পৃথিবীর বিপজ্জনক ১০ প্রাণী, কত নম্বরে মানুষ
সাধারণ বিপজ্জনক প্রাণী বলতে খুব শক্তিশালী, আকারে বড় এমই প্রাণীকেই আমরা বুঝি। যেমন বাঘ, সিংহ, কুমির বা হাঙর। কিন্তু শুনতে অবাক লাগলেও সবচেয়ে মারাত্মক প্রাণীগুলো সাধারণত ছোট আকারের হয়। তারা দাঁত দিয়ে নয়, বরং রোগ ছড়িয়ে বা বিষের মাধ্যমে মানুষের ক্ষতি করে।
নিচে দশটি বিপজ্জনক প্রাণীর তথ্য তুলে ধরা হলো। যেগুলোর কারণে প্রতিবছর বড় সংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয়।
১০. সিংহ
সিংহ খুব শক্তিশালী ও ভয়ঙ্কর শিকারি। এর গর্জন শুনেই মনে ভয় ধরে যায়। এই প্রাণীটি সাধারণত রাতে শিকার করে। তারা ধারালো নখ ও দাঁত দিয়ে আক্রমণ করে। এক কামড়েই ভেঙে ফেলতে পারে হাড়। সিংহরা দল বেঁধে শিকার করে এবং শিকারকে ঘিরে তারপর আক্রমণ করে। বিশেষ করে যখন তাদের বাচ্চা থাকে বা তারা নিজেদের রক্ষা করতে চায়।
সিংহের আক্রমণে বছরে প্রায় ২০০ মানুষের মৃত্যু হয় বলে বিবিসি সায়েন্স ফোকাসের প্রতিবেদনে বলা হয়।
৯. হিপ্পো
হিপ্পোপটামাসের (হিপ্পো) এই তালিকায় আসাটা অনেকের কাছে অবাক লাগতে পারে, কারণ তারা ঘাস খায়। কিন্তু তাদের শক্তিশালী দাঁত ও রাগী স্বভাবের কারণে পৃথিবীর অন্যতম বিপজ্জনক প্রাণীর তালিকায় এসেছে।
হিপ্পোর ধারালো দাঁত প্রায় আধা মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। ফলে এক কামড়েই মানুষের শরীর ভয়ংকরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাদের কামড়ের শক্তি প্রায় ১ হাজার ৮০০ পিএসআই, যা সিংহের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি।
কেউ হিপ্পোর এলাকায় গেলে বা কোনো নৌকা তাদের কাছে গেলে আক্রমণ করতে পারে। অনেক সময় নৌকা উল্টেও দিতে পারে। প্রয়োজনে হিপ্পো নিজের প্রজাতির প্রাণীকেও আক্রমণ করতে পারে।
হিপ্পোর আক্রমণে বছরে প্রায় ৫০০ মানুষের মৃত্যু হয়।
৮. হাতি
হাতি সাধারণত শান্ত প্রাণী। তবে বিশাল আকারের কারণে তারা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে রেগে গেলে বা ভয় পেলে হাতি মানুষের ওপর আক্রমণ করে। হাতি সাধারণত মানুষকে পায়ে পিষে মেরে ফেলে।
আফ্রিকান হাতির ওজন প্রায় ৮ টন পর্যন্ত হতে পারে (এশিয়ান হাতির প্রায় ৫ দশমিক ৫ টন)। তাই এত বড় প্রাণী যদি কাউকে ফেলে পায়ে চাপা দেয়, তাহলে বেঁচে থাকা খুব কঠিন।
হাতি তার শুঁড় দিয়েও মানুষকে ছুঁড়ে ফেলতে পারে বা মাটিতে আছড়ে মারতে পারে। এছাড়া তার দাঁত দিয়েও মানুষকে আঘাত করে।
হাতির হামলায় বছরে প্রায় ৬০০ মানুষের মৃত্যু হয়।
৭. কুমির
কুমির খুব ভয়ংকর প্রাণী। তারা প্রতি বছর অনেক মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়। তাদের বড় বড় দাঁত দেখলেই বোঝা যায় কতটা বিপজ্জনক!
