প্রকৃতির মায়েরা

সুমাইয়া ইসলাম
সুমাইয়া ইসলাম

তুমি কি কখনো ভেবেছ, জঙ্গলের প্রাণী মায়েরা বাচ্চাদের কীভাবে বড় করে তোলে? তারাও কি আমাদের মায়ের মতোই সন্তানকে আদর করে, বিপদ থেকে রক্ষা করে ও নতুন নতুন জিনিস শেখায়? উত্তর হলো—হ্যাঁ! আসলে মা মানেই ভালোবাসা—সে মানুষ হোক বা প্রাণী।

প্রকৃতির বিশাল পৃথিবীতে এমন অনেক মা আছে, যারা নিজেদের ছোট্ট সন্তানের জন্য অবিশ্বাস্য সব কাজ করে। কেউ পিঠে করে বাচ্চাকে বহন করে, কেউ শিকার করতে শেখায়, কেউ আবার নিজের ভয়ংকর চেহারার আড়ালে লুকিয়ে রাখে কোমল এক হৃদয়।

এই লেখায় আমরা প্রকৃতির অসাধারণ পাঁচ মায়ের তথ্য জানব।

স্ট্রবেরি পয়জন ডার্ট ফ্রগ
স্ট্রবেরি পয়জন ডার্ট ফ্রগ। ছবি: সংগৃহীত

বাচ্চাকে নিরাপদ জায়গায় রেখে আসে যে মা ব্যাঙ

ব্যাঙাচিকে নিয়ে মাথা ঘামানো হয়তো অদ্ভুত মনে হতে পারে, কিন্তু স্ট্রবেরি পয়জন ডার্ট ফ্রগ মায়েরা তাদের সন্তানদের প্রতি ভীষণ যত্নশীল। ডিম ফুটে যাওয়ার পর মা ব্যাঙ তার পিঠে করে সর্বোচ্চ পাঁচটি ব্যাঙাচিকে মধ্য আমেরিকার রেইনফরেস্টের ব্রোমেলিয়াড গাছে নিয়ে যায়। এই গাছের পাতার ভাঁজে ছোট্ট পানিভর্তি জায়গা থাকে। মা প্রতিটি ব্যাঙাচিকে আলাদা আলাদা গাছে রেখে আসে, যেন তারা নিরাপদে থাকতে পারে।

মা ব্যাঙ তার পিঠে করে সর্বোচ্চ ব্যাঙাচিকে মধ্য আমেরিকার রেইনফরেস্টের ব্রোমেলিয়াড গাছে নিয়ে যায়। ছবি: সংগৃহীত
মা ব্যাঙ তার পিঠে করে সর্বোচ্চ ব্যাঙাচিকে মধ্য আমেরিকার রেইনফরেস্টের ব্রোমেলিয়াড গাছে নিয়ে যায়। ছবি: সংগৃহীত

প্রায় দুই মাস ধরে মা ব্যাঙ তার বাচ্চাদের দেখভাল করতে প্রতিদিন সেই গাছগুলোতে যায়। শুধু তাই নয়, প্রতিটি ব্যাঙাচির জন্য নিষিক্ত না হওয়া অন্তত পাঁচটি ডিম সেখানে রেখেন আসে, যা তাদের খাবার হিসেবে কাজ করে।
 

দুই বছর মায়ের কাছে শেখে চিতা

পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুতগতির স্থল প্রাণী চিতাবাঘকে নিখুঁত শিকারি মনে করা হয়। কিন্তু তারা জন্মগতভাবে শিকার করতে জানে না। নবজাতক চিতাশাবকদের কোনো আত্মরক্ষার উপায় জানা থাকে না, ফলে তারা খুব অসহায় থাকে। মূলত তাদের মা তখন দায়িত্ব নেয়। সন্তানদের বড় হয়ে শক্তিশালী, দ্রুতগতি ও সফল হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সব দক্ষতা শেখানো যেন মায়ের কাজ। টানা দুই বছর তারা মায়ের প্রতিটি কাজ মন দিয়ে দেখে।

