গরমে ঘরের বারান্দায় পাখির জন্য খাবার-পানির ব্যবস্থার সহজ কিছু উপায়
ঢাকায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পোষা প্রাণী পালনের প্রবণতা অনেকটাই বেড়েছে। প্রাণী প্রেমীরা শুধু ঘরেই নয়, রাস্তার কুকুর আর বিড়ালদের জন্যও ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু, শহরের ডানাওয়ালা ছোট বন্ধুদের কথা কি আমরা ভুলে যাচ্ছি?
ভোরের আলো ফোটার পর থেকেই শহরের ইট-কাঠের ভিড়ে ডানা ঝাপটে ঘুরে বেড়ায় নানা জাতের পাখি। ঘরের জানালা, বারান্দা কিংবা ছাদের কার্নিশে এসে ডানা মেলে তারা জানান দেয় অস্তিত্ব। কিচিরমিচির করে মুখর করে তোলে চারপাশ।
দিন দিন গাছপালা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ হারিয়ে ধূসর হয়ে ওঠা এই শহরে বাস্তুতন্ত্রের অন্যতম অংশ এখন পাখিরা।
যাদের বাসা বা বাড়ির ছাদে কিংবা বারান্দায় খোলা জায়গা আছে, তারা চাইলেই খুব সহজে এই পাখিদের জন্য খাবার আর পানির ব্যবস্থা করে দিতে পারেন। কোনো খোলা পাত্রে খাবার বা পানি রেখে জানালা কিংবা বারান্দার গ্রিলে ঝুলিয়ে দিয়ে, পাখিদের আমন্ত্রণ জানাতে পারেন।
কোথায় রাখবেন খাবার?
পাখিদের ইন্দ্রিয় খুব প্রখর। অপরিচিত মানুষ বা শিকারি প্রাণী, বিশেষ করে বিড়ালের উপস্থিতি তারা সহজেই বুঝতে পারে। তাই পাখির জন্য খাবার বা পানির পাত্রটি এমন জায়গায় রাখা উচিত, যেন উড়ন্ত অবস্থায়ই সহজে দেখতে পায় তারা। একইসঙ্গে জায়গাটি পাখিদের জন্য নিরাপদও হতে হবে।
কোন পাখির জন্য কী খাবার
অনেকেই অভিযোগ করেন—বারান্দায় খাবার রাখলেও পাখিরা আসছে না। এর কারণ হতে পারে আপনার দেওয়া খাবার ওদের পছন্দ হচ্ছে না। কিছু পাখি ছোট ছোট পোকা বা পোকামাকড়ের লার্ভা বা শূককীট খেতে পছন্দ করে, তেমনি অনেক পাখি আবার বীজ কিংবা ফল পছন্দ করে।
সূর্যমুখী ও কুমড়ার বীজ কিছু পাখির পছন্দের তালিকায় থাকে। এসব বীজের লোভে হাজির হয় চড়ুই, মুনিয়া, ঘুঘু কিংবা পায়রা। আবার কাঁচা গম কিংবা ভুট্টার মতো শস্য ঘুঘু ও পায়রার প্রিয় খাবার।
যেসব পাখি সাধারণত ফুলের মধু কিংবা বুনো ফল খেয়ে বেঁচে থাকে, তারা ফলের টুকরো পেলে সেখানে ছুটে আসে। ওদের জন্য পেয়ারা, পেঁপে কিংবা জামের ছোট টুকরো রাখা যেতে পারে। বুলবুলি, হলদে পাখি কিংবা টিয়াদের কাছে এগুলো দারুণ লোভনীয়।
ঘরের খাবারও দিতে পারেন
গরমের সময় অনেকের বাড়িতেই ফল বা বীজ থাকে। তবে যাদের কাছে আলাদা করে পাখির খাবার নেই, তারা নিজেদের খাবারের ফেলে দেওয়া অংশ ওদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারেন।
রান্না করা ভাত কিংবা মাছ-মাংসের ছোট্ট টুকরো—আমাদের পরিচিত চড়ুই পাখির দল ঠুকরে ঠুকরে প্রায় সবই খেয়ে ফেলে।
আর ঢাকার বিখ্যাত কাকের দল তো সব ধরণের উচ্ছিষ্ট পরিষ্কার করার কাজে রীতিমত ওস্তাদ। তবে খেয়াল রাখা জরুরি, পচে যাওয়া বা অতিরিক্ত বাসি খাবার পাখিদের দেওয়া যাবে না।
গরমে সবচেয়ে জরুরি পানি
খাবারের চেয়েও এই কাঠফাটা গরমে পাখিদের জন্য বড় সংকট পরিষ্কার পানি।
বারান্দার গ্রিলে ছোট বাটি বা কাপে পানি ঝুলিয়ে রাখা যায়। তবে দূর থেকে ওড়ার সময় পাখিরা সবসময় স্থির পানি দেখতে পায় না। তাই সম্ভব হলে কোনো ছোট ফোয়ারা বসানো যেতে পারে, যেন জলধারা দেখে বা শব্দ পেয়ে দূর থেকেই পাখিরা পানির সন্ধান পায়।
পানির পাত্র নিয়মিত পরিষ্কার করে বিশুদ্ধ পানি দিতে হবে। এতে পাখির জন্য পানির পাশাপাশি গোসলের সুযোগও তৈরি হতে পারে।
পাখিদের খাবার প্রয়োজন কেন?
বুনো পাখি নিজেরাই নিজেদের খাবার খুঁজে নিতে পারদর্শী। কিন্তু নগরজুড়ে যেভাবে একের পর এক ইটের দেয়াল উঠছে আর তথাকথিত ‘সৌন্দর্যবর্ধনের’ নামে গাছপালা কেটে ফেলা হচ্ছে, তাতে পাখিদের আবাসস্থল কমে যাচ্ছে। দেশি ও পরিযায়ী—উভয় পাখির জন্যই খাবার আর পানি খুঁজে পাওয়া ভীষণ কঠিন হয়ে উঠেছে।
একসময় ঢাকার আনাচে-কানাচে সব জায়গায় ছিল কাকদের রাজত্ব। বুদ্ধিমান এই পাখি খাবারের উচ্ছিষ্ট পরিষ্কার করে শহরকে সুন্দর রাখতো। তাদের কর্কশ ডাক ছিল শহরের সবার পরিচিত শব্দ।
কিন্তু আজকাল সেই চেনা কাকের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে আসছে, আগের মতো আর চোখে পড়ে না।
বুনো পাখিদের এই নিঃশব্দে হারিয়ে যাওয়া হয়তো হুট করে চোখে পড়ে না, কিন্তু তারা একবার হারিয়ে গেলে আমাদের পুরো প্রাকৃতিক ভারসাম্যই ভেঙে পড়বে।
তাই বারান্দার এক কোণে ছোট একটি পাত্রে পানি ও সঙ্গে কয়েক মুঠো বীজ হয়ে উঠতে পারে এই গরমে শহরের উড়ন্ত বন্ধুদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি আশ্রয়।