটি নামাতে চান না।
দোকানপাট, ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কিংবা স্থানীয় অফিসগুলোতে দেয়ালের ক্যালেন্ডারের ব্যবহার এখনো বেশ চোখে পড়ে। সেখানে শুধু তারিখ দেখার জন্য নয়, দ্রুত নোট নেওয়ার কাজেও এটি ব্যবহার করা হয়। কার কাছে কত টাকা পাওনা, কোন দিনে পণ্য আসবে বা কোনো কাজের সময়সূচি এসব লিখে রাখার জন্য অনেকেই এখনো ক্যালেন্ডারের ওপর ভরসা করেন।
কিছু জিনিস শুধু প্রয়োজনের কারণে টিকে থাকে না, অভ্যাস, স্মৃতি আর পরিচিতির কারণেও টিকে থাকে। প্রযুক্তি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অনেক পুরোনো জিনিস সরিয়ে দিয়েছে। চিঠির জায়গা নিয়েছে মেসেজ, অ্যালার্ম ঘড়ির কাজ করছে ফোন। দেয়ালের ক্যালেন্ডারের প্রয়োজনও নিঃসন্দেহে আগের চেয়ে কমেছে। তবু এটি একেবারে হারিয়ে যায়নি। হয়তো আরও কিছু বছর পর এর ব্যবহার আরও কমবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত ক্যালেন্ডার এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে প্রয়োজন ফুরিয়ে এলেও সম্পর্কটা পুরোপুরি ফুরিয়ে যায়নি। তাই দেয়ালের ক্যালেন্ডার প্রয়োজন, নাকি শুধু অভ্যাস—এর উত্তর হয়তো দুটোর মাঝামাঝিই।