ছবি: সংগৃহীত
বেঁচে থাকা ও সফল হওয়ার জন্য তাদের সেরা শিক্ষক মা। ছবি: সংগৃহীত

তারা শেখে কীভাবে নিজেদের গায়ের রঙ ব্যবহার করে আফ্রিকার তৃণভূমিতে লুকিয়ে থাকতে হয়। তারা দেখে কীভাবে শিকারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে দ্রুত কাবু করতে হয়। বেঁচে থাকা ও সফল হওয়ার জন্য তাদের সেরা শিক্ষক মা। চিতাবাঘ মায়েরা তাদের শাবকদের খেলাচ্ছলে লড়াই করতে উৎসাহ দেয়, যেন তারা শিকারের কৌশল শিখতে ও অনুশীলন করতে পারে।

টানা দুই বছর তারা মায়ের প্রতিটি কাজ মন দিয়ে দেখে।

ডিম পুতে পাহারা দেয় কুমির

অনেকেই কুমিরকে ‘বর্ষসেরা মা’ পুরস্কার দিতে চাইবে না। কারণ একটি ২০ ফুট লম্বা নাইল কুমির জেব্রা থেকে মানুষ পর্যন্ত শিকার করতে পারে। অথচ ভয়ংকর এই সরীসৃপরা নিজের সন্তানের জন্য খুব যত্নশীল মা।

ভয়ংকর এই সরীসৃপরা নিজের সন্তানের জন্য খুব যত্নশীল মা। ছবি: সংগৃহীত
ভয়ংকর এই সরীসৃপরা নিজের সন্তানের জন্য খুব যত্নশীল। ছবি: সংগৃহীত

অধিকাংশ সরীসৃপ ডিম পেড়ে চলে যায় এবং আর কখনো ফিরে আসে না। কিন্তু মা কুমির ডিম পুঁতে রাখার পর টানা তিন মাস পাহারা দেয়, যেন শিকারিরা ক্ষতি করতে না পারে।

বাচ্চারা ডিম ফুটে বের হওয়ার আগে চিৎকারের মতো উচ্চ শব্দ করে, আর মা তখন দ্রুত মাটি খুঁড়ে ডিমগুলো বের করে আনে। ডিম ফুটে গেলে বাচ্চারা মায়ের মুখের ভেতর চড়ে বসে, আর মা তাদের পানির কাছে নিয়ে যায়। সেখানে প্রায় দুই বছর মায়ের সুরক্ষার মধ্যেই থাকে।

মা কুমির ডিম পুঁতে রাখার পর টানা তিন মাস পাহারা দেয়, যেন শিকারিরা ক্ষতি করতে না পারে।
মা কুমির ডিম পুঁতে রাখার পর টানা তিন মাস পাহারা দেয়, যেন শিকারিরা ক্ষতি করতে না পারে। ছবি: সংগৃহীত

মাকে দেখে শেখে আফ্রিকান হাতি

প্রতিটি শিশুরই এমন কাউকে প্রয়োজন, যার কাছ থেকে সে শিখতে ও অনুপ্রেরণা পেতে পারে। সৌভাগ্যবশত, আফ্রিকান হাতিশাবকের চারপাশে এমন কেউ থাকে। একটি পাল বা দলে থাকা সব স্ত্রী হাতি মিলে সব বাচ্চাদের বড় করে তোলে।

মাকে দেখে শেখে আফ্রিকান হাতি
মাকে দেখে শেখে আফ্রিকান হাতি। ছবি: সংগৃহীত

যখন কোনো মা হাতি গাছের পাতা দিয়ে মাছি তাড়াতে হাতপাখার মতো কিছু বানায়, ছোট হাতিটিও সেটাই করার চেষ্টা করে। যখন কোনো মা হাতি শুঁড় দিয়ে বেরি, পাতা বা ঘাস খুঁজে খায়, তখন শাবকও সেটি নকল করে এবং শেখে কোন খাবার নিরাপদ।

এমনকি ছোট হাতিরা মা হওয়ার কৌশলও শেখে অন্য মায়েদের দেখে। যেমন কোনো মা যখন তার সদ্যোজাত শাবককে শুঁড় দিয়ে আলতো করে জড়িয়ে ধরে দাঁড়াতে সাহায্য করে।