কুমির শিকার ধরলে শক্ত করে কামড়ায় এবং শরীর ঘুরিয়ে (ডেথ রোল) আক্রমণ করতে থাকে। অনেক সময় তারা শিকারকে চেপে ধরে মারে, তারপর গিলে ফেলে।
কুমির খুব এলাকা সচেতন (নিজের জায়গা রক্ষা করে)। কেউ তার এলাকায় ঢুকলে বা পানির কাছে গেলে হঠাৎ আক্রমণ করতে পারে।
কুমিরের আক্রমণে বছরে প্রায় ১ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়।
৬. বিচ্ছু
বিচ্ছু ছোট কিন্তু খুব বিপজ্জনক প্রাণী। তারা লেজের হুল দিয়ে দংশন করে এবং বিষ ঢুকিয়ে দেয়। পৃথিবীতে ২ হাজার ৬০০টিরও বেশি প্রজাতির বিচ্ছু আছে। এর মধ্যে প্রায় ২৫টি মানুষের জন্য খুব মারাত্মক।
সবচেয়ে বিপজ্জনকগুলোর একটি হলো ‘ডেথস্টকার’ বিচ্ছু। এগুলো সাধারণত উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের শুকনো মরুভূমি এলাকায় পাওয়া যায়।
বিচ্ছুর কামড়ে বছরে প্রায় ৩ হাজার ৩০০ মানুষের মৃত্যু হয়।
৫. অ্যাসাসিন বাগ (চাগাস রোগ)
অ্যাসাসিন বাগ হলো ছোট একটি পোকা, কিন্তু এটি খুব বিপজ্জনক। এরা ‘চাগাস’ নামের মারাত্মক রোগ ছড়ায়। এই পোকা মানুষের রক্ত চুষে বাঁচে। এটি মূলত মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকায় বেশি দেখা যায়।
চাগাস রোগ সাধারণত এই পোকার কামড় থেকে বা এর মল দিয়ে দূষিত খাবার বা পানীয় খেলে ছড়াতে পারে। এই রোগ ধীরে ধীরে মানুষের হৃদপিণ্ড, পেট ও স্নায়ুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত করে। আরও ভয়ংকর বিষয় হলো, এই রোগ মায়ের শরীর থেকে গর্ভের শিশুর শরীরেও ছড়াতে পারে।
অ্যাসাসিন বাগের কারণে বছরে প্রায় ১০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়।
৪. কুকুর
কুকুর সাধারণত মানুষের খুব ভালো বন্ধু হিসেবে পরিচিত। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে তারা খুব বিপজ্জনকও হতে পারে। বিশেষ করে রেবিস বা জলাতঙ্ক রোগের কারণে।
অনেক কুকুর তাদের মালিক বা এলাকা রক্ষা করতে গিয়ে অপরিচিত মানুষকে কামড়াতে পারে। তবে কুকুরের কামড়ে সরাসরি মৃত্যু কম হলেও, রেবিস রোগের কারণে অনেক মানুষ মারা যায়।
রেবিস একটি মারাত্মক রোগ, যা কুকুরের লালা (থুতু) থেকে মানুষের শরীরে ছড়ায়। কামড়, আঁচড় বা সংক্রমিত স্থানের সংস্পর্শে এলে এই রোগ হতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, মানুষের রেবিস রোগের প্রায় ৯৯ শতাংশ সংক্রমণ কুকুরের মাধ্যমে ঘটে। এই রোগ বেশি দেখা যায় আফ্রিকা ও এশিয়ার কিছু দরিদ্র অঞ্চলে।
কুকুরে কারণে বছরে প্রায় ৫৯ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়।
৩. সাপ
সাপকে অনেক মানুষ খুব ভয় পায়, তার কারণও আছে। পৃথিবীর অনেক সাপ বিষধর, যেগুলো মানুষের জন্য মারাত্মক হতে পারে।
কিছু সাপের বিষ খুবই শক্তিশালী। যেমন ব্ল্যাক মাম্বা সাপের কামড়ে খুব অল্প বিষেই মানুষের মৃত্যু হতে পারে। আবার কিছু বড় সাপ, যেমন পাইথন, বিষ ব্যবহার করে না। তারা শরীর পেঁচিয়ে শিকারকে শক্ত করে ধরে রাখে, শ্বাস বন্ধ করে দেয় এবং হাড় ভেঙে ফেলে। তারপর পুরো শরীর গিলে ফেলে।
তবে সাপের কামড়ে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যায় বিষের কারণে। অনেক সময় যারা বেঁচে যায়, তাদের শরীরের অংশ কেটে ফেলতে হয় বা স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সাপের কারণে বছরে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়।
২. মানুষ
এই তালিকার এই অংশটা একটু অদ্ভুত মনে হতে পারে। কারণ এখানে প্রাণী বলতে মানুষকেই ধরা হয়েছে। তবে হত্যাকাণ্ড হিসাব করলে এই তালিকায় দ্বিতীয় বিপজ্জনক ‘প্রাণী’ মানুষ।
বিশ্বজুড়ে অনেক মানুষ অন্য মানুষের হাতে মারা যায়। বিশেষ করে লাতিন আমেরিকায় এই হার তুলনামূলক বেশি। যেমন এল সালভাদরে অনেক মৃত্যুর কারণই হত্যাকাণ্ড।
বছরে প্রায় ৪ লাখ মানুষকে মানুষই হত্যা করে।
১. মশা
মশা পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রাণী। ছোট হলেও এটি প্রতি বছর অনেক মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়। মূলত মশা রোগ ছড়ানোর মাধ্যমে মানুষের মৃত্যু ঘটায়, যেমন ম্যালেরিয়া।
শুধু স্ত্রী মশাই মানুষকে কামড়ায়। তাই তারাই বেশি বিপজ্জনক। মশা ছোট হলেও ইতিহাসের গতিপথ পর্যন্ত বদলে দিয়েছে। বিভিন্ন সময়ে এটি বড় বড় ঘটনার ওপরও প্রভাব ফেলেছে।
মশাবাহিত ম্যালেরিয়া রোগ সবচেয়ে বেশি দেখা যায় আফ্রিকায়। বিশ্বের প্রায় ৯৫ শতাংশ রোগী এবং ৯৬ শতাংশ মৃত্যু সেখানে ঘটে।
মশার কারণে বছরে প্রায় ৭ লাখ ২৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়।