জিরাফের গায়ে দাগ থাকে কেন

স্টার অনলাইন ডেস্ক

জিরাফের নাম শুনলেই সবার আগে মাথায় আসে গলার কথা। কারণ জিরাফের গলা অনেক লম্বা। এতটাই লম্বা যে, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বনের উঁচু গাছের পাতাও খেতে পারে! এছাড়া জিরাফের গায়ে অনেকগুলো দাগ থাকে। এই দাগের রহস্য কী?

ছদ্মবেশ বা ক্যামোফ্লাজ

জিরাফের দাগ মূলত তাকে ছদ্মবেশ ধারণে সাহায্য করে। মানে আশপাশের পরিবেশে মিশে যেতে সাহায্য করে। সাধারণত দিনের বেলা বনের মধ্যে সূর্যের আলো ছায়া ফেলে। জিরাফের এই দাগগুলো পাতার ছায়ার সঙ্গে মিশে যায়। তখন এই বিশাল প্রাণীকে আর কাছ থেকেও চেনা যায় না। জিরাফের এই ক্যামোফ্লাজ বা ছদ্মবেশ শাবকদের জন্য খুবই জরুরি। এটি তাদের বেঁচে থাকতে সহায়তা করে।

২০১৮ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বড় ও গোল দাগবিশিষ্ট শাবকদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বেশি।

কিছু গবেষক দেখেছেন, জিরাফের গায়ের দাগের আকার অনেক সময় আফ্রিকার সাভানায় প্রচলিত আকাসিয়া গাছের ডালের শাখা-প্রশাখার সঙ্গে মিলে যায়। তারা বলছেন, জিরাফ কোন অঞ্চলে থাকে, তার নিরিখে এই দাগের ধরন বদলে যেতে পারে।

তাপ নিয়ন্ত্রণ বা শরীর ঠাণ্ডা রাখা

জিরাফের ঘাম হয় না বা হাঁপাতে পারে না, অথচ তারা থাকে প্রচণ্ড গরম এলাকায়। তাহলে তারা ঠাণ্ডা থাকে কীভাবে? এখানে জিরাফকে সাহায্য এই বড় দাগগুলো। কারণ প্রতিটি দাগের নিচে থাকে ঘন রক্তনালির জাল। শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে গেলে সেই রক্তনালিগুলো বিস্তৃত হয়ে তাপ বের করে দেয়। থার্মাল ক্যামেরায় দেখা গেছে, গরমের সময় দাগগুলো আশপাশের চামড়ার চেয়ে বেশি গরম থাকে।

শীতের সময় আবার উল্টোটা হয়। রক্তনালিগুলো সংকুচিত হয়ে তাপ ধরে রাখে। তাই বড় দাগ শীত এলাকায়, আর ছোট দাগ গরম এলাকায় বেশি কার্যকর।

একটি নতুন গবেষণায় (যেটি এখনো পর্যালোচনাধীন) দেখা গেছে, ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় বড় দাগ বেশি কাজে আসে। তখন দাগের নিচের রক্তনালী সংকুচিত হয়ে তাপ ধরে রাখে। অন্যদিকে ছোট দাগ গরম এলাকায় বেশি কার্যকর, কারণ বড় ও গাঢ় দাগ বেশি সূর্যতাপ শোষণ করে।

আরও মজার বিষয় হলো, এই গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষ মাসাই জিরাফদের বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে দাগের ধরন বেশি প্রভাব ফেলে, কিন্তু মহিলা জিরাফদের ক্ষেত্রে না।

গবেষকদের মতে, এর কারণ হলো পুরুষ জিরাফরা একা ঘোরে ও নানা ধরনের পরিবেশের সম্মুখীন হয়। বিপরীতে মহিলারা দল বেঁধে বাচ্চাদের সঙ্গে থাকে।

পরিচিতি ও আত্মীয় চিনে রাখা

জিরাফ তাদের আত্মীয়দের চিনে রাখে দাগ দেখে। ২০২২ সালের এক গবেষণায় ৩৯৯টি স্ত্রী জিরাফের দাগ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, যাদের দাগ একে অপরের সঙ্গে মিলে যায়, তাদের মধ্যে সামাজিক বন্ধন বেশি থাকে।

এতে বোঝা যায়, দাগের গঠন বংশগত এবং আত্মীয় চিনতে দাগ ভূমিকা রাখে।

২০১৭ সালের এক গবেষণা অনুযায়ী, অনেক স্তন্যপায়ী প্রাণীর দাগ বা রঙ তাদের স্বাস্থ্যের অবস্থা ও সামাজিক মর্যাদা প্রকাশ করে। এছাড়া এগুলো সঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। জিরাফদের ক্ষেত্রেও এটি হতে পারে, যদিও এ নিয়ে এখনো সরাসরি গবেষণা হয়নি।

পরিশেষে বলা যায়, জিরাফের দাগ কেবল সৌন্দর্য্য বৃদ্ধির জন্য নয়, বরং বেঁচে থাকার একটি অস্ত্র। তারা দাগ দিয়ে লুকোতে পারে, শরীর ঠাণ্ডা রাখতে পারে, আত্মীয় চিনতে পারে, এমনকি তীব্র তাপমাত্রায় টিকে থাকতে পারে।

সূত্র: লাইভ সায়েন্স