এক বছর সন্তানকে ছেড়ে যায় না হাম্পব্যাক তিমি

হাম্পব্যাক তিমিরা সাধারণত একাকী প্রাণী। ডলফিন বা অর্কার মতো তারা দল বেঁধে চলাফেরা করে না। তারা একাই সাঁতার কাটতে পছন্দ করে। তবে মা ও বাচ্চার সম্পর্ক একেবারেই আলাদা। বাচ্চাকে প্রথম শ্বাস নেওয়ার জন্য পানির ওপরে তুলে আনার পর মা হাম্পব্যাক প্রায় এক বছর তার সন্তানকে ছেড়ে যায় না। কখনোই সে বেশি দূরে যায় না।

বাচ্চাকে প্রথম শ্বাস নেওয়ার জন্য পানির ওপরে তুলে আনার পর মা হাম্পব্যাক প্রায় এক বছর তার সন্তানকে ছেড়ে যায় না।
বাচ্চাকে প্রথম শ্বাস নেওয়ার জন্য পানির ওপরে তুলে আনার পর মা হাম্পব্যাক প্রায় এক বছর তার সন্তানকে ছেড়ে যায় না। ছবি: সংগৃহীত

সে ধৈর্য ধরে দেখে, বাচ্চাটি কীভাবে বারবার ব্যর্থ হয়ে পানির ওপরে লাফ দেওয়ার বা লেজ ঝাপটানোর চেষ্টা করছে। তারপর মা নিজে ঠিকভাবে সেই কৌশল দেখিয়ে দেয়। মা ও বাচ্চা প্রায়ই একে অপরের পাখনায় আলতো স্পর্শ করে। অনেকের মতে, এটি ভালোবাসার প্রকাশ। মায়ের এই সমর্থনের কারণেই একদিন সন্তান নিজ থেকেই একা একা চলতে শিখে যায়।

মা মেরু ভালুকের লড়াই

বরফে ঢাকা ঠাণ্ডা পৃথিবীতে মেরু ভালুক মায়েরা তাদের সন্তানদের খুব যত্ন করে বড় করে তোলে। সাধারণত একটি মা মেরু ভালুক একসঙ্গে দুটি শাবকের জন্ম দেয়। ছোট্ট শাবকগুলো প্রায় দুই বছর মায়ের সঙ্গেই থাকে, যেন কঠিন ঠাণ্ডার মধ্যে বেঁচে থাকার সব কৌশল শিখতে পারে।

বরফে ঢাকা ঠাণ্ডা পৃথিবীতে মেরু ভালুক মায়েরা তাদের সন্তানদের খুব যত্ন করে বড় করে তোলে।
বরফে ঢাকা ঠাণ্ডা পৃথিবীতে মেরু ভালুক মায়েরা তাদের সন্তানদের খুব যত্ন করে বড় করে তোলে। ছবি: সংগৃহীত

শাবকদের জন্ম দেওয়ার আগে মা মেরু ভালুক বরফের মধ্যে গর্ত খুঁড়ে একটি নিরাপদ আস্তানা তৈরি করে। বাইরে তখন তুষারঝড় আর হিমশীতল বাতাস বইতে থাকে, কিন্তু সেই বরফের ঘরটি শাবকদের উষ্ণ রাখে।

সাধারণত নভেম্বর থেকে জানুয়ারির মধ্যে শাবকদের জন্ম হয়। মার্চ বা এপ্রিল মাসে তারা প্রথমবারের মতো গর্ত থেকে বাইরে বের হয়। ধীরে ধীরে তারা বাইরের ঠাণ্ডার সঙ্গে মানিয়ে নিতে শেখে। এরপর মা তাদের শেখাতে শুরু করে কীভাবে খাবার খুঁজতে হয় এবং বরফের রাজ্যে টিকে থাকতে হয়।

ছোট্ট শাবকগুলো প্রায় দুই বছর মায়ের সঙ্গেই থাকে
ছোট্ট শাবকগুলো প্রায় দুই বছর মায়ের সঙ্গেই থাকে। ছবি: সংগৃহীত

অসাধারণ এমপেরর পেঙ্গুইন মা

অ্যান্টার্কটিকার ভয়ংকর ঠাণ্ডার মধ্যেও এমপেরর পেঙ্গুইন মায়েরা সন্তানদের জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করে। ডিম পাড়ার পর মা পেঙ্গুইন সেটি বাবার কাছে রেখে যায়। বাবা পেঙ্গুইন তখন নিজের পায়ের ওপর ডিমটি সাবধানে ধরে রাখে এবং শরীরের নিচের নরম চামড়ার ভাঁজ দিয়ে সেটিকে উষ্ণ রাখে, যেন বরফশীতল বাতাসে ডিমটি জমে না যায়।

নিজের মুখ থেকে খাবার বের করে ছানাকে খাওয়ায়।
নিজের মুখ থেকে খাবার বের করে ছানাকে খাওয়ায়। ছবি: সংগৃহীত

এরপর শুরু হয় মায়ের কঠিন যাত্রা। খাবারের খোঁজে তাকে প্রায় ৫০ মাইল পর্যন্ত পথ পাড়ি দিয়ে সমুদ্রে যেতে হয়। সেখানে মাছ ধরে পেট ভরে খায় এবং বাচ্চার জন্য খাবার জমা করে। কয়েক সপ্তাহ পর মা আবার ফিরে আসে সেই জায়গায়, যেখানে তার ছোট্ট বাচ্চাটি ডিম ফুটে বের হয়েছে। ফিরে এসে নিজের মুখ থেকে খাবার বের করে ছানাকে খাওয়ায়।

শুধু তাই নয়, মা নিজের শরীরের উষ্ণ ব্রুড পাউচ বা বিশেষ থলির মধ্যে ছানাটিকে আগলে রাখে, যেন সে ঠাণ্ডা থেকে নিরাপদে থাকতে পারে।

অ্যান্টার্কটিকার ভয়ংকর ঠাণ্ডার মধ্যেও এমপেরর পেঙ্গুইন মায়েরা সন্তানদের জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করে।
অ্যান্টার্কটিকার ভয়ংকর ঠাণ্ডার মধ্যেও এমপেরর পেঙ্গুইন মায়েরা সন্তানদের জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করে। ছবি: সংগৃহীত

সন্তানের সঙ্গে ছয় বছরের বেশি থাকে ওরাংওটান

প্রকৃতির সবচেয়ে গভীর মা-সন্তানের সম্পর্কগুলোর একটি দেখা যায় ওরাংওটানদের মধ্যে। জন্মের পর প্রথম দুই বছর ছোট্ট ওরাংওটান পুরোপুরি মায়ের ওপর নির্ভরশীল থাকে। খাবার খাওয়া থেকে শুরু করে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়া—সবকিছুর জন্যই সে মায়ের সাহায্য চায়। মা তাকে বুকের কাছে জড়িয়ে বা শরীরে আঁকড়ে নিয়ে গাছ থেকে গাছে চলাফেরা করে।

ওরাংওটান মায়েরা তাদের সন্তানদের সঙ্গে ছয় থেকে সাত বছর পর্যন্ত থাকে।
ওরাংওটান মায়েরা তাদের সন্তানদের সঙ্গে ছয় থেকে সাত বছর পর্যন্ত থাকে। ছবি: সংগৃহীত

ওরাংওটান মায়েরা তাদের সন্তানদের সঙ্গে ছয় থেকে সাত বছর পর্যন্ত থাকে। এই দীর্ঘ সময়ে তারা সবকিছু শেখায়। অদ্ভুত সুন্দর বিষয় হলো, বড় হওয়ার পরও মেয়ে ওরাংওটানরা প্রায়ই তাদের মায়ের সঙ্গে ‘দেখা করতে” আসে। অনেক সময় ১৫ বা ১৬ বছর বয়স পর্যন্তও তারা মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে।

অনেক সময় ১৫ বা ১৬ বছর বয়স পর্যন্তও তারা মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে।
অনেক সময় ১৫ বা ১৬ বছর বয়স পর্যন্তও তারা মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে। ছবি: সংগৃহীত

সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফি, বিবিসি ওয়াইল্ডলাইফ, ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